পুঁজিবাজারের ১১৬ ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ঋণাত্মক ইকুইটির পরিমাণ ৮ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৭ প্রতিষ্ঠানের ঋণাত্মক ইকুইটি হচ্ছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এক যুগের বেশি সময় ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে নেগেটিভ ইকুইটি রয়েছে, যা পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক লেনদেনের শক্তি কমিয়ে দিয়েছে।
মূলত শেয়ার ক্রয়ে গ্রাহককে দেওয়া ঋণ নির্ধারিত সময়ে ফোর্সড সেল (বাধ্যতামূলক বিক্রি) করতে না পারায় ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণের নেগেটিভ ইকুইটির সৃষ্টি হয়। আর এটি ২০১০ সালে পুঁজিবাজার পতনের সময় থেকে তৈরি হয়েছে। সে সময় বড় পতন হলেও ঋণপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফোর্সড সেল করতে না দেওয়ায় বিপুল পরিমাণের বিনিয়োগ নেগেটিভ ইকুইটিতে পরিণত হয়। অবশ্য সে সময় নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ আরও বেশি থাকলেও বর্তমানে তা অনেকটাই কমেছে।
এসইসি থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৬০টি ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের মধ্যে ১১৬টি প্রতিষ্ঠানে নেগেটিভ ইকুইটি রয়েছে, যার পরিমাণ ৮ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ ব্রোকারেজ হাউজ ও ১২ মার্চেন্ট ব্যাংকের নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ হচ্ছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা, যা বাজারের মোট ঋণাত্মক মূলধনের ৮৬ শতাংশ। ১১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯ মার্চেন্ট ব্যাংকের নেগেটিভ ইকুইটির পরিমাণ ৩ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। আর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ৭৫ ব্রোকারেজ হাউজের ৪ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ১২ ব্রোকারেজ হাউজের ৯৮ কোটি টাকা নেগেটিভ ইকুইটি রয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব নেগেটিভ ইকুইটি শূন্যে নামিয়ে আনার নির্দেশনা রয়েছে এসইসির।
এ বিষয়ে কমিশনার মো. আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগের কমিশনও ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ঋণাত্মক ইকুইটি কমিয়ে আনার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল। আমরাও এটি কমিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছি। এরই মধ্যে ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নেগেটিভ ইকুইটি শূন্যে নামিয়ে আনার সময় নির্ধারণ করা আছে। তবে এটি যাতে সহনীয় মাত্রার মধ্য দিয়ে হয়, আমরা সে চেষ্টা চালাচ্ছি। এ জন্য বছরের প্রথম প্রান্তিকেই আমরা এটি হাতে নিয়েছি, যাতে তারা নেগেটিভ ইকুইটি কমিয়ে আনতে পর্যাপ্ত সময় পায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে নেগেটিভ ইকুইটি থাকা ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের সংখ্যা বেশি দেখালেও বেশিরভাগ নেগেটিভ ইকুইটি অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের। বিগত সময়ে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান তাদের ঋণাত্মক ইকুইটি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনতে পেরেছে। আশা করছি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের ঋণাত্মক ইকুইটি শূন্যে নামিয়ে আনতে পারবে।’
এসইসি সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে ঋণাত্মক ইকুইটির পরিমাণ আরও বেশি ছিল। বেশ কিছু ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক তাদের মূল কোম্পানির সহযোগিতা নিয়ে মূলধন সমন্বয় করেছে। কয়েকটি মার্চেন্ট ব্যাংক তাদের নেগেটিভ ইকুইটি তথা গ্রাহকদের দেওয়া মন্দ ঋণ অবলোপন করেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মার্জিন রুলস, ১৯৯৯-এর ৩(৫) ধারা অনুযায়ী, কোনো বিনিয়োগকারীর ডেবিট ব্যালেন্স ১৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে ওই হিসাবে শেয়ার কেনাবেচা বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু ২০১০ সালের ধস-পরবর্তী বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় কয়েক দফা ধারাটির কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়।
জানা যায়, এআইবিএল ক্যাপিটাল মার্কেট সার্ভিসেস, মার্কেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজ, সিটি ব্রোকারেজ, ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজ, লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ, এমটিবি সিকিউরিটিজ, আইডিএলসি সিকিউরিটি ও এবি ব্যাংক সিকিউরিটিজ ঋণাত্মক হিসাব কমিয়ে আনতে পেরেছে। এর মধ্যে কেন কোন প্রতিষ্ঠান এসইসির করা ঋণাত্মক মূলধনধারী হিসাবের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রাইম ফাইন্যান্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পিএফআই সিকিউরিটিজ। প্রতিষ্ঠানটির মার্জিন ঋণ হিসেবে মূলধনী লোকসান প্রায় ৮৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থান রয়েছে রিলায়েন্স ব্রোকারেজ। এর বাইরে আইআইডিএফসি সিকিউরিটিজ, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ড, ইউনিক্যাপ ইনভেস্টমেন্ট ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং সিকিউরিটিজের বড় অঙ্কের নেগেটিভ ইকুইটি রয়েছে।