বিএনপির বৃহত্তর জোটে বাধা ‘জাতীয় সরকার’

আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে একটি বৃহত্তর জোট গড়ে তুলতে চায়। এর মধ্য দিয়ে বিএনপি তাদের জাতীয় ঐক্যের সেøাগান সামনে এনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার হটিয়ে একটি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের আন্দোলনকে জোরদার করতে চায়।

বিএনপি চায় সেই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যাতে জনগণ তাদের ভোটাধিকার ফিরে পায়। তবে বিএনপির কিছু নেতা মনে করছেন, কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জাতীয় সরকারের প্রস্তাব বৃহত্তর জোট গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

এ বিষয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় সরকারের প্রস্তাব কারও কারও থাকতে পারে। আমার মনে হয় সেটা আমাদের জন্য সমস্যা হবে না। কারণ আমরা বসে যখন আলাপ-আলোচনা করব, তখন বৃহত্তর স্বার্থে ছোটখাটো সমস্যা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। একটা বিষয়ে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য হতে পারে সেটা হলো সবার আগে ক্ষমতা থেকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারকে হটানো।’

কবে নাগাদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসতে পারেন জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘শিগগিরই আমরা আলোচনায় বসব। চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সে আলোচনা হতে পারে।’ বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করার লক্ষ্যে নতুন ইসি গঠনে রাষ্ট্রপতির সংলাপ বর্জন করা দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করার ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া দলটি নীতিগতভাবে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে দলের নির্বাহী কমিটি, অঙ্গ সংগঠন ও পেশাজীবীদের সঙ্গে আটদিনের সংলাপেও এই বিষয়টি প্রাধান্য পায়।

নিবন্ধিত ৩৯টি দলকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। বিএনপিসহ সাতটি দল সংলাপে যায়নি। অন্য দলগুলোর মধ্যে আছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টি  (জেএসডি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন।

তবে ২০১৮ সালে সংসদ নির্বাচনের আগের বিএনপিকে নিয়ে গঠন করা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরাম সংলাপে অংশ নিয়েছে। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরু হয়। ফ্রন্টের অন্য দলগুলো হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ, নাগরিক ঐক্য।

জাতীয় সরকারের বিষয়ে সরব সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো হলো আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি, ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ড. রেজা কিবরিয়ার নেতৃত্বাধীন গণঅধিকার পরিষদ, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ভাসানী অনুসারী পরিষদ।

জাতীয় সরকারের বিষয়ে এলডিপি’র সভাপতি অলি আহমদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরাই প্রথম জাতীয় সরকারের কথা বলেছি। বিগত আড়াই বছর ধরে জাতীয় সরকার চেয়ে আসছি। সে জাতীয় সরকার হবে কমপক্ষে ২ বছরের জন্য। কারণ সরকার সব প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করে ফেলেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক পথে আনতে সময় লাগবে।’ আওয়ামী লীগ জাতীয় সরকারে থাকবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হবে।’     

তবে জাতীয় সরকারের বিরোধিতা করে বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বৃহত্তর জোট গঠনে বিএনপির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় সরকার। কারণ সে সরকার করতে গেলে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, সে সরকার আবার দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে যেতে পারে। তেমন অভিযানে গেলে আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিএনপির  কোনো কোনো নেতাকে এর আওতায় আনতে পারে। তাছাড়া সে সরকার দীর্ঘ সময় নিতে পারে। এমনটা হলে বিএনপির কোনো সুবিধা হবে না। দলটি চায় দ্রুত নির্বাচন।

দুই বছরের জন্য জাতীয় সরকারের যে প্রস্তাব সে সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই বছর সময় দেওয়া যাবে না। যারা জাতীয় সরকার চায় তাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করব। তাদের প্রস্তাব পর্যালোচনা করব। তাদের আমাদের সঙ্গে আনার চেষ্টা করব।’

এদিকে জাতীয় সরকারের বিরোধিতা করে বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জাতীয় সরকার চাই না। যারা চান তারা কেন চান তা তারাই বলতে পারবেন। আমার মনে হয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও জাতীয় সরকার চায়। কারণ, এমনটা হলে তারা কিছুটা রেহাই পাবে। কিন্তু সেটা হতে দেওয়া যায় না। আমরা চাই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। যে নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জাতীয় সরকার চাই না। আমরা চাই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। দ্রুততম সময়ে সেই সরকার সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করে জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।’   

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট সরকার হটাতে হবে। সে জন্য যা করা দরকার তাই করব। আর জাতীয় সরকার হলে এবং সেখানে আওয়ামী লীগের দুই-একজন প্রতিনিধি থাকলে সমস্যা হবে না। সরকারের অন্য শরিকদের ভিড়ে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিরা জায়গা পাবেন না।’

এর আগে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারকে হটাতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জামায়াতের তখনকার আমির গোলাম আযম এবং ইসলামী ঐক্যজোটের তখনকার  চেয়ারম্যান শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হককে সঙ্গে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠনের ঘোষণা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। যদিও সে জোটে এরশাদের জাতীয় পার্টি ছিল না। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও চারদলীয় জোট একসঙ্গে নির্বাচন করে।

২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা চারদলীয় জোট কলেবরে বেড়ে ২০ দলীয় জোট হয়। জোট হলেও ৫ জানুয়ারি ২০১৪ অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই জোটসহ বেশ কয়েকটি দল বয়কট করে।