মোংলায় অন্যজনকে মালিক সাজিয়ে ৩৫ বিঘা জমি বিক্রি

বাগেরহাটের মোংলায় জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের মালিকানাধীন প্রায় ৩৫ বিঘা জমি বিক্রি করে দিয়েছে একটি দালাল চক্র। দালালরা জাল দলিল রেজিস্ট্রি করে প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব আবদুস সাত্তার মিয়ার এই জমি মোংলার বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়নের সানবান্দা এলাকায়। ডরিন পাওয়ার হাউজ অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেড নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে এই জমি বিক্রি করেছে দালাল চক্রটি। দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাহজীব আলম সিদ্দিকীর নামে। তিনি ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য। দালালদের সহায়তায় ভুয়া মালিক সেজে জাল দলিল করে জমি বিক্রি করেছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মো. আবদুল সত্তার হাওলাদার।

জাল দলিল বাতিলের জন্য ইতিমধ্যে আদালতে মামলা করেছেন জমির মালিক অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব আবদুস সাত্তার মিয়া। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাটের আদালতে মামলাটি করেন তিনি।

সাবেক এই সরকারি কর্মকর্তা ঢাকায় থাকেন। তার শ্যালকের সূত্রে তিনি ওই এলাকায় জমি কিনেছিলেন। জাল দলিল করে তার জমি বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনায় দলিল লেখক ও সাব রেজিস্ট্রারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ ডিসেম্বর উপজেলার বুড়িরডাঙ্গা ইউনিয়নের সানবান্দা গ্রামের সানবান্দা মৌজার অন্তর্ভুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবদুস সাত্তার মিয়ার প্রায় ৩৫ বিঘা জমি বিক্রির দলিল রেজিস্ট্রি হয়।

দালাল চক্রের মূল হোতা মোংলা পৌর শহরের ময়লাপোতা এলাকার বাসিন্দা মো. হাসমত আলী। তিনি বরিশালের মো. আবদুল সত্তার হাওলাদারকে ওই জমির মালিক সাজিয়ে ডরিন পাওয়ার হাউজ অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেডের কাছে বিক্রি করিয়েছেন। ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা দাম উল্লেখ করে ওই জমির রেজিস্ট্রি হয়।

এ বিষয়ে ডরিন পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাহজীব আলম সিদ্দিকী দেশের বাইরে অবস্থান করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী মনজুরুল নাসিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দালাল হাসমত আলী ও রিয়াদ চক্রের খপ্পরে পড়ে আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। তারা আমাদের এই ভুল জমি কিনে দিয়েছেন এবং এর জন্য তারাই দায়ী। কারণ আমরা তো তাদেরকে জমির টাকা দিয়েছি।’ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আলোচনা করে দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান তিনি।

জালিয়াতি করে যে জমি ডরিন পাওয়ারের কাছে বিক্রি করা হয়েছে তার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভুক্তভোগী দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু এ জাল দলিলই নয় হাসমতের বিরুদ্ধে এমন জালজালিয়াতির আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে। জমি কেনাবেচা ও সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হাসমত বহু মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার এমন কর্মকা-ের কারণে বিভিন্ন সময়ে উপজেলা ভূমি ও সাব রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

জালিয়াতির মাধ্যমে জমি রেজিস্ট্রির বিষয়টি স্বীকার করে দালাল হাসমত আলী এ নিয়ে সামনাসামনি কথা বলব বলে ফোন রেখে দেন। আর অন্য দালাল রিয়াদকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

মোংলা উপজেলা সাব রেজিস্ট্রার মো. জুবায়ের হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডরিন পাওয়ার হাউজ অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেডের নামে জমিটির দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে যাাওয়ার পরে জানতে পেরেছি যে ওই কথিত দলিলটি জাল হয়েছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে জালজালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক আবুল কালাম শেখকে গত ২৬ জানুয়ারি কারণ দর্শানোর নোটিস করা হয়েছে।’

দলিল লেখক আবুল কালাম শেখ বলেন, ‘দলিল তৈরির পর রেজিস্ট্রি করার আগ মুহূর্তে সমুদয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার দায়িত্ব সাব রেজিস্ট্রারের। কিন্তু তিনি  সেটি পুঙ্খানুপুঙ্খুভাবে না দেখে উল্টো আমাকে অভিযুক্ত করে কারণ দর্শানোর  নোটিস দিয়েছেন।’ তিনি প্রশ্ন করেন, এ দায় কার? 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) কমলেশ মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন ‘যেহেতু আমিও বিষয়টি জেনেছি, তাই এ দলিলের নামজারি হবে না। এ ঘটনায় একটি মামলাও হয়েছে জেনেছি। ঘটনাটি সাব রেজিস্ট্রার আমাকে জানানোর পর আমি উভয় পক্ষকে ডাকতে বলেছি।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, সাব রেজিস্ট্রার তাকে বলেছেন যে দালাল চক্র তাকে ভুল তথ্য দিয়েছে। মালিক সেজে যে ব্যক্তি রেজিস্ট্রি দিয়েছে সে তো এ এলাকার লোক নয়, বরিশালের। প্রথমত ছবি দেখে আর দ্বিতীয়ত স্থানীয় না হয়ে দূরের হওয়াতে তাকে চিনতে পারেননি সাব রেজিস্ট্রার। দালাল হাসমতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান ইউএনও।