ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যাদের রক্তে রাঙা হয়েছিল রাজপথ, যাদের প্রাণের বিনিময়ে রচিত হয়েছিল বাঙালি ও বাংলার স্বাধীনতার লড়াই গতকাল সোমবার সেই শহীদদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করল পুরো জাতি। ভাষার গান আর মাথা নত না করার প্রত্যয়ে গতকাল প্রথম প্রহর থেকে ফুলেল শ্রদ্ধায় ভরে ওঠে শহীদ মিনারের বেদি। তবে এমন দিনে, এমন আয়োজনেও শহীদ মিনারেই সংঘর্ষে জড়িয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। কোথাও কোথাও বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গেও সংঘর্ষে জড়ায় তারা। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া এবং চট্টগ্রামের হাজী মুহম্মদ মহসীন কলেজে এসব সংঘর্ষ ও হামলা-পাল্টাহামলায় অন্তত ৩৮ জন আহত হয়েছে।
দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া ও মিছিলে উসকানিমূলক সেøাগান দেওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে।
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রায়পুরে হলরোড ও বাসস্টেশন এলাকায় এই সংঘর্ষ হয়। আহতদের উদ্ধার করে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে স্থানীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে আসার সময় অশ্লীল স্লোগান দেয় বিএনপির সমর্থকরা। এ সময় যুবলীগ নেতা তারেক আজিজ জনিসহ দলীয় কর্মীরা শহীদ মিনার থেকে ফিরছিল। তারা সেই সেøাগানের প্রতিবাদ করতে গেলে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে ফয়সাল আজিম, জুম্মান, মুরাদ, ইসমাইল, নিলয় বাঙ্গালী, মিরাজ, এমরান, শিমুল, আলাউদ্দিন, সোহেল, সজিব, হৃদয়, সুমন, মুরাদ, রিয়াজ, মিরন, শান্ত, সুজন পাটওয়ারী, কাউছার, রাজীব ও সাংবাদিক এসকে সোহেলসহ উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়। পরে আহতরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসেও ফের সংঘর্ষে জড়ায়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
রায়পুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সায়েদ জুটন বলেন, বিএনপি জঙ্গি মিছিল করে শান্ত পরিস্থিতিকে অশান্ত করে তোলে। তারা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অশ্লীল ভাষায় সেøাগান দেয়। এতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বাধা দিলে তাদের ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের ১০ নেতাকর্মী আহত হয়।
রায়পুর পৌরসভা বিএনপির সভাপতি ও পৌরসভার সাবেক মেয়র এবিএম জিলানী অভিযোগ করে বলেন, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফেরার পথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গসংগঠনের ২০ নেতাকর্মী আহত হয়।
রায়পুর উপেজলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র মো. ইছমাইল হোসেন খোকন সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক সেøাগান দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায়। তারা নিজেরাই বিশৃংখলা তৈরি করে আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
রায়পুর থানার ওসি শিপন বড়ুয়া জানান, সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হয়। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় ১০ জন আহত হয়েছে। গতকাল সকালে সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে বর্তমান ও সাবেক সংসদ সদস্যের সমর্থকদের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, কিশোরগঞ্জ-২ (পাকুন্দিয়া-কটিয়াদী) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক সোহরাব উদ্দিন দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে সকাল ১০টায় কলেজ প্রাঙ্গণে শহীদ মিনারে ফুল দিতে যান। এ সময় সেখানে বর্তমান সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ সমর্থকরাও ছিল। ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে একপর্যায়ে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। ইটপাটকেলের আঘাতে ১০ জন আহত হয়।
উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট সোহরাব উদ্দিন জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগের পূর্ব-ঘোষিত কর্মসূচি বানচাল করতেই স্থানীয় সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদের অনুসারীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে।
বর্তমান সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ জানান, সোহরাব উদ্দিনের অনুসারীরা প্রথমে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ সময় উপজেলা কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি বাবুল মিয়ার বাড়িসহ বেশ কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়েছে।
পাকুন্দিয়া থানার ওসি মো. সারোয়ার জাহান জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে আছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
এদিকে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে হাজী মুহম্মদ মহসীন কলেজে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের হাতাহাতি হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
চকবাজার থানার ওসি মো. ফেরদৌস জাহান জানান, দুটি পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ৮ জন আহত হয়েছে।
ওসি বলেন, ‘মূলত ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে এ ঘটনা হয়। তারা আবার ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন পক্ষভুক্ত। এ সময় পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।’
মহসীন কলেজে ছাত্রলীগের দুটি পক্ষ সক্রিয়। একটি পক্ষ নিজেদের শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে দাবি করে। অন্যটি সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী।