সংঘর্ষের কেন্দ্রে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক

সম্প্রতি পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ওই দুই অঞ্চলের রুশভাষীদের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক গভীর। একসময় রুশরা ওই অঞ্চলে ছিল সংখ্যালঘু, এখন ইউক্রেনীয়রা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত সপ্তাহে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এই দুই অঞ্চলকে একসঙ্গে দনবাস বলা হয়। এই অঞ্চলের দীর্ঘ অশান্ত ও সংঘাতপূর্ণ ইতিহাসে পুতিনের স্বীকৃতি সূচনা করেছে যুদ্ধের। দনবাসকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে স্থানীয় সময় সোমবার পুতিনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন অঞ্চলটির রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা। এর কয়েক ঘণ্টা পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন দনবাসের স্বাধীনতার স্বীকৃতির ঘোষণা দেন। শুধু তাই নয়, দনবাসে রুশ সেনা মোতায়েনেরও নির্দেশ দেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার উত্তেজনা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। ঘোষণার সময় এক ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন পুতিন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, পুতিন স্বাক্ষরিত ডিক্রিতে দনবাস যে আর ইউক্রেনের অংশ নয়, তার উল্লেখ ছিল। এরপর বৃহস্পতিবার ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন পুতিন। পরের দিন শুক্রবার ইউক্রেনের স্থল, আকাশ ও নৌপথে হামলা শুরু করে মস্কো। ছোড়া হয় ক্ষেপণাস্ত্র। রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে নাগরিকদের হাতে মেশিনগান তুলে দেয় ইউক্রেন সরকার। রাশিয়ার মতো রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও একের পর এক দুঃখজনক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে ইউক্রেন, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস। রাজনৈতিক কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয় অঞ্চলটির সমাজকাঠামোও।             

দনবাসের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখন রুশভাষী। মাত্র কয়েক দশক আগে তারা সেখানে স্থানান্তরিত হয়। সম্প্রতি দনবাসের ৭ লাখ ২০ হাজারের (ওই অঞ্চলের জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ) বেশি মানুষকে রুশ পাসপোর্ট দেয় মস্কো। এই সাত লাখের বেশি মানুষ এখন কার্যকরভাবে রাশিয়ার নাগরিক। সোমবার দনবাসের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়ার সময় জাতির উদ্দেশে পুতিন বলেছিলেন, ইউক্রেন রাষ্ট্রের ধারণা কাল্পনিক ছাড়া আর কিছু নয়। আধুনিক ইউক্রেন পুরোপুরি রাশিয়ার সৃষ্টি। এর আলাদা কোনো সত্তা নেই, থাকতে পারে না। দনবাসের রুশপন্থি জনগণকে রাশিয়ার পাসপোর্ট দিয়ে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর ক্ষেত্র তৈরি করেন পুতিন। গত সপ্তাহে দনবাসে রুশ সেনা মোতায়েনের পেছনে পুতিনের যুক্তি ছিল, দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর হাত থেকে রুশ নাগরিকদের রক্ষায় সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

দনবাসের ইতিহাস

বহু শতাব্দী ধরে ইউক্রেনীয় ভাষায় দনবাসকে ‘বন্য চারণভূমি’ বলা হতো। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ সময় পর্যন্ত ওই অঞ্চলে তেমন একটা মনুষ্য বসতি ছিল না। ১৭২১ সালে দনবাসে প্রথম কয়লাখনি আবিষ্কার হলে ইউরোপে দ্রুত ব্যাপক পরিচিতি পায় অঞ্চলটি। সেই সময় থেকে ওই অঞ্চলের স্টিল উৎপাদনসহ শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই কয়লাখনি। একসময় সিথিয়ান, অ্যালান, হুন, বুলগার, পিচেনেগ, কিপচক, তুর্কি-মঙ্গোল, তাতার, নোগাইসহ আরও বেশ কয়েকটি যাযাবর গোষ্ঠীর বাস ছিল দনবাসে। ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে কসাকরা প্রথম ওই অঞ্চলে স্থায়ী বসতি গড়ে। ১৬৭৬ সালে দনবাসে সোলানয়ি (বর্তমানে সোলেদার) নামে প্রথম শহর প্রতিষ্ঠা করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যে সোলানয়ির আশপাশের অঞ্চলে খনিজ লবণের খনি আবিষ্কৃত হলে অচিরেই তা ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়। 

