ময়মনসিংহের ভালুকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে লাগা আগুনে শিশু তিন ভাই-বোনের মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার রাতে সিডস্টোর উত্তর বাজারের কাজি অফিসের পাশে একটি টিনশেড বাড়িতে পোশাককর্মী দম্পতির ওই তিন শিশুসন্তান ঘরের মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়ে মারা যায়।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ সদরের ফতুল্লার পাগলায় ট্রাকের সিলিন্ডার থেকে গ্যাস অপসারণের সময় বিস্ফোরণে দগ্ধ দুজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাদের মধ্যে একজন গত রবিবার মধ্যরাতে এবং আরেকজন গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর আগে গত রবিবার দুপুরে ফতুল্লার আলীগঞ্জ ব্যাপারীবাড়ি এলাকায় ওই দুর্ঘটনা ঘটে।
ভালুকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে লাগা আগুনে নিহতরা হলো সাদিয়া (৮), নাদিয়া (৫) ও রায়হান (২)। তাদের বাবার নাম সুমন মিয়া। তিনি পরিবার নিয়ে সিডস্টোর উত্তর বাজারের কাজি অফিসের পাশে একটি টিনশেড বাসায় ভাড়া থাকেন।
এলাকাবাসী, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা জানান, রবিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে স্বপন মিয়ার বাসার পাশের একটি টিনশেড বাসায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুন লাগে। মুহূর্তেই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে সুমন মিয়ার ঘরসহ আরও কয়েকটি ঘর পুড়ে যায়। স্থানীয় লোকজন আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে দীর্ঘ চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে তারা সেখান থেকে তিন শিশুর পোড়া লাশ উদ্ধার করে। ঘরে আগুন লাগার সময় পোশাককর্মী সুমন ও তার স্ত্রী কর্মস্থলে ছিলেন। তাদের তিন সন্তান ঘরে ঘুমিয়ে ছিল। সে অবস্থাতেই আগুনে পুড়ে তাদের মৃত্যু হয়।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে তিন সন্তানের পোড়া লাশ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তাদের বাবা স্বপন ও মা মদিনা বেগম। বিলাপ করতে করতে মা মদিনা বেগম বলেন, ‘সন্ধ্যায় সন্তানদের বাসায় রেখে ফ্যাক্টরিতে চলে যাই। আগুনের খবর শুনে দ্রুত ফ্যাক্টরি থেকে ছুটে আসি। এসেই সন্তানদের পোড়া লাশ দেখতে পাই। এমন মৃত্যু যেন আল্লাহ আর কাউকে না দেয়। অবুঝ শিশুদের এমন মৃত্যু যেন আর কোনো বাবা-মা না দেখে।’
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় সাংসদ কাজিম উদ্দিন আহমেদ, উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা খাতুন প্রমুখ।
ভালুকা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন মাস্টার আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খবর পাওয়া মাত্রই আমাদের ইউনিট ঘটনাস্থলে যায় এবং প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আগুনে পোশাককর্মী দম্পতির তিন শিশুসন্তানসহ পাঁচটি পরিবারের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুনের সূত্রপাত হয়।’
ভালুকা মডেল থানার ওসি কামাল হোসেন বলেন, ‘নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার দীপসন্ন গ্রামের সুমন ও তার স্ত্রী মদিনা বেগম সিডস্টোর উত্তর বাজার এলাকায় প্রবাসী রুবেল মিয়ার বাড়িতে থেকে স্থানীয় একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন। সন্ধ্যায় তিন শিশুসন্তানকে ঘরে রেখে বাইরে যান তিনি ও তার স্ত্রী। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে ওই বাড়িতে গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন লাগলে ওই দম্পতির তিন সন্তান আগুনে পুড়ে মারা যায়। নিহতদের লাশের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে।’
ইউএনও সালমা খাতুন জানান, নিহত তিন শিশুর লাশ দাফনের জন্য ৩০ হাজার টাকা সরকারিভাবে অনুদান দেওয়া হয়েছে।
ফতুল্লায় দগ্ধ দুজনের মৃত্যু: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পাগলায় ট্রাকের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে লাগা আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া দুজন হলেন- জজ মিয়া (৫০) ও আলম (৪৫)। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার মধ্যরাতে আলম ও গতকাল সকালে জজ মিয়ার মৃত্যু হয়।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. এস এম আইউব হোসেন জানান, জজ মিয়ার শরীরের ৮০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। এইচডিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সকাল ৮টার দিকে তার মৃত্যু হয়। আর আলম শরীরের শতভাগ দগ্ধ নিয়ে আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন। রবিবার মধ্যরাতে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
তিনি আরও জানান, পাগলার ওই দুর্ঘটনায় দগ্ধ আরও ৪ জন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি রয়েছেন। তাদের অবস্থাও গুরুতর।
মারা যাওয়া জজ মিয়ার ভাগিনা স্বপন মিয়া জানান, জজ মিয়া ২ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে থাকতেন ফতুল্লার পাগলার আলীগঞ্জে নিজের বাড়িতে। তিনি ছিলেন কয়লা ব্যবসায়ী। আগুন লাগার আগমুহূর্তে বাড়ির ফটকের পাশের কলে অজুু করতে গিয়েছিলেন। তখনই আগুন লেগে দগ্ধ হন তিনি।
নিহত আলমও একই এলাকায় থাকতেন। ট্রাকচালক ছিলেন তিনি। দুর্ঘটনার সময় ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনিই জ¦লন্ত সিগারেট সিলিন্ডারের পাশে ফেললে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। এতে তার শরীরও পুড়ে যায়।
দগ্ধ অবস্থায় বার্ন ইউনিটে ভর্তি অন্যরা হলেন হাসিনা মমতাজ (৪৭), আসমা বেগম (৪৫), সাথী আক্তার (২০) ও তার মেয়ে হাফসা আক্তার (৬)। একই দুর্ঘটনায় আহত তাহমিনা আক্তার (১৮) নামে একজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
মারা যাওয়া জজ মিয়ার ভাই নাজমুল হাসান জানান, রবিবার দুপুরে ট্রাকে ব্যবহৃত একটি গ্যাস সিলিন্ডার তাদের বাসার সামনে রাখে ওয়ার্কশপকর্মীরা। সিলিন্ডারটির মুখ খুলে দিলে সেখান থেকে গ্যাস বের হতে থাকে। এ সময় দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া আলম জ্বলন্ত সিগারেট সিলিন্ডারের পাশে ফেললে আগুন লেগে যায়। সেই আগুন আশপাশের কয়েকটি বাড়িতেও ছড়িয়ে পড়ে। এতে বেশ কয়েকজন দগ্ধ হন। পরে তাদের দ্রুত বার্ন ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ভালুকা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিনিধি