কেন কালিমানতানে রাজধানী সরাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া

জাভা দ্বীপের জাকার্তা থেকে বোর্নিও দ্বীপের কালিমানতানে রাজধানী শহর স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। নতুন রাজধানীর নাম দেওয়া হয়েছে নুসানতারা। তিন কোটি মানুষের শহর জাকার্তা যানজটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। তবে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরা। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টে সম্প্রতি রাজধানী স্থানান্তরের বিল অনুমোদন হয়েছে। এতে বলা হয়, জাকার্তা থেকে দূরবর্তী বোর্নিও দ্বীপের পূর্ব কালিমানতানে রাজধানী সরানো হবে। আর নতুন এই রাজধানী শহরের নাম হবে নুসানতারা। পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে ইন্দোনেশিয়ার উন্নয়নমন্ত্রী সুহার্সো মোনোয়ার্ফা জানান, নতুন রাজধানী জাতির পরিচয়ের নতুন প্রতীক হবে, পাশাপাশি এটি হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। নুসানতারা প্রাচীন এক জাভানিজ শব্দ যার অর্থ দ্বীপপুঞ্জ। উন্নয়নমন্ত্রী সুহার্সো মোনোয়ার্ফা জানান, নতুন রাজধানী শহরের জন্য সব মিলিয়ে ৮০টি নাম প্রস্তাব করা হয়। এগুলোর মধ্য থেকে নুসানতারা নামটি বাছাই করা হয় কারণ এটি মনে রাখা সহজ ও ইন্দোনেশিয়ানদের পরিচিত। নতুন রাজধানীর নামকে স্বাগত জানিয়ে দেশটির বিশেষ কমিটির চেয়ারম্যান আহমেদ ডলি কুর্নিয়া তান্দজুং বলেন, ‘চিন্তা-ভাবনা করে নুসানতারা নামটি বাছাই করা হয়েছে। কারণ নতুন এই নামটির সঙ্গে ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক দিক জড়িত। নুসানতারা এক অর্থে ইন্দোনেশিয়াকে প্রতিনিধিত্ব করছে। একই সঙ্গে এটি এই জাতির সম্ভাবনাও তুলে ধরছে।’ ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বলেন, ‘নতুন রাজধানীর অবস্থান বেশ কৌশলগত। এটি দেশের কেন্দ্রস্থল ও নগরাঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত। শাসনব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক ও সেবা খাতে জাকার্তাকে এ মুহূর্তে অপরিসীম চাপ নিতে হচ্ছে।’   

স্থানান্তরের কারণ

১৯৪৯ সালে ইন্দোনেশিয়া স্বাধীন হয়। সে সময় থেকেই জাকার্তা দেশটির রাজধানী। কয়েক দশক ধরে বেশ কটি সমস্যায় ভুগছে এ শহর। এসব সমস্যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ ও জনসংখ্যা। জাকার্তার বায়ুদূষণের মাত্রা অনেক বেশি। কয়েক বছর ধরে বিশ্বের দূষিত রাজধানী শহরের তালিকায় এ শহর থাকছেই। জাভা দ্বীপ থেকে বোর্নিও দ্বীপে রাজধানী স্থানান্তরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জনসংখ্যার দিক থেকে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য। জাভা দ্বীপ বিশেষ করে জাকার্তার আয়তন ৬৬১.৫ বর্গকিলোমিটারের বেশি। আর অন্যদিকে পূর্ব কালিমানতানের আয়তন ১ লাখ ২৭ হাজার ৩৪৬.৯২ বর্গকিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে পূর্ব কালিমানতান জাকার্তার চেয়ে অনেক বড় হলেও জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ঘটেছে বর্তমান রাজধানী জাকার্তায়। ছোট্ট এই শহরে এখন তিন কোটি মানুষ বাস করে।

এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা প্রতি বছর গড়ে ১ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার করে ডুবছে। বলা হচ্ছে, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে শহরটির বেশির ভাগ অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাবে। ইন্দোনেশিয়ার কৃষিবিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয় আইপিবির পশ্চিম জাভা নিয়ে করা এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ১০.৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে জাভা দ্বীপের অন্তর্ভুক্ত অনেক শহরের। উন্নয়নের জন্য অতিমাত্রায় ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার ডুবে যাওয়ার প্রধান কারণ।

