রাশিয়ার বিরুদ্ধে অসম প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেন। গত কয়েক মাসে রাশিয়াবিরোধী বাগযুদ্ধে ইউক্রেনের পাশে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিও ব্যাপক আড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে আসছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার ভোরে রুশ বাহিনী যখন ইউক্রেনের তিন দিক দিয়ে হামলা চালাতে শুরু করে, তখন কার্যতই কিয়েভের প্রতি সাহায্যের কোনো হাত বাড়িয়ে দেয়নি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য। বিভিন্ন দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে সত্যি, কিন্তু এতে ইউক্রেনের যুদ্ধের ময়দানে কোনো প্রভাব পড়ছে না। যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেও ইউক্রেনের অনেক সেনা নিহত হয়েছে। রাশিয়া দাবি করছে, তারা ইউক্রেনের ৮০টির বেশি সামরিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্র ইতিমধ্যেই রুশ সেনাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ছোট কয়েকটি শহরের পূর্ণাঙ্গ দখল নিয়েছে তারা। যেকোনো মুহূর্তে মারিওপোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরীর পতন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, আগামী ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে কিয়েভের পতন হতে পারে রুশ সেনাদের হাতে।
ইউক্রেন এখনো ন্যাটোর সদস্য নয়। ন্যাটোর প্রধান জেনস স্টোলটেনবার্গ বলেছেন, ‘ইউক্রেনের পথে ন্যাটোর কোনো সেনা নেই। ইউক্রেনে ন্যাটো বাহিনী পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমাদের যাবতীয় পদক্ষেপ প্রতিরক্ষামূলক।’ পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশে ন্যাটো ব্যাপক মাত্রায় সৈন্য সমাবেশ করলেও এতে ইউক্রেনের কোনো লাভ হচ্ছে না। ইউক্রেন প্রেসিডেন্টের অন্যতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হোয়াইট হাউজে বসে রাশিয়ার ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করে চলেছেন। কিন্তু তিনি নিজেই বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছে নেই যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রসহ শীর্ষ দেশগুলোর নীতিনির্ধারকরা ভালো করেই জানেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পুতিনকে খুব একটা কাবু করা যাবে না। কারণ পুতিন সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনা করেই ইউক্রেনে হামলার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়েছেন। গত দুই দিনে রাশিয়ার মুদ্রা রুবলের মান সর্বোচ্চ কমলেও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই অবস্থা কিছুদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।
মিত্রদের এমন আচরণ বৃহস্পতিবারই টের পেয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভিডিওবার্তায় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের দেশকে রক্ষার জন্য (সবাই) আমাদেরকে একা ছেড়ে গেছে। ইউক্রেনকে রক্ষায় আমাদের পাশে থেকে কারা লড়াই করতে প্রস্তুত? আমি কাউকেই দেখতে পাই না। ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়ার ব্যাপারে কে ইউক্রেনকে নিশ্চয়তা দেবে? সবাই ভীত। ইউক্রেনকে সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্য করতে আমি ২৭ জন ইউরোপীয় নেতাকে অনুরোধ করেছি। কিন্তু কেউই কোনো উত্তর দেয়নি। সবাই ভীত।’ ইউক্রেনের এই বর্তমান একাকিত্ব এতটাই দৃশ্যমান যে, ন্যাটোকে তাদের ‘প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা’ প্রকাশ করতে হচ্ছে। ন্যাটো চাইলেই ইউক্রেনে সেনা পাঠাতে পারে না। একদিকে ইউক্রেন ন্যাটোভুক্ত নয়, এটা একটা অন্যতম কারণ। এর বাইরেও প্রতিবেশী হিসেবে ন্যাটো চাইলে ইউক্রেনকে সহায়তা করতে পারত, সেই বিকল্প আছে ন্যাটোর নীতিমালার ‘আর্টিকেল-৫’ অধ্যাদেশে। ওই অধ্যাদেশে প্রতিবেশীকে রক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা আছে। আর্টিকেল-৫-কে চালু করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক দেশ আহ্বান জানালেও ব্লকের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলো তাতে সাড়া দিচ্ছে না। ওই অধ্যাদেশ চালু করতে ইউনিয়নের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হয়।
ওয়ারশভিত্তিক থিংকট্যাংক জাস্টিনা গোটকোয়াস্কার মতে, ইউক্রেনে বিদেশি সেনা পাঠানোর একটি মাধ্যম হতে পারে ভেরি হাই রেডিনেস জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স (ভিজেটিএফ)। এই টাস্কফোর্সের সদস্যসংখ্যা ২০ হাজার। একে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় অংশ বলা হয়। এই অংশের অধীনে আরও সৈন্য নিকট ভবিষ্যতে পূর্ব ইউরোপে জড়ো হতে পারে বলেও মনে করেন জাস্টিনা।
বসে নেই রাশিয়া। পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা ভাবছে মস্কো। রাশিয়াও পাশ্চাত্যের দেশগুলোর ওপর পাল্টা নিষেধাজ্ঞা জারি করবে বলে হুমকি দিয়েছে মস্কো। শুক্রবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এক সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমের দেশগুলোর উদ্দেশে এই সতর্কবার্তা দেন। সংবাদ সম্মেলনে পেসকভ বলেন, ‘পাশ্চাত্যের দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া সমস্যায় পড়বে; এটি সত্য, কিন্তু সেসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে না; কারণ গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়া বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে।’
