এবারের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় সারা দেশের ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। গত রবিবার প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, চট্টগ্রামের দুটি, দিনাজপুরের দুটি ও ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। এবার শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১ হাজার ৯৩৪।
দিনাজপুর বোর্ডের অধীন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বড়াইবাড়ী কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে তিন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেন। একই বোর্ডের ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছিলেন একজন ছাত্রী। এ দুটি কলেজের এমপিও নেই।
আমাদের রংপুর প্রতিনিধি জানান, গঙ্গাচড়ার বড়াইবাড়ী, নোহালী, আলমবিদিতর, বড়বিল ও কোলকোন্দ এলাকায় বড়াইবাড়ীই একমাত্র কলেজ। গত সোমবার বিকেল ৩টায় সরেজমিনে কলেজে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় লোকজন জানান, ভর্তি ও পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় অধ্যক্ষসহ দু-একজনকে দেখা যায়। অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম রংপুরের বাসায় থেকে কলেজ পরিচালনা করেন। তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কলেজটি ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৯ সালে স্বীকৃতি লাভ করে। ২০১৭ সালে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন সিরাজুল ইসলাম।
সূত্র মতে, প্রতিষ্ঠাকালে কলেজটির নামকরণ হয় মুক্তিযোদ্ধা আদর্শ মহাবিদ্যালয়। এরপর বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসলে নামকরণ হয় শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজ। একাধিকবার নাম পরিবর্তন ও ম্যানেজিং কমিটির দ্বন্দ্বের কারণে কলেজের পড়ালেখার মান খারাপ হয়ে গেছে।
কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নুর ইসলাম লাভলুু দেশ রূপান্তরকে বলেন, কলেজ প্রতিষ্ঠার পর অনেক শিক্ষক-কর্মচারী ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। দীর্ঘ দিন ধরে বেতন না পাওয়ায় তারা হতাশ। এ কারণে সঠিকভাবে লেখাপড়া হয় না।
দর্শন বিভাগের প্রভাষক শাফিয়া ইয়াসমিন দেশ রূপান্তরকে জানান, সিরাজুল ইসলাম অধ্যক্ষ পদে যোগ দেওয়ার পর শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। অধ্যক্ষ কলেজে আসেন না বলে অন্য শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত আসেন না। তা ছাড়া গত দুই বছর ধরে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ঠিকমতো ক্লাস হয়নি বা টেস্ট পরীক্ষাও হয়নি।
দ্বাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শিমুল দেশ রপান্তরকে বলেন, ‘দেড় বছরেও কোনো দিন অধ্যক্ষকে কলেজে দেখিনি। আমাদের ক্লাসও হয় না। কেউ খোঁজও নেয় না।’
বড়াইবাড়ী কলেজ থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তিন শিক্ষার্থী কেন পাস করতে পারেননি তা জানতে চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে নোটিস পাঠিয়েছে উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়। গঙ্গাচড়া মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহনাজ বেগম দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, পীরগঞ্জ কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজটি একসময় নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক এবং ২০০৩ সালে কলেজ পর্যায়ে উন্নীত হয়। কলেজে মাত্র চারজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কলেজের অধ্যক্ষ আশরাফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার কলেজ থেকে এবার একজন ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। পরীক্ষায় ওই ছাত্রী চতুর্থ বিষয়ের পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। এ কারণে পাস করেনি। গত বছর এই কলেজ থেকে কোনো পরীক্ষার্থী অংশ নেননি। তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছে তারা পীরগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হচ্ছে। তাই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, নগরীর জামালখানে অবস্থিত চট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইউসুফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেই শিক্ষার্থী ফেল করেছে, সেই অনিয়মিত পরীক্ষার্থী ছিল। এর আগে সে দুইবার ফেল করেছিল। এবার সে রসায়ন বিষয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল।
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে আমাদের কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এবার শিক্ষা বোর্ড থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে ওই শিক্ষার্থী পরীক্ষায় দিয়েছিল। এখানে আমাদের কলেজের কোনো দায় নেই।’
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, জেলার মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি বৌদ্ধ শিশুঘর স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় একজন ছাত্রও পাস করেনি। ৬ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২জন অনুপস্থিত ছিল। ৪ জন অকৃতকার্য হয়েছে। এ বিষয়ে বৌদ্ধ শিশুঘর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ চাইলাপ্রু মারমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার সময়ে শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো পাঠদান না হওয়ায় ফল খারাপ হয়েছে।
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জেলার বকশীগঞ্জের চন্দ্রাবাজ রশিদা বেগম স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে নিয়মিত কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়নি। মানবিক বিভাগ থেকে অনিয়মিত দুই শিক্ষার্থী আংশিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের দুজনই অর্থনীতিতে অকৃতকার্য হয়। কলেজের অধ্যক্ষ মো. রফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ছরুয়ার আলম জানান, করোনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারেনি।