ইউক্রেন যুদ্ধ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও ভর্তুকি হ্রাস

যুদ্ধ চলছে বাংলাদেশ থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে ইউক্রেনে। কিন্তু যুদ্ধের দামামায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়ে যাবে বাড়ির পাশের দোকানে। এরই মধ্যে বিভিন্ন অজুহাতে শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে প্রবীণদের ওষুধের দাম বেড়েছে দফায় দফায়। এখন যুদ্ধ তো একটা মোক্ষম অজুহাত হয়ে দাঁড়াবে। সাড়ে চার কোটি মানুষের দেশ ইউক্রেন ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ, খাদ্যভাণ্ডার বলে পরিচিত দেশটি বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশ। আর আক্রমণকারী রাশিয়া আয়তনে বিশ্বের সর্ববৃহৎ দেশ, বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী ও দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ।

যুদ্ধের কারণ বলা হচ্ছে, ন্যাটো বনাম রাশিয়ার সামরিক আধিপত্য ও সীমানা বিস্তার। কিন্তু ফলাফল দাঁড়াচ্ছে বিশ্বের অর্থনীতিতে অস্থিরতা। কেন রাশিয়া আক্রমণ করল, কেন ইউক্রেন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে, কেন আমেরিকা বড় বড় কথা বলে এখন পর্যবেক্ষক হয়ে গেল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না, কত দিন চলবে এই যুদ্ধ এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলবে। কিন্তু এ কথা তো সত্যি যে, যুদ্ধের বলি হবে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ, অস্ত্র বিক্রি বাড়বে, বিভিন্ন দেশের মধ্যে সন্দেহ, অবিশ্বাস বাড়বে আর সবচেয়ে বাড়বে শ্রমজীবী মানুষের অসহায়ত্ব। এর প্রথম ধাক্কা আসবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে। এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে অনেক।  

এ তো গেল বিশ্ব পরিস্থিতি। কিন্তু বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য বাড়াতে কোনো কারণ কি লাগে? দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির গোপন কারণ মুনাফা বাড়ানো আর প্রকাশ্যে বলা হয় খরা, বৃষ্টি, বন্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, তেলের দাম, বিদ্যুতের দাম এ রকম কত কারণ! গত দুই বছর বলা হলো মহামারী করোনার কারণে অর্থনীতিতে ধস, উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধির ফলে পণ্যের দাম স্থির থাকছে না। তবে যত অস্থির হোক না কেন, অস্থির হয়ে কমে যাচ্ছে না, ক্রমাগত বাড়ছেই। পুঁজিবাদী সারা বিশ্বেই এমন হচ্ছে। বাংলাদেশ তো এর বাইরে থাকতে পারে না! সরকার বিভিন্ন খাতে যে পরিমাণ ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে তা দিয়ে বর্ধিত মূল্যবৃদ্ধি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। তাই ভর্তুকির বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করার চিন্তা করছে সরকার। এতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ আরও বাড়ানোর প্রয়োজন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

যে বছর চলছে অর্থাৎ ২০২১-২২ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও ঋণ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এর পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা করা হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ২২ শতাংশ বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী বছর কি বাজেট বড় হবে না? বাজেট বড় হলে তুলনায় ভর্তুকি কি বাড়বে না? এরই মধ্যে বলা শুরু হয়েছে মূলত সার ও বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে।

সেই পুরনো যুক্তি আবার নতুন করে উত্থাপন করা হচ্ছে ভর্তুকি বাড়ানো নয়, লোকসান কমাতে দাম সমন্বয় করতে হবে। সোজা ভাষায় বুঝলে সাধারণ মানুষ বুঝবে, দাম বাড়ানো হবে। ফলে বছরের শুরুতে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকারের নাকি আর কোনো উপায় নেই তাই ভর্তুকির চাপ থেকে বাঁচতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন আর্থিক মুদ্রা ও মুদ্রাবিনিময় হার-সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সদস্যরা। কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে এমন প্রস্তাবনা করা হয়েছে। জনজীবনে এবং উৎপাদনের কাজে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এ দুটি পণ্যের মূল্য সমন্বয় করা না হলে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ নাকি ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রাষ্ট্রের হাতে টাকা নেই তাই অর্থ সংকটের কারণে বিপুল অঙ্কের এই ভর্তুকি বহন করা সম্ভব নয়। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া নাকি সরকারের কাছে বিকল্প আর কোনো পথ নেই। কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের ওই বৈঠকে ঋণের সুদের ব্যয় ও ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধিকে অর্থনীতির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