মিত্রহীন ইউক্রেন এখন আলোচনায় আগ্রহী। ইউক্রেন শান্তি চায় এবং ন্যাটোর ব্যাপারে নিরপেক্ষ অবস্থানসহ অন্যান্য বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। গতকাল শুক্রবার রয়টার্সকে এসব কথা বলেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মাইখাইলো পোডোলিয়াক। তিনি বলেছেন, ‘যদি তারা ন্যাটোর ব্যাপারে নিরপেক্ষ অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে মস্কোতে বসে আলোচনা করতে চায়, সম্ভব হলে সেটি হওয়া উচিত। আমরা এতে ভয় পাই না। আমরা এটা নিয়েও কথা বলতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘শান্তির জন্য অবিরাম ইচ্ছার অংশ হিসেবে সংলাপে আমরা প্রস্তুত। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অথবা ন্যাটো জোটের অংশ নয় ইউক্রেন। যদিও উভয় সংস্থায় যোগ দিতে চায় দেশটি। কিন্তু ইউক্রেনের ন্যাটো জোটে যোগদান কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নয় মস্কো।’
ইউরোপীয় ইউনিয়ন-যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের বাইরে অন্য রাষ্ট্রগুলোও ইউক্রেনের পাশে নেই। পরাশক্তিধর রাষ্ট্র চীন ও ভারত কৌশলগত অবস্থানে আছে। যুদ্ধে উসকানি দেওয়ার যেকোনো কাজের বিরোধিতা করে চীন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং বৃহস্পতিবার এই মন্তব্য করেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার বরাত দিয়ে দেশটির ‘পিপলস ডেইলি’র অনলাইন প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে হাজির হন হুয়া চুনিং। সেখানে ইউক্রেন ইস্যুতে প্রশ্ন ওঠে। জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, যুদ্ধে উসকানি দেওয়ার যেকোনো কাজের বিরোধিতা করে চীন। উত্তেজনা না বাড়াতে সব পক্ষকে বোঝানোর পাশাপাশি উসকানি না দেওয়ার জন্য শুরু থেকেই পেইচিং দায়িত্বশীল মনোভাব নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে হুয়া চুনিং উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে কমপক্ষে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১ হাজার টন অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠিয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘সে সময় যদি সব পক্ষ শান্তি আলোচনায় এগিয়ে আসত, ইউক্রেন ইস্যুর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করত, একে অপরের নিরাপত্তা উদ্বেগকে সম্মান করত, বিষয়টি সুনজরে দেখত, পরিস্থিতি নমনীয় করার জন্য যুক্তিসংগত ও সঠিক উপায়ে সমস্যার সমাধান করত, তাহলে কি এখনকার ঘটনা ঘটত?’ চীনবিরোধী জোট কোয়াডের অন্যতম সদস্য ভারতও নীরব রয়েছে ইউক্রেন ইস্যুতে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন গতকাল জানান, ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে আলোচনা ‘অমীমাংসিত’ রয়েছে।
এদিকে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ঢুকে পড়েছে রাশিয়ার সৈন্যরা। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক টুইটে বলেছে, ‘শত্রুরা’ ওবোলোনে পৌঁছে গেছে। এটি কিয়েভ শহরের কেন্দ্রস্থল, পার্লামেন্ট থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরে। মলোটভ ককটেল বা পেট্রোল বোমা তৈরি করে লড়াইয়ে অংশ নিতে স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্র্তৃপক্ষ। অন্যদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে তারা। টুইটে ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, শান্তিপ্রিয় বাসিন্দারা সতর্ক থাকুন। ঘর ছেড়ে বাইরে বের হবেন না। কিয়েভে অবস্থানরত সাংবাদিকরা এর আগে গোলাগুলির শব্দ পাওয়ার খবর জানিয়েছিলেন। এখন শহরে বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
অভিযানের দ্বিতীয় দিনে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছের প্রধান একটি বিমানবন্দর দখলে নিয়েছে রুশ সৈন্যরা। প্রায় ২০০ হেলিকপ্টার ব্যবহার করে অভিযান চালিয়ে ইউক্রেনের দুই শতাধিক সৈন্যকে হত্যার পর ওই ঘাঁটি দখলে নেওয়া হয়েছে বলে শুক্রবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। ইন্টারফ্যাক্স বলছে, হোসটোমেল বিমানঘাঁটি দখল করতে ২০০ হেলিকপ্টার এবং সেনাবাহিনীর একটি পদাতিক ডিভিশন ব্যবহার করা হয়েছে। হোসটোমেল বিমানবন্দর দখলে নেওয়ায় ভারী সামরিক সরঞ্জাম এবং সৈন্য পরিবহনকারী রাশিয়ার বিমান অবতরণ করতে পারবে সেখানে। বিমানবন্দরটিতে দীর্ঘ রানওয়ে থাকায় রাশিয়া থেকে সরাসরি কিয়েভের ওই বিমানবন্দরে সৈন্য পরিবহন করা যাবে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মেজর জেনারেল ইগোর কোনাশেনকোভ বলেছেন, রাশিয়ার বিমানবাহিনী হোসটোমেল দখলে নেওয়ার জন্য ২০০ হেলিকপ্টার ব্যবহার এবং ইউক্রেনের বিশেষ বাহিনীর ২০০ জনেরও বেশি সদস্যকে হত্যা করেছে। তবে এই অভিযানে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্য হতাহত হয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি। যদিও ইউক্রেন পাল্টা দাবি করে বলেছে, হোসটোমেল বিমানবন্দরে সংঘর্ষে ব্যাপক রুশ সৈন্য হতাহত হয়েছে। এদিকে কিয়েভ শহরের মেয়র বলেছেন, ইউক্রেনের রাজধানী এখন প্রতিরক্ষামূলক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।