ইদানীং দেশের বিভিন্ন রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। কয়েকদিনের কিছু সংবাদ শিরোনাম এমন : ভৈরবে এক বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে ৬৫ জনের মৃত্যু, নীলফামারীতে বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের ধাক্কায় প্রাণ গেল ৩ শ্রমিকের (২২ জানুয়ারি ২০২২), ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ট্রেনের ধাক্কায় সালমা (২৫) নামের এক যুবতী নিহত (২৭ জানুয়ারি, ২০২২), রাজধানীর কারওয়ান বাজারে রেলগেট এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় মো. মনির হোসেন (৪৮) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন (২৪ জানুয়ারি, ২০২২), বগুড়ায় ট্রেনের ধাক্কায় জোহরা বেওয়া (৯০) নামের এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন (২০ জানুয়ারি, ২০২২), গাজীপুরের কালীগঞ্জ ও পূবাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত দুই যুবক নিহত হয়েছেন (১৮ জানুয়ারি ২০২২), বগুড়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে মনিষা রহমান স্বর্ণা (১৬) নামের এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে (১৭ জানুয়ারি ২০২২) এসব খবর আমাদের সংকটের কথাই বলছে। এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগই রেলক্রসিংয়ে ঘটছে। এই অবস্থায় ট্রেন দুর্ঘটনা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।
রেলওয়ের হিসাবে, ২০১৪ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত ছয় বছরে রেলে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৭৫ জন। এর মধ্যে ১৪৫ জনই প্রাণ হারিয়েছেন রেলক্রসিংয়ে। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতি বছর ১৭৮ জন মানুষ রেললাইনে মৃত্যুবরণ করছে। রেলওয়ের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে মোট রেলক্রসিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬১। এগুলোর মধ্যে অনুমোদন নেই ১ হাজার ৩২১টির। সরকারের কমবেশি পাঁচটি সংস্থা রেললাইনের ওপর সড়ক নির্মাণ করে থাকে। এসব ক্রসিংয়ের বেশির ভাগই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সড়কে। এছাড়া গ্রামীণ সড়ক রয়েছে। রেল বিভাগেরও কিছু রেলক্রসিং আছে। হিসাব বলছে, দেশের ৮০ শতাংশের বেশি রেলক্রসিংই অরক্ষিত। আর এ কারণে লেভেল ক্রসিং দিন দিন পরিণত হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে। প্রতিনিয়তই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। পঙ্গুত্ববরণ করছেন অনেকে। দুর্ঘটনা ঘটার পর বরাবর তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়সারা হয়। কিন্তু পরে কী হলো বেশিরভাগই অন্ধকারে থেকে যায়। কারণ ও প্রতিকারের ব্যবস্থার প্রস্তাব জনসচেতনার জন্য আলোয় আসার দরকার বলে মনে করি।
বিভিন্ন পত্রিকার সূত্রমতে, রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের ৩৫ কিলোমিটার রেলপথে ৫৮টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এরমধ্যে ২৩টি অরক্ষিত ও অননুমোদিত। কিছু কিছু স্থানে গেটম্যান ও সিগন্যাল-বার নেই। কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত অংশকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রেলওয়ে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এরই মধ্যে এসব ক্রসিংয়ের ৯টিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। অথচ এসব ক্রসিংয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। ঢাকা মহানগরীতে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে যে ৯টি রেলক্রসিং চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো : মগবাজার, মালিবাগ, তেজগাঁও, সায়েদাবাদ, বিএফডিসি, বনানী, কুড়িল, মহাখালী ও খিলগাঁও রেলক্রসিং। রেলওয়ে সূত্র জানায়, শুধু ঢাকার কুড়িল রেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯০-বার ট্রেন চলাচল করে। নগরীতে শুধু রেলক্রসিংই অরক্ষিত নয়, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে রেললাইনও। প্রতিনিয়ত ট্রেনে কাটা পড়ে মরছে মানুষ। তারপরও নেই সচেতনতা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব রেলক্রসিংয়ে মানুষ ও যান চলাচল করে থাকে।
