দুদকের সাহস-সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন হাইকোর্টের

দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাহস ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন এ সংস্থাটিকে আরও সক্রিয় হতে হবে। কঠিন হলেও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে হবে।

ঢাকা-৭ আসনের আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিমের বিরুদ্ধে করা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজার বহাল রাখার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট এ পর্যবেক্ষণ দেয়।

বিচারিক আদালতে হাজী সেলিমকে ১০ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছিল। এ সাজা বহাল রেখে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়। বিচারপতি মো. মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের স্বাক্ষরের পর ৬৩ পৃষ্ঠার এ পূর্ণাঙ্গ রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

রায়ে হাজী সেলিমকে ৩০ দিনের মধ্যে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়েছে। এ মামলায় জামিনে আছেন তিনি। তার আইনজীবী বলেছেন, তিনি আত্মসমর্পণ করবেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ‘হাজার হাজার দুর্নীতিগ্রস্তের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অর্থ ও সম্পদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে দুদকের তৎপরতা শুধু মিডিয়া কাভারেজের ওপর নির্ভর করছে।’ দুর্নীতিকে একটি মানসিক ব্যাধি আখ্যায়িত করে আদালত বলেছে, ‘শুধু সাজা শাস্তি দিয়ে এটি নির্মূল করা সম্ভব নয়।’

রায়ে হাইকোর্ট বলে, ‘সুবিধাবাদি ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি, গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের তালিকা করে কমিশন, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতের কর্তৃপক্ষ তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করে বার্তা দেবে। আমরা জানি এটা অনেক কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কারণ একজন সৎ ব্যক্তিও একজন দুর্নীতিবাজ ব্যক্তির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কিন্তু একটি আধুনিক দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও জাতি গঠনে আমাদের কোথাও না কোথাও থেকে শুরু করতে হবে।’

দুদকের উদ্দেশে হাইকোর্ট বলে, ‘আমরা লক্ষ করেছি, দুদক এখন পর্যন্ত এরকম হাজার হাজার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হয়নি। দুদককে আমরা সত্যিকার অর্থেই তৎপর দেখতে চাই যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করবে। তার জন্য আমরা সক্রিয় এবং কার্যকর একটি কমিশন দেখতে চাই, যে কমিশন সাংবিধানিক পদধারী বা সাধারণ কর্মচারী যেই হোন না কেন, তাদের খুঁজে বের করে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করবে।’

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাইকোর্টের এ রায়ের ফলে হাজী সেলিম আপিলের সুযোগ পেলেও তিনি সংসদ সদস্য পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। কেননা বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি অপরাধে দোষীসাব্যস্ত হওয়ার পর অন্তত দুই বছরের বেশি কারাদ-ে দ-িত হলে এবং তার মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন না। তাই চূড়ান্ত বিচারের আগেই তিনি আর এ পদে থাকতে পারেন না।’

অন্যদিকে হাজী সেলিমের আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রায়ের অনুলিপি আমরা পেয়েছি। এ অনুলিপি বিচারিক আদালতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি (হাজী সেলিম) আত্মসমর্পণ করবেন।’ তিনি বলেন, ‘এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। তাই চূড়ান্ত বিচারের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সেই পর্যন্ত তার এমপি পদে থাকতে বাধা নেই। আর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না সেটি দেখবে জাতীয় সংসদ ও স্পিকার। দুদকের তো এ বিষয়ে কিছু বলার এখতিয়ার নেই।’

এ মামলায় হাজী সেলিমের আপিল সংশোধন (আংশিক গ্রহণ ও আংশিক খারিজ) করে গত বছর ৯ মার্চ হাইকোর্টের এই বেঞ্চ তার ১০ বছরের সাজা বহাল রেখে রায় দেয়। এছাড়া বিচারিক আদালতের রায়ে তাকে দেওয়া ১০ লাখ টাকা অর্থদ- ও অনাদায়ে আরও এক বছর কারাদ-ের রায় বহাল থাকে। তবে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে হাজী সেলিমকে বিচারিক আদালতের দেওয়া তিন বছরের সাজা থেকে তাকে খালাস দেয় হাইকোর্ট।

এ মামলায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত যে সম্পদের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।

একই মামলায় হাজী সেলিমের স্ত্রী গুলশান আরা সেলিমকে সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে তিন বছর কারাদ- দিয়েছিল বিচারিক আদালত। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। হাইকোর্টের রায়ে তার আপিলটি বাতিল করা হয়েছে।

হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে ৬৭ কোটি ৪৩ লাখ ৯৬ হাজার ৭৪২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ৫৯ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ১৩২ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়। রাজধানীর লালবাগ থানায় ২০০৭ সালের ২৪ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে মামলা করে তখনকার দুর্নীতি দমন ব্যুরো (বর্তমানে দুদক)। বিচার কার্যক্রম শেষে ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত হাজী সেলিমকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ১০ বছর এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে তিন বছরের কারাদ-াদেশ দেয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবর হাইকোর্টে আপিল করেন হাজী সেলিম। ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি হাইকোর্ট রায়ে সাজা বাতিল করে তাকে খালাস দেয়। এরপর হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে দুদক। আপিলের শুনানি শেষে ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি আপিল বিভাগ হাজী সেলিমকে খালাস দিয়ে হাইকোর্টের ওই রায় বাতিল করে আপিলের পুনঃশুনানি করতে হাইকোর্টকে নির্দেশ দেয়।