পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু ‘হিজাব’। কর্ণাটকের কলেজছাত্রী মুসকান খানকে হিজাব পরতে বাধা দেওয়া ও তার প্রতিরোধের ভিডিও নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। যে দেশে এ ঘটনা সে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতির মূল আলোচনায় চলে এসেছে হিজাব ইস্যু। ভারতের কংগ্রেস দলের নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেছেন, ‘বিকিনি, ঘোমটা, জিন্স কিংবা কী পোশাক পরবেন তা নারীর একান্তই ব্যক্তিগত পছন্দ, ভারতের সংবিধান তাদের সে অধিকার দিয়েছে।’ অন্যদিকে যারা হিজাবের বিরোধিতা করছে তারা ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি সমর্থিত। ফলে দিন শেষে এই বিতর্কে রাজনৈতিক পক্ষপাত রয়েছে।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের দেশ ভারতে শত শত সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী নিজেদের আচার পালন করছে, নিজস্ব পোশাক পরছে। অন্যদিকে হিজাব নিয়ে এর আগেও বাধা এসেছে। এর দুটি কারণ আলোচনায় আসছে। এক. ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, দুই. বিশ্বরাজনীতিতে চলমান ইসলামফোবিয়া। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গর্ব করে। শুধু মুসলিম কেন সাংবিধানিকভাবে অগুনতি ধর্মীয়, নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর অধিকার সমুন্নত রাখার কথা ভারতের। দেশটির লোকসভায় সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী নিজ নিজ অঞ্চলের পোশাক পরে। এমনকি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও তার বিশ্বাসের ধর্মীয় পোশাক পরে। ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গর্বের জায়গা থেকে হরভজন সিং ক্রিকেট মাঠে তার নিজস্ব ধর্মের পাগড়ি পরিধান করে বিশ্বকাপ খেলেছে। অন্যদিকে, ভারতের রাজনীতিতে পাকিস্তান একটি বড় ইস্যু। সে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে, আরও স্পষ্ট করে বললে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ভারতের মুসলমানদের ‘এন্টি ন্যাশনালিস্ট’ গালি দিয়ে রাজনীতির জল ঘোলা করা যায়। ফলে আসাম হোক, এনআরসি, সিএএ বা কর্ণাটকের হিজাব ইস্যুতে হোক, হিন্দু-মুসলিম বিতর্ক উসকে দেওয়া গেলে রাজনীতির খেলাটা জমে। এদিকে, ৯/১১ হামলার পর বিশ^জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ইসলামফোবিয়ার কারণে বিশ্বব্যাপী নানাভাবে নানা জায়গায় মুসলিমরা ভুক্তভোগী হয়েছে। শাহরুখ খানের মতো একজন ‘মডার্ন মুসলিম’কেও পশ্চিমা বিশ্বের বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এটার কারণ তার নামের পাশে থাকা মুসলিম বংশীয় নাম ‘খান’। শাহরুখ খানকে তাই সিনেমা করে বলতে হলো, ‘My name is Khan, I am not a terrorist’’।
হিন্দু ধর্মের একজন বিবাহিত নারী শাখা-সিঁদুরকে তার জন্য আবশ্যকীয় মনে করলে এটা তার অধিকার। তেমনি ইসলাম ধর্মের নারীর হিজাবও তার অধিকার। ফলে কোনো ধরনের ধর্মীয় আচার, পোশাক বা চিহ্ন যখন চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন তার বিরুদ্ধে যেমন দাঁড়াতে হবে, তেমনি কেউ তার বিশ্বাসকে ধারণ করতে চাইলে তার পক্ষেও দাঁড়াতে হবে। কিন্তু ভিন্ন সংস্কৃতিকে মেনে না নেওয়ার একটা প্রবণতা আমাদের রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে যারা হিজাবের বিরোধিতা করে তাদের বেশির ভাগের যুক্তি, ‘এটা তাদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে অগ্রহণযোগ্য’। এখানে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অপর সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে পশ্চিমারা ব্যর্থ, যা তাদের ‘আধুনিক’ চিন্তা-ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একই ভাষা, একই আচরণ ও ভাবভঙ্গি দুটি ভিন্ন সংস্কৃতিতে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের জন্য নৃবিজ্ঞানীরা সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতার ওপর জোর দিয়েছেন। স্বজাত্যবোধ যেখানে উগ্র জাতীয়তাবাদকে উৎসাহী করে সেখানে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির