উৎপাদনমুখী খাতে আরও কর কমানোর প্রস্তাব এমসিসিআইর

প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশের করহার বিবেচনা ও দেশে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের করপোরেট করহার আরও কমানোর প্রস্তাব করেছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই)। গতকাল বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রাজস্ব বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে এনবিআরের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ প্রস্তাব দিয়েছে এমসিসিআই। এছাড়া কভিড-পরবর্তী বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সরকারের বিশেষ সহযোগিতা চেয়েছে সংগঠনটি।

এমসিসিআইর নেতারা বলেছেন, গত দুই বছরে করপোরেট করহার ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হলেও প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় তা অনেক বেশি। ভারতে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের জন্য বেশি কর প্রণোদনা দেওয়া হয়। ভিয়েতনামেও একই সুবিধা দেওয়া আছে। বাংলাদেশে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ভারত এবং ভিয়েতনামের মতো কর কাঠামো নির্ধারণ করা যেতে পারে।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আমাদের দেশে অননুমোদিত ব্যয় এবং উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) এত বেশি যে, আমরা এ করপোরেট করহারের ৫ শতাংশ কমানোর সুবিধা ভোগ করতে পারছি না। বাস্তবে এ করপোরেট করহার পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ও প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে আর নির্দিষ্ট থাকে না, তা ক্ষেত্রবিশেষে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে যায়। সুতরাং বিষয়টি আবারও বিবেচনার আহ্বান জানান ব্যবসায়ীরা।

এমসিসিআইর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, পরপর দুই অর্থবছর করপোরেট কর কমানো হয়েছে। বর্তমানে করপোরেট কর ৩০ শতাংশ। আমি মনে করি, করপোরেট কর আরও কমানোর যৌক্তিকতা আছে, কিন্তু একটা ঝুঁকি আছে। রাজস্ব কমে যেতে পারে। কর আরও কমালে যে অভিঘাত আসবে, তা সইবার মতো ক্ষমতা আছে কি না, ভেবে দেখতে হবে।

করহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষার জন্য যা যা করা দরকার, তাই করা হবে। মেইড ইন বাংলাদেশের ধারণা আগামী বাজেটও অব্যাহত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা রাজস্ব প্রশাসন সহজ করতে চাই। একমাত্র অটোমেশনই পারে এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে। আমরা সেদিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।

এনবিআর চেয়ারম্যান আরও জানান, রাজস্ব আদায় করবে মেশিন। আর কর্মকর্তারা গবেষণা কাজ করবে। এনবিআরের নতুন সম্প্রসারণের প্রস্তাবে গবেষণা বিভাগকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ আসবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। এর জন্য কর নেট বাড়াতে হবে। কারণ নেট যত বাড়বে, রেট তত কমবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ব্যারিস্টার নিহাদ কবির বলেন, প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করপোরেট করহার এখনো বেশি। শিল্প খাতকে প্রতিযোগিতা করতে হলে এ হার কমাতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর দেশের করকাঠামো কেমন হবে, তা নিয়ে এখন থেকে কাজ শুরু করতে হবে।

সৎ ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য এনবিআরের চেয়ারম্যানকে বিশেষ অনুরোধ করেন নিহাদ। তিনি বলেন, লেবু বেশি চিপলে তিতা হয়ে যায়। যারা ট্যাক্স ফাঁকি দেয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

এমসিসিআইয়ের নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে উৎপাদনমুখী যেসব শিল্প খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তাদের জন্য কম হারে কর নির্ধারণ করা আছে। ভারত এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে কর কাঠামো নির্ধারণের প্রস্তাব করেন তিনি।

এমসিসিআইয়ের অন্য সদস্য হাবিবুল্লাহ করিম বলেন, করদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে দূরত্ব আছে। এ দূরত্ব কমাতে হবে। উভয়ের মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাস কাজ করে। কর্মকর্তাদের আচরণ এমন যেন সব ব্যবসায়ী ট্যাক্স ফাঁকি দেন। এ মানসিকতা দূর করতে হবে।

এমসিসিআই সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা অব্যাহতি চাই না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশোধনী চাই, যাতে করে আইন সহজ এবং করবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হয়। বিদ্যমান ভ্যাট আইনে কোনো কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার ৫ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে হলে বিআইএনের মাধ্যমে নিবন্ধিত হওয়ার বিধান রয়েছে। ভ্যাট ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় সব কোম্পানি মাসিক ভ্যাট রিটার্ন প্রদান করে থাকে। এনবিআর এর ইন্টিগ্রেটেড ভ্যাট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সিস্টেমে (আইভিএএস) যদি চালু থাকে তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাসিক ভ্যাট বিবরণী সমূহ আপলোড করতে পারবে। এতে কোম্পানি সমূহের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে। এ ব্যবস্থায় ঝামেলামুক্তভাবে ভ্যাট ব্যবস্থাপনার কলেবর বৃদ্ধি পাবে এবং রাজস্ব সংগ্রহও বৃদ্ধি পাবে।

আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন এনবিআরের সদস্য (শুল্কনীতি) মাসুদ সাদিক, সদস্য (ভ্যাটনীতি) জাকিয়া সুলতানা ও সদস্য (আয়করনীতি) সামসুদ্দিন আহমেদ।