বলা হচ্ছে, আগামী অর্থবছর সরকার প্রদত্ত ভর্তুকির বেশির ভাগ অর্থই ব্যয় করা হবে কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতে। কৃষি খাতের মধ্যে মূলত সার খাতে ভর্তুকির বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখা হবে। এরপরই বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হবে। এদিকে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ভর্তুকির চাপ বেড়ে চলেছে। অর্থবছরের ছয় মাস অতিক্রান্ত না হতেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে বাড়তি ভর্তুকির চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। এই চাহিদার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরের ২০২১-২২ বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এরই মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই ভর্তুকিতে তাদের ‘পোষাবে’ না। এজন্য তাদের দরকার ১৮ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বিদ্যুতের জন্য এবারকার বাজেটে ভর্তুকির বরাদ্দ রয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, এ টাকায় তাদের চাহিদা মিটবে না। বিদ্যুতের ভর্তুকি দরকার কম করে হলেও ১২ হাজার কোটি টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে যদি বর্ধিত ভর্তুকি না দেওয়া হয় তাহলে নাকি বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের কোনো উপায় থাকবে না। তবে যে ধরনের খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও সারের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগামী মার্চের পর এই দুটি পণ্যের দাম বাড়ানো হতে পারে। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন, বিদ্যুৎ, কৃষি খাতে। সড়ক পরিবহনের ভাড়া বেড়েছে ২৭ শতাংশ আর নৌ-পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে ৩৫ থেকে ৪৬ শতাংশ। যার ফলে দাম বেড়েছে কৃষিসহ সব ধরনের পণ্যের। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি হিসেবে এলএনজি খাতে (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ছয় হাজার কোটি টাকা, সার খাতে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। খাদ্য ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্য খাতে রয়েছে আরও কিছু অর্থ।

অন্যদিকে প্রণোদনা হিসেবে ধরা রয়েছে ১১ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে রপ্তানি খাতে প্রণোদনা ৬ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। জুট খাতে ৮০০ কোটি টাকা এবং রেমিট্যান্স খাতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে আরও চার হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ঋণ হিসেবে দেওয়া কিছু টাকাও ভর্তুকি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ছয় লাখ কোটি টাকার বেশি বাজেটে জনগণের জীবনে কিছুটা স্বস্তি আনতে ভর্তুকি হিসেবে ৪৯ হাজার কোটি টাকা কি খুব বেশি? 

জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে দেওয়া এসব এত এত ভর্তুকির চাপ নাকি সরকার সইতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী ভর্তুকি কমাতে বললেন আর একনেকের বৈঠকের পর পরিকল্পনামন্ত্রী তো বলেই ফেললেন, ‘ভর্তুকি, ভর্তুকি, ভর্তুকি! আর কত? এটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ভর্তুকি থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। ভর্তুকি ন্যায়সংগত নয়, ভর্তুকি কোনো খয়রাতি নয়’। ভর্তুকি আসলে দেওয়া হয় কার টাকায় এবং কোন কোন খাতে? এর প্রভাব অর্থনীতিতে কতটুকু? এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু জনগণের টাকা কৃষি খাতে যে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হয় তার প্রভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়লে এর সুফল কি জনগণ পায় না? সেবা খাতের ভর্তুকি মানুষের কি উপকারে আসে না? ব্যবসায়ীরা মুনাফার জন্য দাম বাড়াতে চাইবে, জনগণ সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পেতে চাইবে, কিন্তু সরকার কী করবে, কার পাশে দাঁড়াবে? 

বিদ্যুৎ, গ্যাস, ওয়াসার মতো খাতে দুর্নীতি, ভুলনীতি, অপচয় করে লোকসান বাড়িয়ে তার দায় জনগণের কাঁধে চাপানোর দুটো ফল আছে। প্রথমত, জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে ভর্তুকি দেওয়া। দ্বিতীয়ত, দাম বাড়ানোর ফলে জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের বিল বাকি পড়ে আছে ৯ হাজার কোটি টাকা আর গ্যাসের বিল বাকি আছে ৬ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। এই টাকা আদায়ের কী উদ্যোগ আছে তা কিন্তু দৃশ্যমান নয়। বর্ধিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে ১২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে যে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হলো এটাও কি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েই তুলতে হবে? তেল ও এলএনজির দাম বিশ্ববাজারে বেড়েছে বলে দেশে দাম বাড়ানো হয় কিন্তু পানিও কি আমদানি হয় যে এর দাম এত বাড়াতে হবে?

ভারতে প্রতি ইউনিট কয়লা বিদ্যুতের দাম বাংলাদেশি টাকায় ৫.৮২ টাকা হলে বাংলাদেশে তা ১০ টাকা হবে কেন? বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ খরচ ভারতে ৯৮ লাখ টাকা হলে বাংলাদেশে তা ১০ কোটি টাকা হবে কেন? বিদেশি কোম্পানির গ্যাসের দামের তুলনায় দেশীয় কোম্পানির গ্যাসের দাম কেন বেশি প্রস্তাব করা হচ্ছে? এসব কেনর সঠিক উত্তর পেলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কথা ভাবতে হতো না।

যেকোনো ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব হলে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে। বাংলাদেশে এটা ঘটছে সব ক্ষেত্রে। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে দুর্নীতি এবং ভর্তুকি কোনটার ভার বেশি। দুটোই জনগণ বহন করে। একটার সুফল পায় জনগণ, অন্যটার সুফল পায় মুষ্টিমেয় দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী। বিবেচনা করতে হবে কোনটার ভার বহন করতে জনগণের কষ্ট হয় বেশি। জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে দুর্নীতি বন্ধ করার দাবি কি জনগণ করবে না?  

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট