মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন চান গভর্নর

দেশের ব্যবসায়ী মহল যখন পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে আমদানি শুল্ক-কর কমানোসহ বিভিন্ন উপায়ে ব্যবসার ব্যয় কমানোর দাবি জানাচ্ছেন, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলছেন, পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার আরও উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় উল্লেখজনক হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।

গতকাল শনিবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশের অর্থনীতির সামগ্রিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে এ কথা বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর।

ওয়েবিনারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপ উপশম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অন্য বক্তারা। এ বিষয়ে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, কভিড ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সব স্তরের জনগণের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু নীতি-সহায়তার পাশাপাশি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করছে।

তিনি আরও বলেন, করোনায় প্রথম দিকে রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা গেলেও এখন তা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে আমাদের রপ্তানি বেশি মাত্রায় তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি, ওষুধ, পাট, সিরামিক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি সম্ভাবনাময় খাতকে প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তা প্রদানে এগিয়ে আসার পাশাপাশি মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।’

ফজলে কবির আরও বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ তহবিলের সম্প্রসারণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে। তবে দর কষাকষির দক্ষতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও মনোযোগী হতে হবে।

গভর্নর সুসুক বন্ড প্রবর্তনের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশে ব্যাংক পরিবর্তিত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি সিএমএসএমই খাতকে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি উল্লেখ করে এ খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান।  

ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, ‘কভিড পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাপী ভোগ্যপণ্যের সাপ্লাই চেইনের ওপর বেশি মাত্রায় চাপ পড়ায় দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি ব্যয় বাড়ছে। ফলে স্থানীয় বাজারেও দাম বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানিকারকদের ঋণ সহায়তা ও আমদানিকৃত পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক কমানো হলে, সাধারণ জনগণ এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে।’

কৃষি খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার ঘোষিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহের মধ্যে অন্তত ১টিকে কৃষি খাতে পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব করেন ডিসিসিআই সভাপতি।

এছাড়াও তিনি সিএমএসএমইদের জন্য সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিতের জন্য বাংলাদেশের ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানোর জোরারোপ করেন। ব্যবসায়িক কার্যক্রমে হয়রানি কমানো ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে দেশের কর ও ভ্যাট কার্যক্রমের সব স্তরে অটোমেশন নিশ্চিতকরণের প্রস্তাব করেন ডিসিসিআই সভাপতি।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে দেশের কর কাঠামাকে সাময়িক সময়ের জন্য পুনর্বিন্যাস করার দাবি জানান, তা না হলে সামনের রমজান মাসে আরও ভোগান্তি বাড়বে বলে মতপ্রকাশ করেন।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নদীপথ ব্যবহার করা সম্ভব হলে, পণ্য পরিবহনের খরচ এক-তৃতীয়াংশ কমানো যেতে পারে এবং এ লক্ষ্যে নদীপথের সংস্কারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ওয়েবিনারের নির্ধারিত আলোচনায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রভৃতি খাতে প্রস্তাবিত দাম বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং জনগণের জীবনযাত্রায় তা নেতিবাচক প্রভাব ফলবে। এমতাবস্থায় ‘গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ এবং ‘এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ড’-এর জমানো তহবিল ব্যবহারের প্রস্তাব করেন তিনি।  

ফরেন ইনভেস্টরস্ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)’র সভাপতি নাসের এজাজ বিজয় বলেন, রিয়েল এস্টেট শিল্পের সঙ্গে নির্মাণ, সার্ভিস, ফিন্যান্সিয়াল এবং ইন্স্যুরেন্স প্রভৃতি খাত জড়িত থাকায় এর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’-এর ওপর আরও বেশি হারে গুরুত্ব প্রদানের পাশাপাশি বিদ্যমান কর হার যৌক্তিকভাবে কমানোর দাবি জানান ফিকি’র সভাপতি।

মুক্ত আলোচনায় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদী সাত্তার বলেন, বিশ্ববাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত বেশি, যার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রভাব আমাদের ওপর পড়বে, এটাই স্বাভাবিক এবং এ অবস্থা উত্তরণে আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের তৈরি পোশাক খাত একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতের উদ্যোক্তারা অনুসরণ করতে পারে। রেমিট্যান্সকে আমাদের রপ্তানি পণ্য হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানিতে মনোযোগী হওয়ার দরকার রয়েছে।’