দেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর বেশিরভাগই এখন একলা চল নীতিতে চলছে। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কোনো জোটে যাওয়ার চিন্তাভাবনা আপাতত নেই বলে জানিয়েছেন কয়েকটি দলের নেতারা। নিজেরা স্বতন্ত্র কোনো জোট গঠন করবেন কি না এ প্রশ্নে ওইসব দলের নেতারা বলেছেন, এমন চিন্তাভাবনা আপতত নেই তাদের।
একাধিক ধর্মভিত্তিক দলের শীর্ষ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো তাদের সঙ্গে জোটের ব্যাপারে যোগাযোগ করা হয়নি। যদি করে তাহলে নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা।
নির্বাচন কমিশনে এখন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি। এতে ধর্মভিত্তিক দল আছে ১০টি। তার ছয়টিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে। বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (নজিবুল বশর) আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলে আছে। আর ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ (বাহাদুর শাহ) ২০০৮ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক ছিল। অন্য চারটি দল হচ্ছে ইসলামী ঐক্যজোট (নেজামী), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (হাবিবুর রহমান) ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মান্নান) ও জাকের পার্টি (মোস্তফা আমীর)। তবে তারা আওয়ামী লীগের জোটে নেই।
গত বছর অক্টোবরে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ছেড়ে যায় খেলাফত মজলিস। এর আগে ১৪ জুলাই জোট ছেড়ে যায় কওমি আলেমদের পুরনো দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলা। এই দুটি দলের জোট ত্যাগের মধ্য দিয়ে বিএনপির এই জোটে আর কোনো নিবন্ধিত ধর্মভিত্তিক দল নেই। এর বাইরে যে কয়টি ধর্মভিত্তিক দল ২০-দলীয় জোটে আছে তারা মূলত আগে বেরিয়ে যাওয়া দলগুলোর খ-িত অংশ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট (আবদুর রাকিব) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে মনসুরুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আরেকটি অংশ বিএনপি জোটে আছে। এর মধ্যে হাইকোর্টের আদেশে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। আর অন্য দুটির নিবন্ধন নেই। নিবন্ধিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত আন্দোলন (আতাউল্লাহ) কোনো জোটে নেই। এসব দলের বাইরেও আরও বেশ কয়েকটি ছোট ধর্মভিত্তিক দল রয়েছে।
ভোটের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। যদিও এই দল থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় নেতাকর্মীরা আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) নামে একটি দল গঠন করেছে। জামায়াত ২০-দলীয় জোটে থাকলেও জোটগতভাবে কোনো কর্মসূচিতে তাদের দেখা যায় না। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গণফোরামসহ কয়েকটি দলের সঙ্গে বিএনপির জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট গঠনের পর ২০-দলীয় জোটও আর তেমন সক্রিয় নেই। মাঝেমধ্যে জোটের বৈঠক হলেও তাতে অংশ নিচ্ছেন না দলটির নেতারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামায়াত নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে নিজেদের মতো করে রাজনীতি করছে। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গোপনে সারা দেশে দলের পুনর্গঠন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ভোটের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন। দলটির নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত দুটি নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। তাই আমরা এবার রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নেইনি। সার্চ কমিটির কাছে নাম দেইনি। আওয়ামী লীগের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। আমরা মনে করি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চাইলে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার দরকার।’
ফয়জুল কবির আরও বলেন, ‘আগামী দিনে নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হলে আমরা রাজপথে থাকব। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী রাজপথে জনগণের পক্ষে দায়িত্ব পালন করব।’
১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার হটাতে তখনকার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতের আমির গোলাম আযম ও ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠনের ঘোষণা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সেই থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির সঙ্গেই ছিল ইসলামী ঐক্যজোট। বিএনপির নেতৃত্বে ঐক্যজোট ছাড়াও খেলাফত মজলিস, জাতীয় পার্টি (জেপি-মঞ্জুর) ও জামায়াতকে নিয়ে চারদলীয় জোট করা হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট থেকে নির্বাচন করে সংসদে দুটি আসনও পেয়েছিল খেলাফত মজলিস।
এরপর ৭ জানুয়ারি ২০১৬ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ত্রিবার্ষিক জাতীয় কনভেনশনে ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন।
ইসলামী ঐক্যজোটের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য মুফতি ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে আমরা ২০ দলে ছিলাম। তখন বিএনপির সঙ্গে আমাদের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল একসঙ্গে আন্দোলন, নির্বাচন এবং সরকার গঠন করার। প্রথম দুটিতে আমাদের রাখা হলেও সরকার গঠনে আমাদের রাখা হয়নি। ২০-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে আসার পর আমরা আর জোট করিনি। দলের নিজস্ব এজেন্ডায় চলছি।’ তিনি বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা আমাদের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছি। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে কোনো জোটে যাব কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোট কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে রয়েছে।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াত নেতাদের বিচার চলাকালে ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতের নেতৃত্বে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে অবস্থান ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এরপর থেকে প্রয়াত আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের সঙ্গে সরকারের এক ধরনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে শফীর মৃত্যুর পর জুনায়েদ বাবুনগরী হেফাজতের আমির নির্বাচিত হন। এরপর হেফাজত আবার সরকারবিরোধী অবস্থানে চলে যায়। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যসহ কয়েকটি ইস্যুতে মাঠে নামে তারা।
গত বছর মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা হয়। মারা যায় বেশ কয়েকজন। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মামুনুল হকসহ হেফাজতের কয়েকশ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়। এরপর থেকে কোণঠাসা হয়ে আছে হেফাজত।
গত বছর জুলাইতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার কার্যালয়ে দেখা করে আসার কয়েক ঘণ্টা পর জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি জোট ছাড়ার ঘোষণা দেন হেফাজতের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। মার্চে সহিংসতার ঘটনায় দলটির ৩১ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়। তার মধ্যে ১৭ জন জামিনে মুক্তি পান। এরপর অক্টোবরে জোট ছাড়ে খেলাফত মজলিস।
এখনো হেফাজতের কয়েকশ’ নেতাকর্মী কারাগারে রয়েছে। তাদের মুক্তির জন্য চলতি মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন হেফাজতের নেতারা।
খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক আব্দুল জলিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ২০-দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে এসেছি। আপাতত কোনো জোটে যাচ্ছি না। নিজেদের মতো করে আমরা আমাদের রাজনীতি করছি। সরকারের দিক থেকেও কোনো প্রেশার নেই তাদের সঙ্গে যাওয়ার বিষয়ে।’
দলটির চেয়ারম্যান মোহাম্মাদ ইসহাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রপতির সংলাপে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে সরকার যা করছে তাতে মনে হয় না জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে। আমরা জনগণের জন্য রাজনীতি করি। আগামীতেও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে যা যা করা দরকার তা করব।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এখন স্বতন্ত্রভাবে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালাচ্ছি। সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে এলে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে কোনো জোটে যাব কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’