দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে জিরো টলারেন্স নীতি তা বাস্তবায়ন করতে গিয়েই প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চাকরিচ্যুত উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
একটি বিভাগীয় মামলার হাজিরা দিতে এসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন শরীফ। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। যে বিষয়ে একটি মিশন-ভিশন রয়েছে, সে মিশন-ভিশন বাস্তবায়ন করতে গিয়েই প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েছি। তবে দুদকের সহকর্মী, মিডিয়া সহকর্মী ও মানুষের দোয়ার কারণে আমি গুম থেকে রেহাই পেয়েছি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজর। তিনি ন্যায়বিচারের প্রতীক। প্রধানমন্ত্রীর কারণে গুম হওয়া থেকে বেঁচে গেছি।’ প্রধানমন্ত্রীকে ‘মা’ সম্বোধন করে শরীফ বলেন, ‘মা আমি অসহায়। পরিবার ও বাচ্চা নিয়ে খুব সমস্যায় আছি। আমি গত দুই সপ্তাহ ধরে ঘুমাতে পারছি না।
আমাকে সুযোগ দেওয়া হোক। কমিশনের যত অভিযোগ রয়েছে তার ব্যাখ্যা দিতে পারব। সকল ডকুমেন্টস আমার কাছে রয়েছে। আমাকে সরাসরি অপসারণ করে দুদকে আসার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি আসলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট হিসেবে আসতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে খুব বিব্রতকর পরিস্থিতি যে দুদকের অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে হাজিরা দিতে এসেছি। আপনারা জানেন গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আমাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। এটা আইনের দৃষ্টিতে কতটুকু সাম্য আমি বলতে পারব না। তবে এটা নিয়ে আমি বিব্রত। আমার বিরুদ্ধে তিনটি বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে। প্রথমটা হলো ব্যাংক হিসাব নো-ডেবিট সংক্রান্ত, দ্বিতীয়টা নথি হস্তান্তরে বিলম্ব কেন ও তৃতীয়টা হলো দেরিতে কর্মস্থলে যোগদান কেন?’
শরীফ বলেন, ‘আমার ঊর্ধ্বতনদের মিসগাইড করা হয়েছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি চাকরিবিধি অনুযায়ী কমিশন বরাবর আদেশ রিভিউ করার জন্য আবেদন করেছি। আশা করি, কমিশন আমার আবেদন গ্রহণ করবে এবং ন্যায়বিচার পাব।’ এছাড়া তার বিরুদ্ধে দুদকের অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যে অটল রয়েছেন বলে তিনি জানান।
দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘অপসারণের পর শরীফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দায়ের করা তিন বিভাগীয় মামলা স্থগিত রয়েছে। তারপরও তিনি আজ (গতকাল) দুদকে কেন আসলেন জানি না। তিনি আমার কাছে আসেননি, আমি জানি না কোথায় এসেছেন বা কী কারণে এসেছেন। বিষয়টি জানতে হবে, তিনি কেন আসলেন।’
প্রভাবশালীদের চাপেই শরীফকে অপসারণ করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘আমরা কমিশনের অবস্থান বিস্তারিতভাবে আপনাদের কাছে উপস্থাপন করেছি। পরবর্তীতে নতুন কোনো ঘটনা বা পয়েন্ট আমার কাছে নেই আপনাদের বলার মতো। যেটি উপস্থাপন করা হয়েছে সেটি। উনি প্রতিকার চাইতেই পারেন। সেই বিষয়ে কমিশন দেখবে।’
৫৪ (২) ধারা নিয়ে কোনো আশ্বাস আপনার কাছে আছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুদকের মাসিক সমন্বয় সভা গতকাল হয়েছে। সেখানে সব স্তরের কর্মকর্তারা ছিলেন। বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও সংযুক্ত ছিলেন। কালও বলেছি, আগেও বলেছি, আপনারা নির্ভয়ে যার যার দায়িত্ব পালন করবেন, কাজ করবেন। এখানে ভয়ের কিছু নেই। আর ৫৪ (২) ধারা বিধিতে ছিল। বর্তমান কমিশন এটা নতুন করে যোগ করেনি।’
এ বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গেছে বলে দুদক সচিব এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
উল্লেখ্য, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে উপ-পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে অপসারণ করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপনে দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৫৪ (২)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তাকে অপসারণ করার কথা বলা হয়। পরদিন কমিশনের প্রধান কার্যালয়সহ ২১ জেলায় দুদকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ওই বিধি বাতিল এবং অপসারণের আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন করেন।
বিতর্কিত ধারা প্রত্যাহার দাবি দুদক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের : দুদক চাকরি বিধিমালার বিতর্কিত ৫৪(২) ধারা প্রত্যাহারে পদক্ষেপ চেয়ে আবারও দাবি জানিয়েছে দুদক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (ডিইউএসএ)। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২০ ফেব্রুয়ারি দুদক সুষ্ঠু অনুসন্ধান-তদন্তের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দুদক চাকরি বিধিমালার বিতর্কিত ৫৪(২) বিধির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পেন্ডিং আবেদন কমিশন কর্তৃক প্রত্যাহারের বিষয়ে দুদকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ থেকে কমিশন বরাবর কমিশনের সচিবের মাধ্যমে আবেদন করা হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনোরূপ আশ্বস্তও করা হয়নি। বরং সম্প্রতি এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে (যেমন বিভাগীয় মামলা, শোকজ ইত্যাদি) যা প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কর্ম পরিবেশকে নষ্ট করছে।