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ সময় পর্যন্ত দনবাসের বেশির ভাগ অংশ ইউক্রেনিয়ান কসাক ও তুর্কি ক্রিমিয়ানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এরপর রুশ সাম্রাজ্য ওই অঞ্চল দখল করে। তখন অনেক রাশিয়ান, সার্ব ও গ্রিক দনবাসে স্থানান্তরিত হয়। রাশিয়া দখলিকৃত অঞ্চলের নাম দেয় ‘নতুন রাশিয়া’। ইউরোপজুড়ে অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লব ছড়িয়ে পড়লে দখলদারদের দনবাসে কয়লাখনির লুণ্ঠন শুরু হয়।               

দোনেৎস্ক অঞ্চলের নদী উপত্যকায় মূলত কয়লাখনিগুলো রয়েছে। দোনেৎস নদীর ধারে বেশিরভাগ কয়লার মজুদ পাওয়া যাওয়ায় ওই নদীর নামানুসারে অঞ্চলটির নাম দোনেৎস্ক রাখা হয়। শিল্পের বিকাশ ঘটলে দনবাসে মনুষ্য বসতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। বসতি স্থাপনকারীদের বড় অংশই ছিল রাশিয়ান। পরে ধীরে ধীরে বাখমুত, সেøাভিয়ানসারবস্ক ও মারিউপল কাউন্টি দোনেৎস্কের সঙ্গে যুক্ত হয়। মারিউপল কাউন্টিতে মূলত গ্রিকরা বসবাস করতেন। তাদের উত্তরসূরিরা এখনো সেখানেই রয়েছেন। প্রাকৃতিক সম্পদ কয়লার লুণ্ঠন যত বাড়তে থাকে, দোনেৎস্ক অঞ্চলে রাশিয়ানদের প্রভাবও তত বিস্তৃত হয়। সে সময় সেখানে বেশ কয়েকটি স্টিল কারখানা স্থাপন করা হয়। রুশ সাম্রাজ্যের ভূমিহীন কৃষকরা কাজের সন্ধানে দোনেৎস্ক ও এর পার্শ্ববর্তী শহরে ভিড় করে। ১৮৯৭ সালের এক পরিসংখ্যান বলে, দনবাসের জনসংখ্যার ৫২.৪ শতাংশ ইউক্রেনিয়ান ও জাতিগত রাশিয়ান ২৮.৭ শতাংশ। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রিক, জার্মান, ইহুদি ও তাতার মুসলমানরা সে সময় দনবাসে বাস করত। মূলত মারিউপল কাউন্টিতে তাদের বসতি ছিল।        

বিপ্লব, গণহত্যা

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউক্রেনিয়ানদের দাপট দেখা যেত মূলত দনবাসের গ্রামাঞ্চলে। কল-কারখানায় রাশিয়ানদের উপস্থিতি বেশি থাকায় শহরে তারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। একপর্যায়ে গ্রাম থেকে ইউক্রেনিয়ানদের একটি অংশ জীবিকার জন্য শহরে আসতে শুরু করলে দ্রুতই তারা রুশভাষী শ্রমিকদের সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে অঙ্গীভূত হয়ে পড়েন। বলশেভিকদের উত্থান ও সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনের পর এই প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। ১৯১৮ সালের এপ্রিলে দনবাসের বেশির ভাগ এলাকা ইউক্রেনিয়ান পিপলস রিপাবলিকের (পূর্ব ইউরোপের একটি দেশ, যার অস্তিত্ব ছিল ১৯১৭ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত) প্রতি অনুগত সেনারা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ইউক্রেনিয়ান পিপলস রিপাবলিকের উত্তরসূরি ইউক্রেনিয়ান স্টেট ১৯১৮ সালের মে মাসে মিত্র দেশ জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরির সহায়তায় পুরো দনবাসকে নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। রাশিয়ার গৃহযুদ্ধের পর ইউক্রেনিয়ান সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকে অন্তর্ভুক্ত হয় দনবাস। রুশ বিপ্লবের পর ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত ওই অঞ্চলের কসাকদের নির্মূলে কাঠামোগত হত্যাযজ্ঞ চালায় বলশেভিকরা। জাতিগত ইউক্রেনিয়ান নির্মূলে পরে আরও নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।