ইন্দোনেশিয়া এমনিতেই বন্যাপ্রবণ এলাকা। জাকার্তার চারদিকে বয়ে চলেছে ১৩টি ছোট-বড় নদী। মূলত জলাভূমির ওপর জাকার্তা অবস্থিত। জোয়ারের সময় জাভা সাগরের পানি রাজধানী শহরে প্রবেশ করে। এ ছাড়া যানজট জাকার্তার অন্যতম প্রধান সমস্যা। ২০১৬ সালের এক জরিপে বিশ্বের যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় জাকার্তার নাম উল্লেখ করা হয়। বৈঠকে সময়মতো পৌঁছাতে প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া লাগে ইন্দোনেশিয়ার মন্ত্রী-এমপিসহ ভিআইপিদের। এ ছাড়া মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ বর্জ্য পানি শোধনের ক্ষমতা রয়েছে জাকার্তার।

এসব সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে জাকার্তা থেকে অন্যস্থানে রাজধানী স্থানান্তরের চেষ্টা করে আসছিলেন ইন্দোনেশিয়ার নীতিনির্ধারকরা। ২০১৯ সালে ইন্দোনেশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানী অন্যত্র স্থানান্তরের কথা জোর দিয়ে বলা হয়। অবশেষে চলতি বছরে রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ইন্দোনেশিয়া।

উদ্বেগ

জাকার্তা থেকে ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরে ও বোর্নিও দ্বীপের পূর্ব পাশে অবস্থিত পূর্ব কালিমানতান। আর নুসানতারা বোর্নিও দ্বীপের নর্থ পেনাজাম পাসের ও কুটাই কারটানেগারা অঞ্চলে অবস্থিত। পানিসম্পদে সমৃদ্ধ পূর্ব কালিমানতান। এ ছাড়া নানা প্রজাতির অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী ওই অঞ্চলে বাস করে। জাকার্তা থেকে পূর্ব কালিমানতানে রাজধানী স্থানান্তরে ইন্দোনেশিয়ার ব্যয় হবে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। নুসানতারায় ৯ থেকে ১৫ লাখ মানুষের বসতি গড়তে প্রয়োজন পড়বে ৩০ থেকে ৪০ হাজার হেক্টর এলাকা। পূর্ব কালিমানতানে ইন্দোনেশিয়া সরকারের রাজধানী সরানোর সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী কালিমানতানে সরানো হলে সেখানকার পরিবেশের কী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অনেকে।

সমালোচকদের ভাষ্য, বোর্নিও দ্বীপের কালিমানতানে প্রস্তাবিত এলাকায় নতুন শহর নির্মাণ করা হলে বন্যপ্রাণী ও চিরহরিৎ বনের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে। ওই অঞ্চলের প্রাণ-প্রকৃতি ও বসবাসরত জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। দেশটির পরিবেশবিদ ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, পূর্ব কালিমানতানে রাজধানী স্থানান্তর করা হলে ব্যাপক আকারে গাছপালা কাটা পড়বে। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাস্তুতন্ত্র। কালিমানতানের রেইনফরেস্টকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ও শেষ রেইনফরেস্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনিতেই খনিশিল্প কালিমানতানের বন উজাড়ে প্রধান ভূমিকা রাখছে। তার ওপর সেখানে রাজধানী গড়ে তোলা হলে বননিধন আরও বাড়বে বৈ কমবে না। অবশ্য এ বিষয়ে ইন্দোনেশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজধানী স্থানান্তর কালিমানতানের পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। রাজধানী স্থানান্তর বিদ্যমান সংরক্ষিত বনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। নতুন রাজধানী নুসানতারার ১০ শতাংশ এলাকা উন্মুক্ত সবুজ স্থানের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হবে।  

