উচ্চশিক্ষা কি বেকারত্ব দূর করতে পারছে

সদ্য এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এই করোনা মহামারীর মধ্যে শিক্ষার্থীরা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। যদিও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের এই শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক শিক্ষালাভের সুযোগ একটু কমই পেয়েছে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় প্রায় চৌদ্দ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড থেকে ১১ লাখ ৩৮ হাজার শিক্ষার্থী, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৭৮ হাজার হাজার জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে ১ লাখ ২৪ হাজারের বেশি কিছু শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে জিপিএ ৫ পেয়েছে ১ লাখ ৭৮ হাজার শিক্ষার্থী এবং এই পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৯৫.২৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। সাধারণভাবে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর পাসের হার ও জিপিএ ৫-এর সংখ্যায় সবার আগ্রহ ও আলোচনা তৈরি করলেও মূল সংকটটা আসলে শিক্ষার গুণগতমান ও বাজার উপযোগী উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার জায়গায়। খুব তাড়াতাড়িই এই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হবে এবং স্বাভাবিকভাবে অনেকেই নিজেদের পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হতে পারবে না। যদিও এদের অনেকেই ফলাফল প্রকাশের আগেই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেছে।

এবার একটু ফিরে যাওয়া যাক সাম্প্রতিক একটি ঘটনার দিকে যেখানে বগুড়ার এক যুবক দুবেলা খাবারের বিনিময়ে পড়াতে চাওয়ার বিজ্ঞাপন সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। সেই যুবকের নাম আলমগীর কবির। তিনি বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষে করেছেন দুই বছর আগে। কিন্তু কোনোভাবেই একটি জুতসই চাকরি পাচ্ছিলেন না। আরও অনেক কিছুর মতোই আলমগীর কবিরের ঘটনা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ঘটনা ও রটনা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার হয়েছে। কিন্তু আজকের এই আলোচনায় আলমগীর হোসেনের বিজ্ঞাপনের সত্য-মিথ্যা ও ভালো-মন্দ যাচাই করা মুখ্য বিষয় নয়। বরং উল্লেখযোগ্য হলো ঘটনা-পরবর্তী বগুড়ার পুলিশ সুপারের উদ্যোগে আলমগীর হোসেনের চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে স্বপ্ন নামক একটি সুপারশপে এবং এর মাধ্যমে আমরা সবাই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম এই ভেবে যে তার আপাতত একটি গতি হলো। কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে এ রকম আর কত আলমগীর আছে সারা বাংলাদেশে যারা উচ্চশিক্ষা অর্জন শেষে একটি চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে কিন্তু নিজের জন্য জুতসই চাকরিটি জোগাড় করতে পারছে না।  আমেরিকা ও ইউরোপে যে কাজ আমাদের দেশের তরুণদের কাছে সেটাই চাকরি। আপাতদৃষ্টিতে এই দুটি বিষয় এক হলেও এর মধ্যে সূক্ষ্ম একটি পার্থক্য আছে। আমাদের দেশে চাকরি যেমন সোনার হরিণ, তেমনি চাকরি নিয়ে দেশের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে নানা ধরনের সংস্কার আছে। যদিও চাকরি নিয়ে পছন্দ ও অপছন্দ থাকাটাই স্বাভাবিক কিন্তু এই পছন্দ ও অপছন্দ হওয়ার মূলভিত্তি বা কারণটাই এখানে সমস্যার বিষয়। এদের মধ্যে অনেকেই নানা ধরনের বৈধ ও কখনো কখনো অবৈধ সুযোগ-সুবিধার জন্য সরকারি চাকরি লাভের আশায় বছরের পর বছর অপেক্ষা করে থাকেন, সরকারি চাকরি পাওয়াই তাদের প্রথম পছন্দের। কী অভিভাবক, কী প্রতিবেশী সবার দৃষ্টিতেই যেন তা সমানভাবে সত্য। যদিও সবাই যে একই ধরনের না তা নিঃসন্দেহে বলা বাহুল্য। হলফ করে বলা হয়, যারা সরকারি চাকরি প্রত্যাশা করেন তারা সবাই একই দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করেন না। কিন্তু আবার এটাও সত্য, সরকারি চাকরির ক্ষমতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা এখনো অন্য অনেক পেশার থেকে বেশি বলে সবাই স্বাভাবিকভাবেই এতে আকৃষ্ট হয়ে থাকেন। এর সবকিছুর পেছনে দায়িত্বের গুরুত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে ঔপনিবেশিক-কালের আলোকে সরকারি চাকরি কাঠামো অব্যাহত রাখা। আর বিসিএস হলে তো কথাই নেই, সবাই কাছের যেনই চূড়ান্তমাত্রায় কাক্সিক্ষত, ধন্য ধন্য রব উঠে যায়। যার ফলে এমনও দেখা যায়, কোনো কোনো শিক্ষার্থীর একমাত্র লক্ষ্য থাকে বিসিএস ক্যাডার হওয়া এবং এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করে দেয়।

এখন আলমগীর হোসেনের মতো শিক্ষার্থীদের চাকরি না পাওয়ার পেছনে সরকারি চাকরি পাওয়ার দুরন্ত বাসনা ও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা সমভাবে দায়ী। যেন সরকারি চাকুরে তৈরিই শিক্ষাব্যবস্থার একমাত্র উদ্দেশ্য। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় যে ১৪ লাখ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র সোয়া এক লাখ শিক্ষার্থী কারিগরি শিক্ষা নিয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ১২ লাখ সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবন শেষে কর্মক্ষেত্রে কোথায় যুক্ত হবেন? তাদের মধ্যে যতজন সরকারি চাকরির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন, তার অনেক গুণ সরকারি চাকরি না পাওয়ার হতাশায় ভুগবেন। এটা খুব সাধারণভাবেই বলা যায়, প্রতি বছর এত বিপুলসংখ্যক সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব না। এমনকি বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এরা দক্ষ হিসেবে বিবেচিত হন না উল্টো প্রয়োজনীয় দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেক বিদেশি আমাদের দেশের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হন। শুধু পরীক্ষার্থীদের সংখ্যা বিবেচনায় নয় বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় দুই মিলিয়ন জনগোষ্ঠী কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। এদের কর্মসংস্থানে যুক্ত করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় যোগ্য কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, যা তাদের মেধারই অপচয়।  সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটি ১ হাজার ৪০টি আসন কমানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। বলা হচ্ছে এর পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ করে তোলা। এই উদ্যোগ ইতিবাচক এবং ধারাবাহিকভাবে এমন আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।

শিক্ষাকে সমসাময়িক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। যদিও কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়ন শিক্ষা নিয়ে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। মনে করা হয়, যে শিক্ষার্থী দুর্বল তাকে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি করা হয়। সাধারণ শিক্ষাই মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটি পুরনো ধারণা। নতুন ধারণা হচ্ছে, যার দক্ষতা যত বেশি বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় তার চাহিদা তত বেশি। শিক্ষাব্যবস্থায় এ সমস্যা দূর করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সার্বিক বিবেচনায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব না। তাও আবার এ ধরনের প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকে যায়। অন্যদিকে বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে, যেখানে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জন করা ছাড়া কোনোভাবেই বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে টিকে থাকা যাবে না।

এই বিবেচনার অন্যথায় এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় যে ১৩ লাখ শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছে, এদের অনেকেই আলমগীর হোসেনের সমস্যার সম্মুখীন হবেন এবং হতেই থাকবেন। যত দিন না পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার এই খোলনলচে পাল্টিয়ে ফেলা যায় এবং শিক্ষা সম্পর্কিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা না যায়, এ অবস্থা থেকে সহজেই উত্তরণ হবে বলে মনে হয় না। 

লেখক : উন্নয়নকর্মী

psmiraz@yahoo.com