রুশীকরণ নীতির আওতায় ১৯৩২-৩৩ সালে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে দনবাসে বসবাসরত ইউক্রেনিয়ানদের না খাইয়ে মারার পরিকল্পনা করেন সোভিয়েত শাসক জোসেফ স্ট্যালিন। জাতিগত ইউক্রেনিয়ানদের বড় অংশই ছিল গ্রামাঞ্চলে বাস করা কৃষক। জমি কেড়ে নিয়ে তাদের ওপর দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দেওয়া হয়। বাইরের দেশের কোনো ত্রাণ যাতে দনবাসে প্রবেশ করতে না পারে এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ যাতে অঞ্চল ছাড়তে না পারে, সে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। ইউক্রেনিয়ানদের ওপর সোভিয়েত সরকারের আরোপিত দুর্ভিক্ষকে ২০০৬ সাল থেকে ইউক্রেনসহ ১৬টি দেশ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দুর্ভিক্ষে কত প্রাণহানি হয়েছে, এ নিয়ে শুরুতে সরকারি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ ছিল। পরে ২০০৩ সালে জাতিসংঘ ও ২৫টি দেশ স্বাক্ষরিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, দুর্ভিক্ষে ৭০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষ মারা যায়। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৩২-৩৩ সালের দুর্ভিক্ষে ৪০ থেকে ৭০ লাখ ইউক্রেনিয়ান মৃত্যুবরণ করে।  

রুশীকরণ নীতি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দনবাস। যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে সেখানকার কারখানার শ্রমিকদের কর্মদিবস বাড়িয়ে দেওয়া হয়। উৎপাদনের নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। সেই মানদণ্ড পূরণ করতে না পারলে শ্রমিকদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ ছিল। জার্মানির নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলার দনবাসের খনিজ সম্পদকে অপারেশন বারবারোসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেন। হিটলারের সোভিয়েত ইউনিয়ন দখলের পরিকল্পনার নাম ছিল এই অপারেশন বারবারোসা। ১৯৪১ সালে নাৎসিরা সোভিয়েত ইউনিয়ন দখল করলে দনবাসের মানুষদের চরম দুর্দশার মুখে পড়তে হয়। সে সময় দনবাসের হাজার হাজার শিল্প শ্রমিকদের জার্মানিতে বিতাড়িত করে জোর করে কারখানায় কাজ করাতে বাধ্য করা হয়। জার্মানির দখলে থাকার সময় শুধু দোনেৎস্ক অঞ্চলে ২ লাখ ৭৯ হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। আর লুহানস্ক অঞ্চলে মারা যায় ৪৫ হাজার ৬৪৯ জন মানুষ। ১৯৪৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী রেড আর্মি নাৎসিদের হটিয়ে ইউক্রেন ফের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের কারণে দনবাসে বসবাসরত ইউক্রেনীয়দের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাজার হাজার রুশ শ্রমিক দনবাসে স্থানান্তর হয়। ১৯৫৯ সালের মধ্যে দনবাসে জাতিগত রাশিয়ানদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫ লাখ। ৩৩ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৯ হাজার। ১৯৫৮-৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার করলে দনবাসে রুশীকরণ প্রক্রিয়া আরও বৃদ্ধি পায়। ওই অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ভাষায় যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ানো হতো, রুশীকরণ প্রক্রিয়ার আঘাতে সেসব প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আদমশুমারিতে বলা হয়, দনবাসের ৪৫ শতাংশ মানুষ রাশিয়ান হিসেবে নিজেদের জাতিগত পরিচয় দেন। ইউক্রেনের স্বাধীনতা নিয়ে ১৯৯১ সালের গণভোটে দোনেৎস্ক অঞ্চলের ৮৩.৯ শতাংশ ও লুহানস্ক অঞ্চলের ৮৩.৬ শতাংশ ভোটার সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হওয়ার পক্ষে ভোট দেন। ওই বছরের অক্টোবরে দোনেৎস্ক অঞ্চলে সরকারের সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। সেখানে প্রতিনিধিরা ফেডারেল রাষ্ট্রের দাবি করেন।     

