পাকিস্তান থেকে পাঠানো হচ্ছে ভারতীয় জাল রুপি

ফজলুর রহমান পাকিস্তানের করাচি থাকেন। সেখানে মাফিয়াদের কাছ থেকে ভারতীয় জাল রুপি সংগ্রহ করে শুঁটকি মাছ, মোজাইক পাথর ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর সঙ্গে বস্তায় ভরে সমুদ্রপথে পাঠাত বাংলাদেশে। তাকে সহযোগিতা করত ভাই সাইদুর রহমান, নোমানুর রহমান ও ভগ্নিপতি শফিকুর রহমান। করাচি বন্দর থেকে শ্রীলঙ্কা হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের মাধ্যমে এগুলো পাঠানো হতো। পরে জাল রুপি খালাস করে গোডাউনে মজুদ ও বিভিন্ন কৌশলে ভারতে পাচার করা হতো।

গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর ডেমরা ও হাজারীবাগ এলাকা থেকে ভারতীয় রুপি জাল কারবারে জড়িত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তারা হলো আমানুল্লাহ ভূঁইয়া, কাজল রেখা, ইয়াসিন আরাফাত কেরামত ও নোমানুর রহমান খান। তাদের মধ্যে কাজল রেখা আইনজীবী এবং আমানুল্লাহ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সুনামগঞ্জ জেলা শাখার গাড়িচালক। কাজল রেখা আমানুল্লাহর দ্বিতীয় স্ত্রী। তাদের কাছ থেকে ১৫ লাখ ভারতীয় রুপির জাল সুপার নোট ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।

গতকাল বুধবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, ভারতে জাল রুপি পাচারে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করছে বাংলাদেশি দুটি পরিবার। এর মধ্যে একটি পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা পাকিস্তানের করাচিতে অবস্থান করে জাল রুপি সংগ্রহ করে। সেখানে চক্রের বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। তবে বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহারের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। ভারতে জাল রুপি পাচার ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান হাফিজ আক্তার।

গত বছর নভেম্বরে সাইদুর রহমান, আমদানিকারক তালেব ও ফাতেমা আক্তারকে ৭ কোটি ৩৫ লাখ ভারতীয় জাল রুপিসহ গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে খিলক্ষেত থানায় মামলা হলে তদন্তের ভার পায় ডিবি। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের অন্যতম সদস্য নোমানুর রহমান খানের সন্ধান মেলে। গত সোমবার ডিবি গুলশান বিভাগের একাধিক টিম পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোড এলাকা থেকে নোমানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। তার দেওয়া তথ্যে, গত মঙ্গলবার হাজারীবাগ এলাকা থেকে ইয়াসির আরাফাত ও আমানুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১২ লাখ জাল রুপি জব্দ করা হয়। একই দিন কাজল রেখাকে হাজারীবাগ এলাকা থেকে ৩ লাখ জাল রুপিসহ গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তাররা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, দীর্ঘদিন তারা পাকিস্তান থেকে ভারতীয় জাল রুপির সুপার নোট (৫০০/১০০০) কৌশলে সংগ্রহ করে বিভিন্ন পণ্যের ভেতর, ব্যক্তিগত বা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করে আসছিল।

ডিবিপ্রধান বলেন, জাল নোট পাচারকারী চক্রের কেন্দ্রে আছে মূলত দুটি পরিবার। এর একটি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে, নোমানুর রহমানের পরিবার। এ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য একটা সময় পাকিস্তানে ছিল। বর্তমানে পরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্য নোমানুরের ভাই ফজলুর রহমান করাচিতে রয়েছে। সেই মূলত বিভিন্ন কৌশলে জাল রুপি বাংলাদেশ পাঠাচ্ছে। আরেকটি পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বেনীচক গ্রামের গ্রেপ্তার কাজল রেখার। তার স্বামী আমানুল্লাহ, ভাই কেরামত, বোন শারমিন দোয়েল, ভগ্নিপতি সোনামিয়া, চাচা আয়নাল, ভাগ্নে ফিরোজ, কিবরিয়া, ভাতিজা নেলসনও সক্রিয় পাচারকারী। তারা প্রথম দিকে বিমানে আসা জাল রুপি কিনে লাগেজে করে কুরিয়ার বা শরীরে বহন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত দিয়ে পাচার করত। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি নাগরিক ফজলুর রহমানের সঙ্গে আমানুল্লাহর সরাসরি যোগাযোগ ছিল। ১ লাখ রুপির সুপার নোট ৩৮ হাজার রুপিতে বিক্রি হতো। কাজল রেখাসহ চক্রের সদস্যরা প্রতি লাখে ৩-৪ হাজার টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ পেত।

তিনি বলেন, চক্রের দেশি-বিদেশি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ভারতীয় জাল রুপিসহ অন্য কোনো বিদেশি মুদ্রা বাংলাদেশের রুট ব্যবহার করে পাচার ঠেকাতে আমরা সচেষ্ট রয়েছি। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের রুট ছাড়াও অন্য কোনো এলাকা ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

ডিবিপ্রধান আরও বলেন, চক্রের সদস্যরা জাল নোটের বিনিময়ে অস্ত্র-মাদক ও চোরাই মোবাইল দেশে নিয়ে আসত। জব্দ নোটগুলো পাকিস্তান থেকেই এসেছে। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি এগুলো জাল নোট এবং এত সূক্ষ্মভাবে তৈরি যে, আসল নোটের প্রায় কাছাকাছি মানের। এজন্য এগুলোকে সুপার নোট বলা হয়।