দরপত্র ছাড়াই নিজস্ব লোক দিয়ে উন্নয়নকাজ ও মালামাল কেনা, পরিষদের ভবন ইজারা নিয়ে বাণিজ্যিক পাখি পালন, খেয়াঘাট ইজারা না দিয়ে নিজেরাই টোল আদায় ও ঘুষ গ্রহণসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এসএম মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে। তাকে নিয়ে জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদার ও খুলনাবাসীর ক্ষোভ-অভিযোগের অন্ত নেই। জেলা পরিষদের এ দাপুটে কর্মকর্তা অনেকের কাছে ছায়া চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত। ভুক্তভোগীরা বলছেন, চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ নন, জেলা পরিষদ চালান প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান। তার ওপর পরিষদেরই অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষুব্ধ হলেও চাকরি হারানোর ভয়ে নাম প্রকাশ করে কেউ কিছু বলতে রাজি নন। তবে মাহবুবুর রহমানের দাবি, তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে।
খুলনা জেলা পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাতক্ষীরা জেলা পরিষদ থেকে বিভিন্ন জায়গায় বদলি করা হয় মাহবুবুর রহমানকে। কিন্তু সেসব জায়গায় যোগদান না করে মামলা করে স্থগিতাদেশ নিয়ে থেকে যান সাতক্ষীরায়। সেখানে দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি তদবির করে চলে আসেন খুলনা জেলা পরিষদে। আর খুলনায়ও জেলা পরিষদ ঘিরে তার নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে অনিয়ম-দুর্নীতির একটি চক্র। বর্তমানে জেলা পরিষদের তিনতলা একটি ভবনে বসবাস করছেন সপরিবারে। যেখানে করছেন বাণিজ্যিক পাখি পালনও।
জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, ভৌতিক প্রকল্প তৈরি ও দরপত্রবিহীন উন্নয়নকাজসহ পরিষদের সব ক্ষেত্রেই চলছে চরম নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতা। জেলা পরিষদের অধীন খেয়াঘাট ইজারা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনেক খেয়াঘাটে নিজেরাই খাস (টোল) আদায় করছে। আদায় করা টোলের নামমাত্র অংশ জেলা পরিষদে জমা হচ্ছে। বাকি টাকা ঢুকছে সিন্ডিকেটের পকেটে। করোনা মোকাবিলায় বিভিন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী কেনার প্রকল্পের ৫০ লাখ টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। এছাড়া বিভাগভিত্তিক উন্নয়নমূলক ও জরুরিভিত্তিক ২৫ হাজার টাকার কাজ, ১০টি ডাকবাংলো মেরামত এবং কম্পিউটার ও ক্রোকারিজ সামগ্রী কেনার নামে বিপুল টাকা নয়ছয় করা হচ্ছে। রূপসায় এক হাজার আসনের অডিটরিয়াম নির্মাণ প্রকল্পের জমা পড়া সব দরপত্র নিয়মবহির্ভূতভাবে বাদ দিয়ে মাহবুবুর রহমানের পছন্দের ‘স্মার্ট’ নামে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জেলা পরিষদ ভবন ও পাশের একটি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ এবং গল্লামারী স্মৃতিসৌধের সীমানা প্রাচীরসহ বিভিন্ন কাজ দরপত্র আহ্বান ছাড়াই করা হচ্ছে।
জেলা পরিষদের অর্থায়নে ‘দৈনিক খুলনা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশেও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। জেলা পরিষদের প্রধান কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানকে পত্রিকাটির সম্পাদক করা হয়েছে। তবে একজন সরকারি কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ছাড়াই পত্রিকার সম্পাদক হতে পারেন কি না তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সরকারি অর্থ পত্রিকা পরিচালনায় ব্যয় হচ্ছে। সেখানেও প্রকৃত খরচের ১০ গুণ বাড়তি বিল করে টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে কারও কারও অভিযোগ।
জেলা পরিষদের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খুলনা জেলা পরিষদে প্রতিটি ক্ষেত্রে চলছে অনিয়ম ও ব্যাপক ঘুষবাণিজ্য। ঘুষ ছাড়া কোনো প্রকল্পই দেওয়া হয় না। ভুয়া বা অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ নৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ভুক্তভোগী ঠিকাদার আবদুল্লাহ সবুজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা পরিষদের কাজ করব কী করে? টেন্ডার ছাড়াই উনারা কাজ দিয়ে দিচ্ছেন। নতুন প্রশাসনিক কর্মকর্তা এসেছেন, তিনি যে কী নিয়মে পরিষদ চালাচ্ছেন তা বুঝতে পারছি না। জেলা পরিষদের পেছনে দোতলা যে ভবনটিতে উনি থাকেন, সেটা টেন্ডার ছাড়াই তিনতলা বানাচ্ছেন। পাখি পোষার জন্য উনি জেলা পরিষদের কাছ থেকে কোন আইনে ১০ বছরের জন্য ওই ভবনটি লিজ নিলেন তা বুঝতে পারছি না।’
চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ না প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জেলা পরিষদ চালান তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরীর বেসরকারি উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠান (এনজিও) ‘মহিলা ও প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা’র নির্বাহী পরিচালক বুলু রাণী ম-ল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার একটি প্রজেক্ট নিয়ে মাহবুব তিন বছর ধরে ঘুরিয়েছে। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমাকে লিখে দিয়েছে। প্রতিবন্ধীদের হুইল চেয়ার দেওয়ার প্রকল্প পাস করার সময় ২০ হাজার টাকা তাকে (মাহবুবুর রহমান) দিয়েছি। তারপর মাহবুব আমার অফিসে এসে বলে, “এখানে তো এসিরুম নেই। এটা ভালো কোনো জায়গা নয়।” তারপর তার যে চাহিদা তা আমার পক্ষে পূরণ করা সম্ভব ছিল না। পরে হারুন আঙ্কেলকে বললাম। তিনি বললেন, “আমি কী করতে পারি?” আমি হারুন আঙ্কেলকে বলেছিলাম, জেলা পরিষদ চালান আপনি না মাহবুব?’
বুলু রাণী আরও বলেন, ‘ওর বিরুদ্ধে (মাহবুবুর রহমান) অভিযোগের প্রায় দেড় কেজি কাগজ নিয়ে হারুন আঙ্কেলকে দেখিয়ে বলেছিলাম, ওরে এই জায়গায় রাখবেন না। ওর জন্য খুলনা জেলা পরিষদের দুর্নাম হচ্ছে আর আপনার মানসম্মান থাকবে না। সবার প্রশ্ন জেলা পরিষদ চলছে কীভাবে?’
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে এসএম মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘ভবনটি (যেখানে বাণিজ্যিক পাখি পালন করেন) পরিত্যক্ত সেই কারণে নিয়েছি। জেলা পরিষদ অনুমোদন দিয়েছে। এখানে কোনো কিছুই নিয়মের বাইরে হয় না। কিছু মানুষ ঈর্ষান্বিত হয়ে এসব অভিযোগ করছে।’
মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা জেলা পরিষদের সচিব বিষু পদ পাল বলেন, ‘কিছু কাজ টেন্ডার ছাড়াই করার নিয়ম আছে। বাকি সব কাজ নিয়ম অনুযায়ীই হচ্ছে।’
জেলা পরিষদের অর্থ ব্যয়ে পত্রিকা প্রকাশের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিষদের প্রধান কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পত্রিকার অনুমোদনটি আগের ডিসি (মোহাম্মদ হেলাল হোসেন) দিয়ে গেছেন।’ পত্রিকার সম্পাদক হতে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পদাধিকার বলে আমি সম্পাদক।’ সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সরকারি খরচে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের বিষয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এটা আমি জানি না।’
জেলা পরিষদের অর্থায়নে পত্রিকা প্রকাশের অনুমতির বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনার বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘নিয়ম মেনে তবেই তো পত্রিকা প্রকাশ করছে। আপনার যদি কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য থাকে আপনি জানাতে পারেন। বিষয়টা খতিয়ে দেখব।’
প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এবং ছায়া চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের গুঞ্জনের বিষয়ে বক্তব্য জানতে খুলনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি এই প্রতিবেদকের পরিচয় শুনেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে কল করার কারণ জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া দেননি।