সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পার হয়ে গেলেও বাংলাদেশ কর্র্তৃপক্ষ তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতিসংঘের পাঁচ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, বাংলাদেশে দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণেই এই বিচার হয়নি। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের দশক পূর্তি উপলক্ষে গতকাল শুক্রবার জেনেভার মানবাধিকার পরিষদের স্পেশাল প্রসিডিউরস থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তাদের এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের এই পাঁচ বিশেষজ্ঞ হলেন জাতিসংঘের মতপ্রকাশ ও বাকবাধীনতাবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার আইরিন খান, মানবাধিকারকর্মীদের অবস্থাবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার মেরি ললার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা ও সমিতি গঠনের অধিকারবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ক্লেমেন্ট এন ভৌল, নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অসম্মানজনক আচরণ বা শাস্তিবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার নিলস মেলজার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা বা বিধিবহির্ভূত হত্যাবিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার মরিস টিডবল-বিঞ্জ। যৌথ ওই বিবৃতিতে তারা বলেছেন, ‘বাংলাদেশে ভয়ংকর ও ব্যাপক দায়মুক্তির সংস্কৃতির ফলে দুই সাংবাদিক হত্যার এক দশক পরেও ন্যায়বিচার হয়নি।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এক দশকে বাংলাদেশে অন্তত ১৫ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনার তদন্ত বা বিচার খুব কমই হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে মনে করা হয়।’
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা যেসব অভিযোগ বাংলাদেশ সরকারের নজরে এনেছেন, সেগুলোর অনেকগুলোরই উত্তর পাননি তারা। ২০১২ সালে সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের পর জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের পাঠানো চিঠির ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধের যখন শাস্তি হয় না, তখন তা অপরাধীদের উৎসাহিত করে এবং গণমাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে আরও হামলা, হুমকি ও হত্যাকে উৎসাহিত করে। আমরা বাংলাদেশে সেই গভীর উদ্বেগজনক লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি।’
২০১৭ সালে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী আব্দুল হাকিম শিমুল হত্যার ঘটনার বিচার বারবার বিলম্বিত হওয়া নিয়েও বিশেষজ্ঞরা বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ হেফাজতে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় কর্র্তৃপক্ষ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
তারা বলেছেন, ‘আক্রমণ, ভয়ভীতি ও হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার সহজাত ঝুঁকি থেকে সাংবাদিকতা মুক্ত থাকা উচিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটাই বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের সদস্যদের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি খুন হন। সাগর তখন মাছরাঙা টিভিতে আর রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় ছিল তাদের সাড়ে চার বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ। এই মামলায় আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ৮৫ বার পিছিয়েছে।