প্রথম ঘটনা নয়

রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বিশ্বে প্রথম ইন্দোনেশিয়াই নিয়েছে, তা কিন্তু নয়। ২০১৫ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ঘোষণা দেন, বর্তমান রাজধানী কায়রো থেকে ৫০ কিলোমিটার পূর্বে নতুন এক শহরে রাজধানী সরিয়ে নেওয়া হবে। গত বছর মিসরের রাজধানী স্থানান্তরের কথা ছিল। তবে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এই উদ্যোগ স্থগিত করতে বাধ্য হয় মিসর সরকার। এ ছাড়া কাজাখস্তান, মিয়ানমার, বলিভিয়া, নাইজেরিয়া ও পর্তুগাল বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে তাদের রাজধানী স্থানান্তর করেছিল।

দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি প্রদর্শনে রাজধানী শহর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভৌগোলিক তাৎপর্য বা অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্য দিয়ে তাই পরিকল্পিতভাবে রাজধানী শহর সাজানো হয়। ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্র বা অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্র বরাবরই রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। রাজনীতি বা প্রশাসনে অবদান রাখতে সক্ষম এমন দক্ষ ব্যক্তিদের (যেমন : আইনজীবী, বিজ্ঞানী, ব্যাংকার ও সাংবাদিক) সাধারণত রাজধানী শহর আকৃষ্ট করে। ইউরোপে মধ্যযুগে প্রাচীন ব্যাবিলন, অ্যাথেন্সসহ অন্য রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কোনো রাজধানী ছিল না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজধানী শহর শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নয়, রাষ্ট্রধর্মেরও কেন্দ্রস্থল (কনস্টানটিনোপল ও রোম) ছিল।

বিশ্বে বর্তমানে এমন রাষ্ট্রের দেখা পাওয়া যাবে, যারা তাদের সব কর্মকাণ্ড রাজধানী শহরে কেন্দ্রীভূত করেনি বরং সরকারি অনেক সংস্থা রাজধানী শহরের বাইরে ছড়িয়ে দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে চিলির কথা বলা যায়। সানতিয়াগো চিলির আনুষ্ঠানিক রাজধানী হলেও দেশটির জাতীয় কংগ্রেসের বৈঠক সেখানে হয় না। চিলির অন্য একটি শহর ভালপারাইসোতে জাতীয় কংগ্রেসের বৈঠক হয়। মোনাকো বা সিঙ্গাপুরের মতো ছোট কটি দেশের শাসনব্যবস্থা অনেকটা শহর-রাষ্ট্রের মতো। এসব দেশের আলাদা কোনো রাজধানীই নেই।

কেন স্থানান্তর

জার্মান ইতিহাসবিদ আন্দ্রিজ ডম তার ‘ক্যাপিটালস অ্যান্ড দ্য মডার্ন সিটি’ বইয়ে বলেন, রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্তকে অনেক ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রতীকী ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৮৩৪ সালে স্বাধীনতা অর্জনের চার বছর পর অ্যাথেন্সকে গ্রিসের রাজধানী করা হয়। লক্ষ্য ছিল, এর মাধ্যমে প্রাচীন গ্রিসের খ্যাতি বা মর্যাদা ফিরে আসবে। সম্প্রতি কয়েকটি উত্তর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাদের রাজধানীর নাম পরিবর্তন করেছে। তারা আর ঔপনিবেশিক শাসনে নেই, সেখান থেকে বের হয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে, এটি আরও জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মূলত এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বতসোয়ানার কথা বলা যায়। স্বাধীনতার পর দেশটি তাদের রাজধানী শহর স্থানান্তর করে। স্বাধীন দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অন্য আরেকটি কারণে এ সিদ্ধান্ত নেয় বতসোয়ানা সরকার। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর বতসোয়ানার পূর্বের রাজধানী তাদের নতুন সীমান্তের মধ্যে আর অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

