রাজনৈতিক ভোল পাল্টানো কোনো লোককে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চান না গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতারা। একই সঙ্গে নির্বাচনের সময় কর্তৃত্ব নিয়ে বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনহ নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের নেতৃত্ব দিতে পারবেন এমন যোগ্যতাসম্পন্ন, সৎ ও সাহসী ব্যক্তিকে এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুপারিশ করতে সার্চ কমিটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। ইসিতে যেন কোনো বিশেষ পেশার প্রাধান্য না থাকে, সে বিষয়টিও বিবেচনা করতে বলেছেন সাংবাদিক নেতারা।
ইসি গঠনে যোগ্য ব্যক্তি খুঁজতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার চারজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মতামত নেয় কমিটি।
আলোচনার জন্য আটজনকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও এতে অংশ নেন চারজন। তারা হলেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান বুলবুল, চ্যানেল আইয়ের বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম ও বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সম্পাদক ইনাম আহমেদ চৌধুরী।
কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির মেয়াদ ১৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এবারই প্রথম নতুন আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগে সুপারিশ করতে ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করে দেন রাষ্ট্রপতি। ইসির জন্য যোগ্য ব্যক্তি খুঁজতে গত শনিবার নাগরিক সমাজের ২৫ প্রতিনিধি এবং রবিবার আরও ১৮ বিশিষ্টজনের মতামত নেয় সার্চ কমিটি। সার্চ কমিটি সিইসি ও অপর কমিশনারদের প্রতি পদের জন্য ২ জন করে মোট ১০ জনের নাম প্রস্তাব করবে। এই ১০ জনের মধ্য থেকে সিইসিসহ ৫ জনকে নিয়ে ইসি গঠন করবেন রাষ্ট্রপতি।
বৈঠক শেষে মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘কর্তৃত্ব নিয়ে কাজ করতে পারবেন, নির্বাচনের সময় যারা নির্বাচনকাজে যুক্ত সবাইকে নিয়ে নেতৃত্ব দিতে পারবেন এমন যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা উচিত বলে মত দিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যাদের নাম তালিকায় এসেছে তাদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া দরকার। কেউ সুবিধা নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক ভোল পাল্টিয়েছেন কি না, আর্থিক কোনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে তাদের কেউ সম্পৃক্ত কি না, এ বিষয়টি দেখতে বলেছি।’ সব পেশার প্রতিনিধি নিয়ে একটা ভারসাম্য কমিশন করা উচিত এবং কোনো বিশেষ পেশার প্রাধান্য যেন না থাকে, সে বিষয়টি সার্চ কমিটিকে বিবেচনা করতে আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া যোগ্যতার নিরিখে বিবেচিত হলে ইসিতে একজন নারী ও সংখ্যালঘু থাকা উচিত বলে মত দেন তিনি।
ব্যক্তিগত অভিমতে মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, ‘৩২২ জনের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি ঠিক হয়নি। তালিকায় থাকা অনেকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা জানেন না যে তাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তালিকায় নাম থাকাতে তারা খুশি হলেও কোনো কারণে যদি চূড়ান্ত তালিকায় নির্বাচিত না হন, তাহলে তারা একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়বেন। শুধু তা-ই নয় বিগত নির্বাচন কমিশনে কার প্রস্তাবনায় কে কমিশনার হয়েছেন, সেটি জানাজানি হওয়ার কারণে শুরুর দিন থেকেই আমরা জেনেছি উনি এই দলের প্রার্থী, তিনি ছিলেন ওই দলের প্রার্থী। ফলে পুরো নির্বাচন কমিশন তাদের মেয়াদকালে এক হতে পারেনি।’ ইসিতে একজন মুখপাত্র রাখার পক্ষেও মত দেন তিনি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, ‘নির্বাচন একটা সর্বজনীন বিষয়। গ্রহণযোগ্যতার বিষয়। নির্বাচন যাতে সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, এটি সর্বজনীনতা লাভ করে এমন মানুষের নাম তারা (সার্চ কমিটি) যেন উপস্থাপন করেন। যাতে কোনো বিতর্ক থাকেবে না এবং সবাই গ্রহণ করবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনে বেসমারিক প্রশাসন, সামরিক প্রশাসন এবং নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে একটা দিকনির্দেশনা, কঠোর হুঁশিয়ারের মধ্য থেকে নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবেন সেই ধরনের মানুষদের নাম এখানে (প্রস্তাবিত তালিকা) আছে। এখন সেই নামগুলো গ্রহণ করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা হয়।’
সার্চ কমিটির সুপারিশকৃত ১০ জনের নাম প্রকাশ করা উচিত হবে কি না এমন প্রশ্নে নঈম নিজাম বলেন, ‘আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেহেতু মানুষের অনেক বেশি আগ্রহ, দেশের মানুষ অপেক্ষা করে আছে আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে। এখন প্রত্যাশার জায়গা যারা পূরণ করবেন, নির্বাচন নিয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন তাদের নাম জনসমক্ষে আসতেই পারে। কিন্তু এটি করতে হবে তাদের মতামত নিয়ে।’
আলোচনা শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ তালিকায় থাকা নামগুলো মোটামুটি এডিট করে ফেলেছে। আগামীকাল (আজ) সার্চ কমিটির নামগুলো উপস্থাপন করা হবে। এরপর কমিটি কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করে এখান থেকে সিলেকশনের দিকে যাবে। তালিকায় আসা ব্যক্তিদের নাম তাদের সম্মতি নিয়ে প্রকাশ হয়েছে কি না, সেটিও সার্চ কমিটি বিবেচনা করবে।’ মতামত নিতে আর কাউকে আলোচনায় ডাকা হবে না বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।