হত্যা মামলার আসামিদের রক্ষার আয়োজন পুলিশের!

হত্যা মামলায় সাক্ষীদের সঙ্গে কোনো কথা না বলেই মনগড়া জবানবন্দি আদালতে উপস্থাপন এবং সেই জবানবন্দিতে মূল চার আসামি সম্পর্কে সাক্ষীদের বক্তব্য না থাকাকে আসামিদের রক্ষার আয়োজন হিসেবে দেখছে ভুক্তভোগী পরিবার। তাদের অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা আসামিপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে দুর্বল অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছেন।

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলায় হামলা নিহত একটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন খানের (২৭) পরিবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন।

জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর সকালে হামলায় নিহত হন সুমন খান। তিনি ঢাকার ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৬ষ্ঠ সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন। সুমন ওই উপজেলার পূর্ব ভাকুড়ী গ্রামের মো. আলী খানের ছেলে।

এ ঘটনায় নিহত সুমনের ভাই রুহুল আমিন খান রিপন বাদী হয়ে ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত পরিচয়ের ১৫ থেকে ২০ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুকসুদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলো হুমায়ুন কবির খান ওরফে বিল্লাল, মইয়ার শেখ, মঞ্জুর শেখ, মুকুল শেখ,দুলাল মোল্লা, লুৎফর শেখ, কবির শেখ, ইবাদ শেখ, রুহুল শেখ, রুবেল শেখ, এনায়েত শিকদার, মোস্তফা শিকদার, সুজন শিকদার, আতিক শেখ, মনির শেখ ও ফোরকান শিকদার।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবেশী হুমায়ুন কবির খান ওরফে বিল্লালের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা ও বিষয় সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছিল বাদী রুহুল আমিন খান রিপনের পরিবারের। ঘটনার দিন রিপন, তার বাবা মো. আলী খান ও ভাই সুমন খান ঢাকপাড়ার হাজরাতলা মোড়ে নিজেদের মুদি দোকান খোলার জন্য গেলে হুমায়ুন কবির ও তার লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে হামলা করে। এতে গুরুতর জখম হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সুমন খান।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, বিল্লালের রাম দায়ের আঘাতে সুমন মাথায় গুরুতর জখম হন।

মামলাটি তদন্ত করে গত বছর ২৪ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা মুকসুদপুর থানার পরিদর্শক খন্দকার আমিনুর রহমান। অভিযোগপত্রে এজাহারভুক্ত এক নম্বর আসামি হুমায়ুন কবির খান ওরফে বিল্লাল, ৯ নম্বর আসামি রুহুল শেখ, বারো নম্বর আসামি মোস্তফা শিকদার ও ষোল নম্বর আসামি ফোরকান শিকদারের নাম নেই।

তাদের বিষয়ে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, হুমায়ুন কবির ওরফে বিল্লালের ব্যবহৃত ফোনের অবস্থান, তথ্য অনুসন্ধান ও পর্যালোচনায় দেখা গেছে ঘটনার সময় তিনি কাশিয়ানী থানাধীন ডহর দুর্গাপুর তার শ্বশুরবাড়ির এলাকায় ছিলেন। রুহুল আমিন শেখ ঘটনার আগের দিন থেকেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ফোরকান শিকদার ঘটনার সময় মুকসুদপুর উপজেলা পরিষদ এলাকায় ও মোস্তফা শিকদার ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।

কিন্তু মামলার বাদী সুমন খানের ভাই রুহুল খান রিপন অভিযোগপত্রে ওপর নারাজি দেন।

২০ জন সাক্ষীর জবানবন্দি দেশ রূপান্তর পেয়েছে। সবগুলো জবানবন্দিতে একই ধরনের বক্তব্য লেখা রয়েছে। যে চার আসামির নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে সাক্ষীদের জবানবন্দিতে তাদের বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই। এমনকি নিহত সুমনের ভাই, বাবা ও নিকটাত্মীয়দের জবানবন্দিতেও ওই চার আসামির বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই।

যাদের জবানবন্দি আদালতে জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা আমিনুর রহমান তাদের মধ্যে ৯ জন গত বছরের ১৪ অক্টোবর হলফনামার (নোটারি) মাধ্যমে আদালতকে জানিয়েছেন যে জবানবন্দির বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। এ সাক্ষীরা হলেন নিহত সুমনের বাবা মো. আলী খান, ভাই মো. মারুফ খান ও মো. রাজু খান, প্রতিবেশী শাকিল আহমেদ ওরফে লেবু খান, আবু শিকদার, সিরাজ শেখ, মাছেম শেখ, রফিক খান ও নজরুল শেখ।

পৃথক হলফনামায় তারা প্রত্যেকে বলেছেন যে তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাদের কাছে আসেননি। থানায়ও তাদের ডাকেননি। আসামিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভিন্ন কাহিনী বর্ণনা দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা ১৬১ ধারায় জবানবন্দি নিজে লিখে আদালতে দাখিল করেছেন।

মামলার বাদী রুহুল আমিন খান রিপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রথম থেকেই থানা পুলিশ তাদের অসহযোগিতা করেছে। তিনি দাবি করেন, ‘তদন্তের সময় আমরা জানতে পারি থানায় ২০ লাখ টাকার বেশি দিয়েছে আসামিরা। পরে আরও টাকা  লেনদেন হয়েছে বলে শুনেছি। থানা পুলিশ সঠিক তদন্ত করবে না বুঝতে পেরে মামলাটি পিবিআইকে দিয়ে তদন্তের জন্য আবেদন করেছিলাম।’

রিপন অভিযোগ করেন, গত বছরের ৭ মার্চ মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দিয়ে তদন্তের অনুরোধ জানিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে আবেদন করেন তিনি। এরপরই তড়িঘড়ি করে এপ্রিল মাসে মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

অভিযোগপত্রের বিষয়ে বাদী আদালতে নারাজি দিলে মামলাটি আবার তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন আদালত। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পিবিআইয়ের গোপালগঞ্জ ইউনিটের পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম।

সুমনের পরিবারের অভিযোগ, থানা পুলিশ যে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছে তাতেই মামলাটি একপ্রকার নষ্ট করে দিয়েছে। এখন পিবিআইও ধীরগতিতে এগুচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, আসামিপক্ষ প্রথমে মীমাংসার জন্য তাদের চাপ দিয়েছিল। তারা রাজি না হওয়ায় আসামিরা উল্টো অন্য লোকদের দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ঘর পোড়ানো, বাড়ি ভাঙচুর-লুটপাট ও মারামারির মামলা। ঘর ভাঙচুর ও পোড়ানোর মামলার বাদীর সঙ্গে সুমন হত্যা মামলার ৬ নম্বর আসামি লুৎফর শেখের ফোনে কথোপকথনে টাকা লেনদেনের বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই কথোপকথনের অডিও রেকর্ড দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। এ ছাড়া এসব মামলায় পুলিশকে টাকা দিয়ে সুমনের পরিবারকে চাপে রেখেছে বলে তাদের অভিযোগ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা মুকসুদপুর থানার পরিদর্শক খন্দকার আমিনুর রহমান গত সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব সাক্ষীর সঙ্গে একাধিকবার কথা বলে এরপর চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। মামলার চার্জশিটটি অত্যন্ত সুন্দর হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

মামলাটির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটি বেশিদিন আমার হাতে আসেনি। এখনো বলার মতো কিছু নেই।’