বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে তুলে নিয়ে দল বেঁধে ধর্ষণ

গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) এক ছাত্রীকে তুলে নিয়ে দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের আটক ও শাস্তির দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে টানা ১১ ঘণ্টা ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ ও থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছে বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা।

এর আগে গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে গোপালগঞ্জ শহরের জেলা প্রশাসন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাণাধীন ভবনে ধর্ষণের ওই ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা। বশেমুরবিপ্রবি ছাত্রীকে ধর্ষণে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শেষে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তদের হামলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির এক ছাত্রী তার বন্ধুর সঙ্গে গোপালগঞ্জ সদরের নবীনবাগ হেলিপ্যাডের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় ৫-৭ জন বখাটে ওই ছাত্রী ও তার বন্ধুকে জোর করে একটি অটোরিকশায় তুলে গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে যায়। সেখানে বন্ধুকে আটকে রেখে মারধরের পর ছাত্রীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করে বখাটেরা। পরে ধর্ষণের শিকার ছাত্রী তার বন্ধুদের মেসে গিয়ে ঘটনাটি জানায়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।

গোপালগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম জানান, বশেমুরবিপ্রবি ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিয়াস সিকদার (২২), অন্তর (২১) ও জীবন (২০) নামে তিন যুবককে আটক করে থানায় নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিও ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

আটক তিনজনের মধ্যে অন্তর ও জীবন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। তাদের আটকের পর শহরের অন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নবীনবাগে রাস্তার ওপর আবর্জনা ফেলে প্রতিবাদ জানায়। এ সময় সাংবাদিকরা সেখানে গেলে অবরোধকারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেয়।

বশেমুরবিপ্রবি ছাত্রীকে ধর্ষণের খবর জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা গতকাল সকাল ৬টা থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ঘোনাপাড়ায় অবস্থান নিয়ে অবরোধ তৈরি করেন। বিকেল ৫টায় ১১ ঘণ্টার অবরোধ শেষে ধর্ষকদের শনাক্ত ও আটকের জন্য ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে জড়িতদের খুঁজে বের করা না হলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা। অবরোধ তোলার আগ-মুহূর্তে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা তাদের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজন আহত হয় বলেও জানান তারা।

শিক্ষার্থীদের দীর্ঘসময় অবরোধের ফলে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে কয়েক হাজার গাড়ি আটকা পড়ে। বিকেল ৫টায় হামলার শিকার হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা অবরোধস্থল থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এর আগে ছাত্রী ধর্ষণে জড়িতদের আটকের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে গিয়ে বুধবার রাত ১২টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত গোপালগঞ্জ সদর থানা ঘেরাও করে রাখেন। পরে সকাল ৬টায় ঘোনাপাড়ায় গিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ভবন তালাবদ্ধ করে দেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

গতকাল দুপুর আড়াইটায় অবরোধকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ঘোনাপাড়ায় যান গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আলী খান, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা ও পুলিশ সুপার আয়েশা সিদ্দিকাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকতারা। তারা ছাত্রী ধর্ষণে জড়িতদের আটকের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের অবরোধ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়ার সঙ্গে সহমত পোষণ করা হয়। এ ছাড়া দোষীদের আটক ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও কর্মচারী সমিতিসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন বিবৃতি দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. রাজিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা তাৎক্ষণিক ওই ছাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি এবং আমি নিজে এ ঘটনায় বাদী হয়ে গোপালগঞ্জ সদর থানায় মামলা করেছি।’

গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিহাদ আদনান তাহিয়ান বলেন, ‘ছাত্রী ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়ার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে অভিযান চালানো হয়েছে। আমাদের টিম অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করছি খুব শিগগিরই জড়িত সবাইকে আটক করা সম্ভব হবে।’

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. একিউএম মাহবুব বলেন, ‘যে ঘটনা ঘটেছে তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও ঘৃণ্য। জড়িতদের দ্রুত আটকের জন্য প্রশাসনের সঙ্গে আমরা বারবার কথা বলে যাচ্ছি।’

জাবিতে বিক্ষোভ : বশেমুরবিপ্রবি ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শিক্ষকের কাছে ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) গতকাল বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। সন্ধ্যা ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর থেকে ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে মিছিলটি বের করেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ চত্বর ঘুরে মুরাদ চত্বরে গিয়ে মিছিলটি শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে বক্তারা ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।