জনসংখ্যাও কখনো কখনো রাজধানী স্থানান্তরে ভূমিকা রাখে। যেমন অষ্টাদশ শতাব্দীতে স্বাধীনতা অর্জনের পর ওয়াশিংটন ডিসিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে বাছাই করা হয়। দেশটির উত্তরাঞ্চলের শহুরে নাগরিকদের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিজীবী ক্রীতদাসদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির লক্ষ্য নিয়ে ওয়াশিংটন ডিসিকে রাজধানী বিবেচনা করা হয়েছিল। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার দুটি বড় শহর মেলবোর্ন ও সিডনি একসময় দেশটির রাজধানী হওয়ার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নামে। পরে ১৯১৩ সালে মেলবোর্ন ও সিডনির মধ্যবর্তী কম জনসংখ্যার শহর ক্যানবেরাকে অস্ট্রেলিয়ার নতুন রাজধানী করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে নির্বাচিত নেতাদের চেয়ে স্বৈরশাসকরা তাদের রাজধানী বেশি স্থানান্তর করেন। রাজধানী শহরের নাম পরিবর্তন করে তারা তাদের নাম সেখানে বসান। যেমন রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন তার রাজধানীর নাম রাখেন কনস্টানটিনোপল (আজকের ইস্তাম্বুল) আর আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট মিসরের রাজধানীর নাম দেন আলেক্সেন্দ্রিয়া। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও অনেক সময় রাজধানী শহরের স্থানান্তর হয়। ১৭৭৩ সালে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের অ্যান্টিগুয়াতে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পের ফলে ওই অঞ্চলের বেশির ভাগ দালান-কোঠা ভেঙে পড়ে। স্প্যানিশরা তখন গুয়েতেমালার রাজধানী গুয়েতেমালা সিটিতে স্থানান্তর করে।

দেশের কম উন্নত অঞ্চলে রাজধানী স্থানান্তরের সুবিধা রয়েছে বলে মনে করেন নগর-পরিকল্পনাকারীরা। এতে একদিকে জনবহুল উন্নত শহরের ওপর চাপ কমে আর অন্যদিকে অনুন্নত শহরের দ্রুত বিকাশ ঘটে। নাইজেরিয়া এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শুরুতে নাইজেরিয়ার রাজধানী ছিল লাগোস, যা ছিল দেশটির সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর। জনসংখ্যার পাশাপাশি লাগোসের কুয়াশা ও তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে আশির দশকে আবুজা শহরকে রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নেয় নাইজেরিয়া সরকার। আবুজায় সে সময় লাগোসের চেয়ে অনেক কম মানুষ বসবাস করত। তা ছাড়া নতুন ওই রাজধানী শহর নাইজেরিয়ার কেন্দ্রে অবস্থিত। একই ঘটনা দেখা গেছে ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও। দেশটির রাজধানী জাভা দ্বীপ থেকে সরিয়ে বোর্নিও দ্বীপে স্থানান্তরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের একটি-লাগোসের মতো জাভা দ্বীপের অতিরিক্ত জনসংখ্যা। জাভা দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর জাকার্তা এখন বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর।  

জলবায়ু পরিবর্তন

মনুষ্যসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে অনেক দেশ তাদের রাজধানী স্থানান্তরে বাধ্য হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সুনামি, বন্যা থেকে শুরু করে হারিকেনের মতো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে ফিলিপাইন। বিশেষ করে উপকূলে অবস্থিত দেশটির রাজধানী ম্যানিলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ম্যানিলা থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় লোকজনদের সরানো কঠিন। পাশাপাশি অকার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, সামাজিক সেবার ঘাটতিসহ দুর্বল অবকাঠামো ম্যানিলা শহরের পরিস্থিতি আরও নাজুক করে তুলেছে। ২০০৯ সালের এক বন্যায় শহরটির প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে ফিলিপাইন সরকার তাদের রাজধানী অন্য কোনো শহরে নিয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। অবশ্য তাতেও ফিলিপাইনের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসবে কি না সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

ফ্রান্সভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্থা অরগানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ও থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বন্যাপ্রবণ এলাকার তালিকায় যথাক্রমে তৃতীয় ও সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বৈশ্বিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ সংস্থা ম্যাপলক্রফটের আরেক প্রতিবেদন বলছে, ভারতের রাজধানী দিল্লি জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শহর। কয়েক বছর ধরে দিল্লির স্বাস্থ্যের জন্য প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বায়দূষণ। সম্প্রতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানজট ও ত্রুটিপূর্ণ নগর-পরিকল্পনা। ম্যাপলক্রফটের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুর রাজধানী লিমা মহাদেশটিতে জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ঝুঁকিপূর্ণ রাজধানী শহরগুলো অচিরেই মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।