রাজনীতি

১৯৯৩ সালের দিকে দনবাসের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যায়। কল-কারখানায় উৎপাদন কমে যায়। মানুষের গড় মজুরি ৮০ শতাংশ কমে যায়। দনবাসের এই দুর্দশার জন্য কিয়েভে নতুন কেন্দ্রীয় সরকারের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলাকে দায়ী করেন অনেকে। ১৯৯৩ সালে মজুরি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে দনবাসের কয়লা শ্রমিকরা ধর্মঘট শুরু করেন। এই ঘটনা এক পর্যায়ে সংঘাতে রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ লুই সিগেলবোম এটিকে দনবাসের সঙ্গে ইউক্রেনের বাকি অংশের সংঘাত হিসেবে অভিহিত করেন। ধর্মঘট চলাকালে এক শ্রমিক নেতা তার ভাষণে বলেছিলেন, ‘১৯৯১ সালে দনবাসের মানুষ স্বাধীনতার জন্য ভোট দিয়েছিল। কারণ তারা চেয়েছিল, পুরো দনবাস অঞ্চলে মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করবে, ব্যবসা-বাণিজ্য চালাবে, সেসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যাতে তাদের হাতেই থাকে। মস্কোর কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মানব না বলে আমরা ভোট দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে এসেছি। তার অর্থ এই নয় যে, কিয়েভের কেন্দ্রের হুকুম আমরা মেনে চলব।’ ওই ধর্মঘটের পর ১৯৯৪ সালে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলে সাংবিধানিক বিভিন্ন প্রশ্নে পরামর্শমূলক গণভোট হয়। একই সঙ্গে স্বাধীন ইউক্রেনে প্রথম সংসদীয় নির্বাচনও সেই বছর অনুষ্ঠিত হয়।  

সাংবিধানিক যেসব প্রশ্নের ওপর গণভোট হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দনবাসকে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হবে কি না, রুশ ইউক্রেনের অফিশিয়াল ভাষা হবে কি না, দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলের প্রশাসনিক ভাষা রুশ হওয়া উচিত কি না, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়া দেশগুলোর সঙ্গে ইউক্রেনের গভীর সম্পর্ক থাকা উচিত কি না। ভোটে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ দনবাসের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ও রুশকে অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে চাইলেও ভোটের পর কোনো পরিবর্তন হয়নি। ইউক্রেনীয় ভাষাই দেশটির একমাত্র অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে থেকে যায়। স্বায়ত্তশাসনের অধিকার পাননি দনবাসের জনগণ।

২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের পর ইউক্রেনের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটাতে ব্যাপক আকারে বিক্ষোভ হয়। সে সময় দনবাসের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। অভ্যন্তরীণ সংঘাত চরম রূপ নেয়। রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সরকারি ভবন নিজেদের দখলে নিয়ে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলকে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী দেশ হিসেবে ঘোষণা দেন। জাতিসংঘের কোনো সদস্য রাষ্ট্র দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে তখনো রাজি ছিল না, এখনো নয়। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ওই দুই অঞ্চলের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেন। ২০১৪ সাল থেকে দনবাসে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সংঘর্ষে ১৪ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। ইউক্রেনসহ পশ্চিমা বিশ্বের অভিযোগ, সামরিক ও আর্থিকভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করছে রাশিয়া। ওই বছরে দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে যাত্রীবাহী মালয়েশিয়ার এক বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে ২৯৮ যাত্রী প্রাণ হারায়। ওই ঘটনা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক তদন্তকারীরা তদন্ত শেষে জানান, ক্ষেপণাস্ত্রটি রাশিয়া সরবরাহ করে এবং রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে সেটি ছোড়া হয়। বিমানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে রাশিয়া। দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক উভয় অঞ্চলে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। ২০১৮ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত ‘দোনেৎস্ক প্রজাতন্ত্রে’ নির্বাচিত হন ডেনিস পুশিলিন। অন্যদিকে লুহানস্ক বিচ্ছিন্নতাবাদী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট হন লিওনিদ পাসেচনিক। পুতিন গত সপ্তাহে দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়ার পর ওই অঞ্চলে বসবাসরত রুশপন্থিরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। তবে প্রান্তিক হয়ে পড়া দনবাসের জাতিগত ইউক্রেনীয়রা রাশিয়ার প্রভাবে নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারবেন, না কি রুশীকরণ প্রক্রিয়ায় তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি আরও বিলীন হয়ে পড়বে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।