ইউক্রেনের বর্তমান সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করতে দেশটির সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গতকাল শুক্রবার রাশিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের এক বৈঠকে এ আহ্বান জানান তিনি।
টিভিতে সম্প্রচারিত ওই ভাষণে পুতিন বলেন, ‘আমি ইউক্রেনের সেনাসদস্যদের প্রতি আবারও আহ্বান জানাব, আপনাদের সন্তান, স্ত্রী ও বয়োবৃদ্ধদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ নব্য-নাৎসি আর কট্টরপন্থি জাতীয়তাবাদীদের দেবেন না।’
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আপনাদের নিজেদের হাতে ক্ষমতা তুলে নিন। তাহলে কিয়েভের মাদকাসক্ত এবং নব্য-নাৎসি চক্রের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে বরং আপনাদের সঙ্গে কথা বললে চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ হবে।’
পুতিনের ভাষ্য, ইউক্রেন সরকার বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসীদের মতো আচরণ করছে। সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে শান্তিকামী মানুষকে হত্যার অভিযোগ তুলছে। বিদেশি পরামর্শদাতাদের মতো কাজ করার কারণে ইউক্রেন আজ এ অবস্থার মুখে পড়েছে বলেও দাবি পুতিনের।
এ ভাষণের আগে পুতিন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। তারপর চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয় শর্তসাপেক্ষে ইউক্রেনের সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি রাশিয়া।
এর আগে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছিলেন, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করলেই কেবল কিয়েভের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত মস্কো। একই সঙ্গে তিনি বলেন, নব্য-নাৎসিরা ইউক্রেন শাসন করুক মস্কো তা চায় না। গতকাল ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রুশ সৈন্যদের প্রবেশের পর এসব কথা বলেছেন তিনি। সের্গেই ল্যাভরভ আরও দাবি করেছেন, রাশিয়া চায় ইউক্রেনের জনগণ স্বাধীন হোক এবং স্বাধীনভাবে তাদের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ থাকুক। তবে প্রতিবেশী এই দেশটি নব্য-নাৎসিদের শাসনে চলুক সেটি ক্রেমলিন কখনই চায় না বলে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। রাশিয়ার এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ইউক্রেনের বর্তমান সরকারকে গণতান্ত্রিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছে না মস্কো।
ল্যাভরভ আরও বলেন, ‘মস্কো ইউক্রেনের দখল নিতে চায় না; বরং ইউক্রেনকে নিরস্ত্র করাই মস্কোর লক্ষ্য। দেশটিকে এখন নিজেদের ভাগ্য বেছে নিতে হবে।’ রাশিয়া একটি গণতান্ত্রিক দেশে হামলা চালাতে পারে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ল্যাভরভ ইউক্রেনকে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ‘সাবেক যুগোসøাভিয়া, ইরাক ও লিবিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলো আগ্রাসন চালিয়েছিল। গণতন্ত্রের নামে এসব আগ্রাসনে হাজারো নিরস্ত্র মানুষের প্রাণ গেছে। পশ্চিমারা ইউক্রেনের হাতেও অস্ত্র তুলে দিয়েছে। তাই রাশিয়া দেশটিকে নিরস্ত্র করবে। ইউক্রেনের সেনাদের অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে।’
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে শুরু হওয়া অভিযানের দ্বিতীয় দিনে রাশিয়ার সৈন্যরা কিয়েভে পৌঁছেছে। শুক্রবার ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক টুইট বার্তায় এই তথ্য নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, রুশ সৈন্যরা এখন কিয়েভে। তবে ইউক্রেনের সৈন্যরা রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই গড়ে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পেজে দেওয়া এক পোস্টে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, রাজধানীর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রুশ সৈন্যদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। রুশ সৈন্যদের কিয়েভে প্রবেশ ঠেকাতে উত্তর-পশ্চিমের টেটেরিভ নদীর সীমান্ত এলাকার একটি সেতু ধ্বংস করে দিয়েছে ইউক্রেনের সৈন্যরা। মন্ত্রণালয় বলছে, শত্রুরা এখন কিয়েভের ওবোলোন জেলায় পৌঁছেছে। রাজধানী কিয়েভের সংসদ ভবন এলাকা থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ওবোলোন শহর। দেশটির কর্মকর্তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের পাল্টা লড়াইয়ের জন্য মোলোটোভ ককটেল তৈরি করতে উৎসাহ এবং অন্যদের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ইউক্রেনের সেনাবাহিনী বলেছে, রাজধানী কিয়েভের উপকণ্ঠের ডাইমার এবং ইভানকিভ শহরে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে। সেখানে রাশিয়ার বেশ কিছু সাঁজোয়া যান অগ্রসর হতে দেখা গেছে।
গতকাল ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের প্রতিনিধিদের মিনস্কে আলোচনার জন্য পাঠাতে প্রস্তুত।’ এমন বক্তব্যের পরেই বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো জানান, উভয় পক্ষের আলোচনার জন্য যা দরকার তা দিতে রাজি আছে মিনস্ক। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানোর সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নিতে বেলারুশ আগ্রহী বলেও তিনি জানান।