মধ্যস্বত্বভোগীরা বাড়াচ্ছে সবজির দাম

খুচরা বাজারে দীর্ঘদিন ধরেই সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সবজির দাম বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য।

গতকাল রবিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষি সচিব মো. সায়েদুল ইসলাম বলেন, ‘সবজির মূল্যবৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করতে আমরা একটা গবেষণা করছি। কৃষি কর্মকর্তারা ছাড়াও জেলা প্রশাসনকে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। গবেষণা শেষে সবজির মূল্যবৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণগুলো জানতে পারব। কেন সবজির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটা আমরা নির্ণয় করতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত যে তথ্যগুলো পেয়ে আসছি তা হচ্ছে সব সময় মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ থাকে মধ্যস্বত্বভোগী।’

জানা গেছে, বিশ্ববাজারে কিছু পণ্যের দাম অস্থিতিশীলতার কারণে নিত্যপণ্যের দম বাড়ছে বেশ কিছুদিন ধরেই। কিন্তু দেশে উৎপাদিত শাক-সবজির দাম কেন দীর্ঘদিন ধরে বেশি, তার কোনো যৌক্তিক কারণ এতদিন খুঁজে পাচ্ছিলেন না কৃষি কর্মকর্তারা।

গবেষণা শুরুর পর প্রাথমিকভাবে কয়েকটি কারণ তারা ইতিমধ্যে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটের বিষয়টিই প্রধান বলে জানালেন কৃষি সচিব।

তিনি বলেন, ‘গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে যে সবজির কেজি ১০-২০ টাকা হয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে সেটা আমরা ঢাকায় ৬০-৭০ টাকায় কিনে খাই।’

দ্বিতীয়ত এ বছর অসময়ে দুই বার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিশেষ করে ৫ ডিসেম্বর ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে যে বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে। তবে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি হয়নি, কারণ কৃষক দ্বিতীয়বার উৎপাদনে গিয়ে তা পুষিয়ে দিয়েছে। ফলে তাদের খরচ বেশি পড়েছে। কৃষকের ব্যয় বৃদ্ধি বাজারে সবজির মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি কারণ বলে মনে করছেন কৃষি সচিব।

বাজারে এখন প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকার মধ্যে। শীতের সবজি হলেও সদ্য বিদায়ী শীত মৌসুম জুড়ে ২০ টাকার নিচে নামেনি এ দুটো সবজির দাম।

একইভাবে গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে মুলা, শালগম, শিম, লাউ, টমেটোসহ মৌসুমের প্রধান সবজিগুলো।

দাম বৃদ্ধির পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা আবিষ্কার করলেও তাদের দমন করার কোনো উদ্যোগের কথা জানাতে পারেননি সায়েদুল ইসলাম।

খাদ্যশস্য ও কৃষিপণ্যের জোগান অব্যাহত রাখতে ও উৎপাদন বাড়াতে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেশ কয়েকটি পুরনো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, কৃষি বিপণন কেন্দ্র অন্যতম।

এসব প্রতিষ্ঠান থাকার পরেও সবজির দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে কেন নতুন করে গবেষণা করতে হচ্ছে সেই প্রশ্নের জবাবে কৃষি সচিব বলেন, ‘বাজার নিয়ন্ত্রণে আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবস্থা নিয়ে যাচ্ছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি মধ্যস্বত্বভোগী এখানে একটা ভূমিকা রাখছে। এই মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমাতে আমরা কাজ করছি। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও কাজ করছে। আমরা এখন দেখতে চাচ্ছি কোন পর্যায়ে কত দাম হওয়া উচিত।’

জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে। এই তালিকায় চীন প্রথম এবং ভারত দ্বিতীয়। কৃষি খাত থেকে জিডিপির ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশ আসে। দেশে এখন চাষাবাদ হয় ১০০ প্রজাতির সবজি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত ১২ বছরে দেশে সবজির উৎপাদন প্রায় সাতগুণ বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৯৭ লাখ ১৮ হাজার টন সবজি উৎপাদন হয়েছিল। এর আগের বছর ৯ লাখ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি ৮৪ লাখ ৪৭ হাজার টন সবজি।

সম্মেলনে আরও জানানো হয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে আজ সোমবার থেকে রাজধানীর খামারবাড়ির কেআইবি মিলনায়তনে শুরু হচ্ছে সবজি মেলা। চলবে আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত।

প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন। এতে ৫২টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টল থাকবে। এ বছর মেলার প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে- ‘নিরাপদ সবজি চাষ, স্বাস্থ্য পুষ্টি বারো মাস’।