কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ নামে নামকরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মতি দিয়েছেন। গত রবিবার তিনি এ-সংক্রান্ত ফাইল অনুমোদন করেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এর আগে নামকরণের বিষয়টি অনুমোদন দিয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। বঙ্গবন্ধুর নামে কোনো স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতে হলে ট্রাস্টের অনুমোদন নেওয়া আইনানুগভাবে বাধ্যতামূলক।
সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আকাশপথে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করতে কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছে সরকার। পর্যটননগরী কক্সবাজারের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য শহরের যোগাযোগ বাড়িয়ে পর্যটন খাতকেও চাঙ্গা করা হচ্ছে। এ দুটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সড়ক, রেল ও বিমান যোগাযোগ আধুনিক করা হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশকে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার। এজন্য বাংলাদেশকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দেশের সব আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিমানবন্দরকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল করা হচ্ছে, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে এবং বিমানবন্দরের রানওয়ে বাড়িয়ে আরও উন্নত করা হচ্ছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৬ হাজার ৭৭৫ ফুট থেকে বাড়িয়ে ৯ হাজার ফুট করা হয়েছে। বর্তমানে তা ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা হচ্ছে। আর ১২০ ফুট প্রশস্ত রানওয়েকে ২০০ ফুট করা হচ্ছে। এ ছাড়া রানওয়ের শক্তি বৃদ্ধি, বিমান অবতরণ ও উড্ডয়ন এলাকায় আলোক ব্যবস্থা স্থাপন করা হচ্ছে। এতে কক্সবাজারের সঙ্গে বৈশি^ক যোগাযোগ সহজ হবে। বর্তমানে একজন আন্তর্জাতিক পর্যটককে ঢাকা বা চট্টগ্রামের বিমানবন্দর ব্যবহার করে কক্সবাজারে পৌঁছাতে হয়। এতে দীর্ঘ সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। পর্যটকদের দুর্ভোগের মধ্যেও পড়তে হয়।
বর্তমানে কক্সবাজার বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে উন্নয়ন কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি বিলম্বিত হয়েছে। সময়মতো প্রকল্পের কাজ শুরুই করতে পারেননি সিভিল এভিয়েশন অথরিটির কর্মকর্তারা। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি শেষ হওয়ার চার মাস আগে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী গত বছরের ২৯ আগস্ট সম্প্রসারণ কাজের উদ্বোধন করেন।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, রানওয়ে সম্প্রসারণ কাজের পাশাপাশি প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ও বিমানবন্দরকেন্দ্রিক অন্যান্য উন্নয়নকাজ চলছে। রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওইসব কাজও শেষ হবে। এসব কাজের পর কক্সবাজার একটি আধুনিক বিমানবন্দরে রূপান্তরিত হবে।
দেশে তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরই প্রধান। ২০১০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির আগে এর নাম ছিল জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ওইদিন মন্ত্রিসভা বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার রাজধানীর কাছে আরও একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার উদ্যোগ নেয়। জাতির পিতার নামে বিমানবন্দরের নামকরণ করা হয় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রাথমিকভাবে মুন্সীগঞ্জের আঁড়িয়ল বিলকে বাছাই করা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের বাধার মুখে বিমানবন্দরের স্থান সরিয়ে নেওয়া হয় ময়মনসিংহের ত্রিশালে। পরে ত্রিশালকে বাদ দিয়ে আঁড়িয়ল বিলেই বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা করা হয়।
এরপর আবার সিদ্ধান্ত বদলে পদ্মার দক্ষিণ-পশ্চিমপাড় মাদারীপুর বা শরীয়তপুরে স্থান নির্বাচন করা হয়। ২০১৬ সালে বিমানবন্দর প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে নিয়োগ করা হয় জাপানি পরামর্শক নিপ্পন কোয়িকে। স্থান নির্বাচনে নিপ্পন কোয়ির সঙ্গে ১৩৬ কোটি টাকার চুক্তি করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। সমীক্ষার পর মাদারীপুরের শিবচরকে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বাছাই করলেও দেখা দেয় নতুন জটিলতা। বিমানবন্দর করার জন্য স্থানীয় প্রায় আট হাজার পরিবারকে স্থানান্তর করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এরপর থেকেই থমকে আছে সবকিছু।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়টি এখন আর সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। মুন্সীগঞ্জের আঁড়িয়ল বিল আর মাদারীপুরের শিবচরকেই তারা পছন্দের তালিকায় রেখেছেন। ভবিষ্যতে সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকলে তারা যেকোনো একটি স্থানে বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন।
সরকারের অগ্রাধিকারে না থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩৫ সালের পর রাজধানীর পাশে আরও একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রয়োজন দেখা দেবে। যদিও সরকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ করছে, যা ২০২৫ সালে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তখন এ বিমানবন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়লেও বিমান চলাচল খাতে যে প্রবৃদ্ধি, তাতে এর পরের ১৫ বছরের মধ্যে এটাও প্রয়োজনীয় যাত্রী ধারণ করতে পারবে না। এছাড়া টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়লেও রানওয়ের সমস্যা কমবে না। এ অবস্থায় এক রানওয়ের শাহজালালেই দ্বিতীয় রানওয়ে করার বিকল্প বের করতে হবে অথবা নতুন বিমানবন্দর নির্মাণে যেতে হবে সরকারকে।