শিক্ষামন্ত্রীর কথায় সন্তুষ্ট নন শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। গতকাল শুক্রবার শাবিপ্রবির আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে তাদের এ কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।

উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে গতকাল সিলেটে আসেন শিক্ষামন্ত্রী। বিকেলে তিনি সিলেট সার্কিট হাউজে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একদল প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখান থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পাসে উপাচার্যের সঙ্গে তার কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন। এর আগে সন্ধ্যা ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আফতাব উদ্দিন প্রামাণিক ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সচিব ফেরদৌস জামান।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের যে প্রথম দাবি উপাচার্যের পদত্যাগ এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য শুনেছি এবং সবটুকুই আমাদের আচার্যকে জানাব। কারণ আইন অনুযায়ী উপাচার্য নিয়োগ এবং অপসারণ এগুলো পুরোপুরি আচার্যের এখতিয়ার। আমরা তার কাছে আপনাদের যে যুক্তি এবং বক্তব্য পৌঁছে দেব এবং অবগত করব। তিনি তার বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব শাবিপ্রবিতে শিক্ষার সম্পূর্ণ একটা স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসুক।’

এদিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে যখন কথা বলছিলেন শিক্ষামন্ত্রী, তখন কড়া পুলিশি পাহারায় ২৬ দিন পর উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ বাসা থেকে বের হয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসার জন্য উপাচার্যের কার্যালয়ে যান। এ সময় উপাচার্যের গাড়ির সামনে-পেছনে বিপুলসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা শেষে শিক্ষামন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ বৈঠক শেষে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন শিক্ষামন্ত্রী।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম শিক্ষামন্ত্রীর বরাত দিয়ে সভার সিদ্ধান্ত বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘১৪ ফেব্রুয়ারি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। আর এ দিবসের আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য উপাচার্যকে বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী। শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, “এ ঘটনা (ছাত্রদের পুলিশের লাঠিপেটা) আপনার নির্দেশে ঘটুক আর না ঘটুক, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে এর দায়-দায়িত্ব আপনার ওপর এসে পড়ে। সে জায়গায় আমি হলে আমিও দুঃখ প্রকাশ করতাম। আপনি সবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করবেন। উপাচার্য সেটাই করেছেন”।’

এর আগে গতকাল বেলা ৩টার দিকে সিলেট সার্কিট হাউজে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। এ সময় শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদলে ছিলেন মুহাইমিনুল বাশার রাজ, ইয়াসির সরকার, নাফিসা আনজুম, সাব্বির আহমেদ, আশিক হোসাইন মারুফ, সাবরিনা শাহরিন রশীদ, সুদীপ্ত ভাস্কর, শাহরিয়ার আবেদিন, আমেনা বেগম, মীর রানা ও জাহিদুল ইসলাম অপূর্ব।

গতকাল সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে বিমানযোগে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান শিক্ষামন্ত্রী। সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সংশ্লিষ্টরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। এ সময় শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ তার সঙ্গে ছিলেন।

শিক্ষামন্ত্রী ক্যাম্পাস ছাড়ার পর শিক্ষার্থীরা গতকাল রাত ৯টায় প্রেস বিফ্রিংয়ে আসেন। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার জন্য আজ শনিবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত আন্দোলন ‘কৌশলগত বিরতির’ ঘোষণা দেন। তারা জানান, তাদের পাঁচ দাবি ও আট প্রস্তাবনা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তাদের মূল দাবি উপাচার্যের অপসারণ বা পদত্যাগের ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, উপাচার্যের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ আচার্যের কাছে পৌঁছে দেবেন।

শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুততম সময়ে ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে উপাচার্য পদ থেকে অপসারণ করে একজন গবেষণামনা, শিক্ষাবিদ ও অবিতর্কিত ব্যক্তিকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হোক, শাবিপ্রবিতে সব প্রশাসনিক পদে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া, অবিলম্বে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো তুলে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের সব অনলাইন লেনদেনের অ্যাকাউন্ট অবিলম্বে খুলে দেওয়া, পুলিশি হামলার শিকার শিক্ষার্থী সজল কুন্ডুকে এককালীন ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী অন্তত নবম গ্রেডের স্থায়ী সরকারি চাকরি দেওয়া।

প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ বার্ষিক বাজেটের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ গবেষণা খাতে বরাদ্দ করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা পিএইচডি ডিগ্রিতে উন্নীত করা, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে সে বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নির্দিষ্টসংখ্যক ডেমো ক্লাস নেওয়া, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ন্যূনতম ইভালুয়েশন মার্ক অর্জন করলেই তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা, নিয়োগকৃত শিক্ষকদের কাজে যোগ দেওয়ার আগে একটা আবশ্যিক ট্রেনিং দেওয়ার ব্যবস্থা করা, সমগ্র বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে গোপনীয় কোড ব্যবস্থা চালু করা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুলিশের জন্য সব স্থায়ী স্থাপনা অপসারণ করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আবাসিক হলগুলোকে বছরের ৩৬৫ দিনই সব সুযোগ-সুবিধাসহ খোলা রাখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব উন্নয়নমূলক কাজের পরিকল্পনা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং এসব কর্মকা-ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া, অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে উন্মুক্ত স্থাপত্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

নবনিযুক্ত প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি : গত ১০ ফেব্রুয়ারি নতুন প্রক্টর হিসেবে নিয়োগ পান ইশরাত ইবনে ইসমাইল। নবনিযুক্ত এ প্রক্টরের পদত্যাগ দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী ইয়াসির সরকার বলেন, সম্প্রতি এক শিক্ষার্থীর যৌন নিপীড়নের ঘটনায় উপস্থিত থাকলেও নবনিযুক্ত প্রক্টর ইশরাত ইবনে ইসমাইলের বিরুদ্ধে এক ব্যক্তিকে বাঁচাতে গিয়ে সেই ঘটনা অস্বীকার করার অভিযোগ রয়েছে। আমরা বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীকে অবহিত করেছি। শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়টি দ্রুত দেখবেন বলেছেন।

গত ১৩ জানুয়ারি রাত থেকে শুরু হওয়া বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্ট জাফরিন আহমেদ লিজা বিরোধী আন্দোলনে ১৬ জানুয়ারি পুলিশ লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে ৩০ শিক্ষার্থীকে আহত করলে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবি উঠে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয় কর্র্তৃপক্ষ। তবে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আমরণ অনশনসহ আন্দোলন অব্যাহত রাখেন শিক্ষার্থীরা। গত ২৬ জানুয়ারি অনশন ভাঙার পর অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক ইয়াসমিন হকের হাতে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগসহ পাঁচটি দাবি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তুলে দেন।

এরপর ৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক পদ থেকে অধ্যাপক জহির উদ্দিন আহমদকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সর্বশেষ প্রক্টরের পদ থেকে গত বৃহস্পতিবার আলমগীর কবীরকে অব্যাহতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের পাঁচ দাবির মধ্যে এ দুজনের অপসারণও ছিল।