সম্প্রতি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ক্রেডিট সুইসের বিপুল সংখ্যক নথি ফাঁস হয়েছে। ব্রিটিশ মিডিয়া দ্য গার্ডিয়ান এনিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করেছে। সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলো কীভাবে বিশ্বের বহু স্বৈরশাসক, দুর্নীতিবাজ গোয়েন্দা কর্মকর্তা, নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ব্যবসায়ী, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী, মাদক ও মানব পাচারকারীর গোপন সম্পদ আগলে রেখেছে, তা প্রকাশ করছে মিডিয়াটি।
ফাঁস হওয়া নথি বলছে, পাকিস্তানের এক হাজার ৪০০ নাগরিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে সুইস ব্যাংকে। এই নাগরিকদের অধিকাংশই পাকিস্তানের রাজনীতি ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। আরও স্পষ্ট করে বললে, পাকিস্তানের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান (আইএসআই) জেনারেল আখতার আব্দুর রহমান খানের মতো ব্যক্তির নাম রয়েছে ওই তালিকায়। বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর অনেক জেনারেলেরই গোপন অ্যাকাউন্ট রয়েছে ক্রেডিট সুইস ব্যাংকে। তাদের সম্মিলিত অর্থের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। সুইস ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট থাকা পাকিস্তানিদের প্রত্যেকের কাছে গড়ে চার দশমিক ৪২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঙ্ক রয়েছে বলেও মিডিয়াটি জানায়।
দ্য ডনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আফগানিস্তানের মাটিতে রুশ সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত মুজাহিদিনদের অর্থায়ন করত সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র। ওই অর্থ আমেরিকান সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) সুইস ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হতো বলে জানিয়েছে করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (ওসিসিআরপি)। সংস্থাটি আরও জানায়, সিআইএর সুইস ব্যাংক থেকে ওই অর্থ শেষ ঠিকানা হিসেবে চলে যেত পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের কাছে। তখন গোয়েন্দা সংস্থাটির প্রধান ছিলেন জেনারেল আখতার।
গত রবিবার আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো একযোগে প্রকাশ করে ‘সুইস সিক্রেটস’। সেখানে ১৯৪০ এর দশক থেকে ২০১০ এর মধ্যে ক্রেডিট সুইসে খোলা এসব অ্যাকাউন্টের ৩০ হাজারের বেশি মালিকের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। সারা পৃথিবীতে ধনী ব্যক্তিদের টাকা সুইস ব্যাংকে রাখার আগ্রহের পেছনে মূল কারণ দেশটির গোপনীয়তার নীতি। সুইজারল্যান্ডের আইনে ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য নয়। টাকার উৎসও তারা জানতে চায় না। গার্ডিয়ান লিখেছে, সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তার নীতি যে ‘অনৈতিকভাবে’ অবৈধ সম্পদেরও সুরক্ষা দিচ্ছে, তাই প্রকাশ্যে এনেছে ‘সুইস সিক্রেটস’। এসব অ্যাকাউন্টের মালিকদের মধ্যে রয়েছেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ, তার দুই ছেলে এবং মিসরের সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মুবারকের নাম। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, হোসনি মোবারকের নামে ছয়টি অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে, যার একটিতে ২২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বেশি জমা ছিল। মোবারকের দুই ছেলে আলা ও জামালের নামে ছয়টি অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে ফাঁস হওয়া নথিতে, যার একটিতে ২০০৩ সালে জমা ছিল ১৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার।
স্বৈরশাসকদের গোপন সম্পদের বিবরণী ফাঁস : বিশ্বের বহু স্বৈরশাসক, দুর্নীতিবাজ গোয়েন্দা কর্মকর্তা, নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ব্যবসায়ী, মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী, মাদক ও মানব পাচারকারীর গোপন সম্পদ আগলে রেখেছে ক্রেডিট সুইস ব্যাংক। সম্প্রতি ব্যাংকটির ফাঁস হওয়া ১৮ হাজারের বেশি তথ্য সংবলিত কিছু নথি এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর হাতে। ক্রেডিট সুইসের ১৮ হাজারের বেশি গ্রাহকের তথ্য রয়েছে এসব ফাঁস হওয়া নথিতে, তাদের অ্যাকাউন্টে জমা থাকা অর্থের পরিমাণ সব মিলিয়ে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
স্বঘোষিত এক ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ এসব নথি সরবরাহ করে জার্মান সংবাদমাধ্যম সুইডডয়চে সেইটুংকে সরবরাহ করে। সেসব নথি বিশ্লেষণের কাজে এরপর যুক্ত হয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন অর্গানাইজিং ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, লা মঁদেসহ ৩৯ দেশের ৪৮টি সংবাদমাধ্যম।
সবার পরিশ্রমে গত রবিবার পত্রিকাগুলো একযোগে প্রকাশ করে ‘সুইস সিক্রেটস’। সেখানে ১৯৪০-এর দশক থেকে ২০১০-এর মধ্যে ক্রেডিট সুইসে খোলা এসব অ্যাকাউন্টের ৩০ হাজারের বেশি মালিকের মুখোশ উন্মোচন করা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টের মালিকদের মধ্যে রয়েছেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ, তার দুই ছেলে এবং মিসরের সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মুবারকের নাম।
নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, বাদশাহ নামে ছয়টি অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে, যার একটিতে ২২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বেশি জমা ছিল। মোবারকের দুই ছেলে আলা ও জামালের নামে ছয়টি অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে ফাঁস হওয়া নথিতে, যার একটিতে ২০০৩ সালে জমা ছিল ১৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার। জর্ডানের জেনারেল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেটের সাবেক প্রধান সাদ খাইর, পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সাবেক প্রধান জেনারেল আখতার আবদুর রহমান, মিসরের ওমর সুলেইমান, ইয়েমেনের গালিব আল কামিশ এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের তথ্যও এসেছে সুইস সিক্রেটে। জর্ডানের সাদ খাইরের একটি অ্যাকাউন্টে ছিল ২ কোটি ১৬ লাখ ডলার।
সুইস সিক্রেটসের অনুসন্ধানে সাংবাদিকরা আরও অন্তত ৪০ জনের নাম পেয়েছেন, যারা ডজনখানেক দেশের গোয়েন্দা দপ্তরের কর্মকর্তা ছিলেন বিভিন্ন সময়ে। এদের মধ্যে ভেনেজুয়েলার সাবেক আর্মি ক্যাপ্টেন কার্লোস লুই অ্যাগুইলেরা বোর্হাস ১৯৯০-এর দশকে ছিলেন প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের দেহরক্ষী। ইউক্রেনের সিকিউরিটি সার্ভিসের সাবেক প্রধান ভ্যালেরি খোরশকোভস্কি এখন একজন বিজনেস টাইকুন। মিসরের সাবেক গুপ্তচর আশরাফ মারওয়ান ছিলেন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের জামাতা। এছাড়া জার্মানি, নাইজেরিয়া, উজবেকিস্তান, ইরাক, জর্ডান, ইয়েমেনের বেশ কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার নাম এসেছে সুইস সিক্রেটসে।