প্রথা, মূল্যবোধ ও রীতিনীতির মধ্যে সংযোগ সংহত করে। সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের অন্যতম তাত্ত্বিক ফ্রাঞ্জ বোয়াস বলেছেন, নির্দিষ্ট সংস্কৃতির বিশ্বাস ও মূল্যবোধ দিয়ে অন্য সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করা যাবে না। আরেক সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী আর বি টাইলরও বলেছেন, প্রতিটি সংস্কৃতির প্রথা ও রীতিনীতিসমূহকে সংস্কৃতির বাস্তবতার নিরিখেই মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থাৎ হিজাব কিংবা শাখা-সিঁদুর যার যার কাছে কতটা গুরুত্ববহ তা তাদের বিশ্বাসের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করতে হবে। বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে যে অন্য সংস্কৃতি, ধর্ম, আচার ও ভাষাকে দমন করা হয় তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বজাত্যবোধ থেকে আসে। এই স্বজাত্যবোধের সঙ্গে উগ্র জাতীয়তাবাদ জড়িত। মিয়ানমারে যখন রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয় তখন এই উগ্র জাতীয়তাবাদী স্বজাত্যবোধের ধারণা কাজ করেছে। স্বজাত্যবোধ এমন এক ধরনের মানসিকতা যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সংস্কৃতির মানুষ নিজের সংস্কৃতিকে অন্যান্য সংস্কৃতি থেকে উন্নতর ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। এই ধরনের ‘Superiority Complex’-কে মানববিজ্ঞানী রবার্ট ই হাওয়ার্ড ‘Cultural Chauvinism’ বলেছেন। নৃবিজ্ঞানী ব্রাউজ রিজ অবশ্য এই আলোচনায় জেনোফোবিয়াকে নিয়ে এসেছেন, যেখানে অন্য সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষের মধ্যে অহেতুক ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করে। এই জেনোফোবিয়া তৈরির সঙ্গে আবার রাষ্ট্রের রাজনীতি জড়িত।
অনেকে বলার চেষ্টা করেন ছোট একটি আচার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে? চর্চা, বিশ্বাস ও আনুষ্ঠানিকতায় সংস্কৃতি বয়ে চলে, মানুষে মানুষে ভিন্নতা তৈরি হয়। যেমন : পৃথিবীর সব মানুষ যার যার রীতি অনুসারে খাবার গ্রহণ করে। আবার চীন ও জাপানের মানুষের খাবার গ্রহণে যে কাঠি ব্যবহার করে আমরা তা করি না। মানববিজ্ঞানীরা এসবকে Smallest units of cultural traits বলে অভিহিত করেছেন। ফলে এসব ছোট ছোট আচারকে পালন করতে না দিলে সে সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর স্বতন্ত্রবোধই থাকে না। আমাদের মধ্যে নিজ পছন্দের বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া বা গ্রহণ করার প্রবণতাও লক্ষণীয়। আমাদের দেশের ডানপন্থিরা মুসকান খানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে, ‘আল্লাহু আকবর’ বলে তার প্রতিবাদকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু তারা দেখছে না মুসকান নিজে স্কুটি চালিয়ে তার নিজের কলেজে যায়। আমাদের দেশে মেয়েরা স্কুটি চালালে তারাই আবার এটার বিরোধিতা করে। ওয়াজ মাহফিলে যখন নারীদের ঘরবন্দি করতে বলা হয় তখন তারাই বাহবা দেয়। মুসকানের প্রতি সংহতি জানানো অনেকেই আবার নারীর উচ্চশিক্ষারও বিরোধী।
মুসকান খানকে যে হিজাব পরতে বাধা দেওয়া হচ্ছে সেটা তার পোশাকের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ। অথচ পোশাক যখন চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন যেমন এর বিপক্ষে দাঁড়াতে হবে, তেমনি পোশাক যখন অধিকার তখন তার পক্ষেও দাঁড়াতে হবে। মুসকানের পাশে দাঁড়িয়েছে মুসকানের হিন্দু শিক্ষকরা, হিন্দু বন্ধুরা। তার বন্ধুরা তাকে ফোন করে বলেছে তারা মুসকানের পাশে আছে। দিল্লিসহ সারা ভারতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা মুসকানের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। এটা তারা তাদের দায়িত্ববোধ থেকে করেছে। আমাদের দেশেও অন্য সংস্কৃতি ও আচার ও বিশ্বাসের ওপর আঘাত এলে আমরাও যেন সম্মিলিতভাবে দাঁড়াই। নারীকে ঘরবন্দি রাখার প্রবণতা যেন আমরা রুখে দিই। মুসকান হয়ে ওঠার জন্য নারীকে স্বাধীনভাবে চলার অধিকার দিতে হবে। চিন্তার স্বাধীনতা দিতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লি