উচ্চ করহারে পিছিয়ে যাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগ : বিডা

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের উচ্চ করহার একটি বড় বাধা। প্রতিযোগী বিভিন্ন দেশ ও বিশ^ গড় করহারের তুলনায় বাংলাদেশের উচ্চ করের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। গতকাল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে প্রাক বাজেট আলোচনায় এমন মন্তব্য করেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কর্মকর্তারা। 

গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রাজস্ব বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেয় বিডা, যেখানে সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। আলোচনায় দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে করপোরেট করহার প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কমিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে বিডা। 

গতকালের প্রাক বাজেট আলোচনায় বিডার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ উন্নয়ন বিভাগের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নে করপোরেট করহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগে সবসময় পার্শ্ববর্তী এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর করপোরেট করহার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। বাংলাদেশে উচ্চতর করহারের কারণে অনেক আগ্রহী বিনিয়োগকারীও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন। তাই নতুন বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এই হার কমানো প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স, সোর্স ট্যাক্সসহ অন্যান্য করের কারণে করপোরেট করহারের সামগ্রিক করভার দাঁড়ায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশে। অথচ বৈশ্বিক করপোরেট করের গড় হার মাত্র ২১ থেকে ২৪ শতাংশ। ভিয়েতনামে করপোরেট করহার ২০ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ২৫ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ২৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের বর্তমান করপোরেট করহার আরও কমানো দরকার জানিয়ে মাহবুব বলেন, এটা কমাতে পারলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা যাবে, যা বাংলাদেশকে বিদেশিদের কাছে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করপোরেট করহার ৩০ শতাংশ। আগামী বাজেটে এই হার ২৮ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেন তিনি।

বিদেশি পরিচালকদের টিআইএন বাধ্যতামূলক রহিত করার দাবি জানিয়ে বিডার ডিজি বলেন, অর্থ আইন অনুযায়ী কোম্পানি গঠনে পরিচালকদের টিআইএন বাধ্যতামূলক। কিন্তু বড় মাপের বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বাংলাদেশে আসেন না বা ব্যবসায়িক ভ্রমণ ছাড়া অবস্থান করেন না। তাই তাদের জন্য টিআইএন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রহিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সের জন্য প্রতিষ্ঠানের বিদেশি পরিচালকরা দেশে অবস্থান করুক বা না করুক তাদেরও টিআইএন এবং ওয়ার্ক পারমিট দাখিল করতে হয়। এক্ষেত্রেও টিআইএন এবং পিআই (ওয়ার্ক পারমিট) ভিসা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

বিডার প্রস্তাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেইসবুক, গুগল বা অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও করপোরেট করের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠান কেবল ভ্যাট পরিশোধ করছে।

এ ছাড়া লভ্যাংশ আয়ের ওপর অগ্রিম কর কোম্পানির জন্য ২০ থেকে ১০ শতাংশ ও ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে বিডা। এ ছাড়া প্লাস্টিক খাতে কন্টিনিউয়াস বন্ডের অনুমতি দেওয়া, টেলিকম খাতের মোট প্রাপ্তির ওপর ন্যূনতম টার্নওভার কর কমানোসহ বেশকিছু প্রস্তাব দেয় বিডা।

ওই আলোচনা সভায় বিডা ছাড়াও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) এবং বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।

আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, করপোরেট করে অনেক বেশি ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিডা, বেজা, বেপজা-কে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আপনারা সবাই একযোগে করপোরেট কর কমানোর কথা বলছেন। আপনাদের কাছ থেকে এটা আশা করিনি। কিছু প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর এত বেশি ও দীর্ঘসময় ছাড় দেওয়া আছে যে, অনেক সময় ওই কোম্পানির কার্যক্রমই শেষ হয়ে যায়। তারপরও করের বোঝা যদি অতিরিক্ত হয়, তাহলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।