ট্রেনে কাটা পড়ে আহত ও নিহতের সংখ্যা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। কেউ সেলফি তুলতে গিয়ে, কেউ মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন দিয়ে হাঁটার সময়, কেউ হেডফোনে গান শুনতে শুনতে অসতর্কতাবশত হাঁটতে গিয়ে স্লিপারে পা পিছলে, ঘনবসতি এলাকা দিয়ে ট্রেন চলাচলের সময় ট্রেনের হুইসেল শুনতে না পাওয়া, গেটগুলোর আশপাশে দাঁড়িয়ে মাদক বিক্রি, নেশাগ্রস্ত হয়ে রেললাইনে চলাচল, আঁকাবাঁকা পথে ট্রেন দেখতে না পাওয়া, ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করায় ট্রেনে কাটা পড়ছেন বা পঙ্গুত্ববরণ করছেন বলে কারণগুলো বেরিয়ে এসেছে।
রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, রেলপথের দুই পাশে ১০ ফুট এলাকায় চলাচল আইনত স¤পূর্ণ নিষিদ্ধ। ওই সীমানার ভেতর কেউ প্রবেশ করলে তাকে গ্রেপ্তারের বিধান রয়েছে। এমনকি ওই সীমানায় গবাদিপশু প্রবেশ করলে তা বিক্রি করে এর অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। রেলওয়ে আইন ১৮৯০-এর ১২৮ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ট্রেনের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে বা বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তার সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদন্ড হবে। রেল বিভাগ রেললাইনের ওপর দিয়ে রাস্তা নেওয়াকে সেই ধরনের অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। ফলে দুর্ঘটনার দায় তারা নিতে চায় না। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রেলওয়ে গতানুগতিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রায় সব প্রতিবেদনেরই ভাষা, সুপারিশ ও দায়ী করার পদ্ধতি একই। আবার জনবল সংকটও রয়েছে। রেলক্রসিংগুলোর অবস্থা কমবেশি এরকমই। গেট আছে তো গেটম্যান নেই। গেটম্যান আছে তো সিগন্যাল বাতি নেই। ঝুঁকিপূর্ণ এসব লেভেল ক্রসিংগুলোতে রেল কর্তৃপক্ষ শুধু ‘সামনে রেলক্রসিং, সাবধানে চলাচল করুন’এমন কিছু সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড টানিয়ে দায়িত্ব পালন সারার চেষ্টা করে থাকে। রেলওয়ে আইন অনুযায়ী লেভেল ক্রসিংয়ের দুর্ঘটনার দায় নিতে রাজি নয় রেল কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, পাথর-নিক্ষেপ করে ট্রেনের যাত্রীদের রক্তাক্ত করা হচ্ছে। রাজধানী ও গাজীপুর জেলাসহ বেশ কিছু রেললাইনে এমন ঘটনা ঘটছে। লেভেল ক্রসিংয়ে সড়ক নির্মাণের সময় রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় করা দরকার। সওজ অল্প কিছু মহাসড়কে রেললাইনের ওপর উড়াল সড়ক নির্মাণ করেছে। এর পরিমাণ আরও বাড়ানো যেতে পারে। রেলের নিজস্ব কিছু ক্রসিংয়ে পাহারাদার থাকলেও তাদের বেশির ভাগই অস্থায়ী। জনবল নিয়োগ, ব্যারিকেড বসানো, পাহারাদার নিয়োগ ইত্যাদি বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনা করার দরকার বলে মনে করি।
সর্বোপরি দরকার জনসচেতনা সৃষ্টি। সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। বিভিন্ন লেভেল ক্রসিংয়ে (বিশেষ করে রাজধানী ও আশপাশে) মাইকিং করে, প্রচারপত্র বিলি করে, রেললাইনের পার্শ্ববর্তী বস্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করে দুর্ঘটনা কমানো যেতে পারে।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক
abuafzalsaleh@gmail.com