কমেডিয়ান থেকে যোদ্ধা প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি

প্রতিবেশীর আধিপত্যবলয় থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন ভলোদিমির জেলেনস্কি। শক্তিশালী রাশিয়ার বিরুদ্ধে তার নেতৃত্ব প্রশংসিত হচ্ছে বিশ^জুড়ে। লড়াইয়ের ময়দানে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ইউক্রেনের মানুষকে। শক্ত প্রতিরোধ গড়তে সক্ষম হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে নিয়ে লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ

প্রতিরোধের মুখ

সব লড়াইয়ের শেষ কথা জয়। সেটা ছলে-বলে কিংবা কৌশলে যেকোনোভাবেই হোক। বিপুল শক্তি, সেনাসংখ্যার আধিক্য, আধুনিক অস্ত্রভা-ার ও কূটনীতির নানা হিসাব বদলে অনেক সময় দুর্বল প্রতিপক্ষও বিজয়ী হয়। পৃথিবীতে এর অনেক নজির রয়েছে। চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে সবদিক থেকেই দুর্বল ইউক্রেন। তার পরও রাশিয়াকে যুদ্ধের মাঠে নানাভাবে ঘোল খাওয়াচ্ছে তারা। ‘তুড়ি মেরে, উড়িয়ে দেব’ রাশিয়ার এমন মনোভাবকে টেক্কা দিয়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, বিশ্ব দরবারে রাশিয়াকে দখলদার হিসেবে তুলে ধরে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এসবের কৃতিত্ব ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি।

১৯৯৭ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট অভিজ্ঞ ভøাদিমির পুতিনের বিপরীতে জেলেনস্কি নেহাতই বিশ্ব রাজনীতির মাঠের শিশু। তারপরও বুক চিতিয়ে লড়ে, যুদ্ধের ভয়াবহতা ও ধ্বংস ছাপিয়ে ইউক্রেনবাসীকে রক্ষার কাতর আবদার, সাহায্যের আবেদন এবং শান্তি আলোচনার দেনদরবার, দর-কষাকষি থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছু একা সামলে প্রতিরোধের মুখ হয়ে উঠেছেন তিনি। হয়ে গেছেন পুরোপুরি যুদ্ধের নেতা, জাতিকে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাতিয়ে তুলছেন। সামনে থেকে যুদ্ধের মাঠে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সাধারণত ইউক্রেন বলতে পর্যটকদের চোখে ভেসে ওঠে চোখ জুড়ানো পাহাড়, নদী, অরণ্য আর সমুদ্রের অনুপম দৃশ্য। অপরূপ হলুদাভ-সবুজ সূর্যমুখী ফুলের প্রান্তর, চমৎকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক ইমারতরাজি আর সুভাষিণী ও সৌন্দর্যবতীদের এক দেশ। অবশ্য ইউক্রেনের আরেকটি ইমেজ হলো চেরনোবিল পরমাণু কেন্দ্রের ভয়ংকর বিপর্যয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে চলমান যুদ্ধসহ হাজার বছরের অসংখ্য যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি। দ্বিতীয় ইমেজটাই যেন বর্তমানে বড় হয়ে উঠেছে। বহুদিন পর ইউরোপের এই দেশে আরেকটি যুদ্ধ হচ্ছে। বরফঢাকা অঞ্চলে শত শত সাঁজোয়া যানে সৈন্যদের দ্রুত চলাচল, যুদ্ধবিমানের গর্জন, বিমান হামলার সতর্ক সাইরেন বিশাল ইউরেশিয়ার নিস্তব্ধতা ভেঙেছে প্রায় সাত দিন হলো। এরই মধ্যে একপ্রস্তর শান্তি আলোচনা হয়েছে, তবে সাফল্য মেলেনি। উল্টো যুদ্ধের তীব্রতা বেড়েছে। এসব কিছুর মাঝে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির নাম। একদিকে দেশবাসীর নিরাপত্তা ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার কঠিন দায়িত্ব। অন্যদিকে ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ কিংবা যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া। কী করবেন জেলেনস্কি?

কেউ কথা রাখেনি

রণাঙ্গন আর কূটনীতির ক্ষেত্রে ‘অনিঃশেষ বন্ধুত্ব’ বলে কিছু নেই। এখানে ‘স্বার্থসিদ্ধিই’ মূল ও শেষ কথা। বাকি সব ‘বাত কি বাত।’ পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষমতাধররা অনেক প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতিতে ভরসা রেখে ন্যাটোতে যোগ দেওয়াসহ কত স্বপ্নই না দেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। কিন্তু জেলেনস্কির সেসব স্বপ্ন ভেঙে গেছে ক্ষেপণাস্ত্র, বোমা আর গোলায়। তিনি একা হয়ে গেছেন, এই আক্ষেপ তিনি অবশ্য গোপন রাখেননি। বিশ্বনেতৃত্ব তাকে ‘ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে’ ছেড়ে দিয়েছে বলে অনুযোগ করতেও ভোলেননি। অনেক আকুতির পরও পশ্চিমা বন্ধুদের কাউকে পাশে পাচ্ছেন না জেলেনস্কি। হামলা শুরুর পর থেকে প্রায় সাত দিন ধরে একের পর এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কির অসহায়ত্ব শান্তিকামী মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। হামলার তৃতীয় দিন রাতে ইউক্রেনকে মানবিক ও সামরিক সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্যসহ ২৬টি দেশ একমত হয়েছে, তবে ইউক্রেনে কোনো সামরিক সহায়তা পৌঁছানোর খবর এখনো পাওয়া যায়নি।

রাশিয়ার হামলা শুরুর পর থেকে জেলেনস্কি বুঝতে পারেন ‘বিপদের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু’। আর এখন সেই বন্ধুই হাতড়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। হামলার পরদিন শুক্রবার কিয়েভে রাশিয়ার সেনাবাহিনী ঢুকে পড়ার পর জেলেনস্কি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আজ সকালে আমরা একা আমাদের দেশকে রক্ষার জন্য লড়াই করছি। গতকালের মতোই বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো দূর থেকে শুধু সবকিছু দেখে যাচ্ছে।’ জেলেনস্কি বারবারই সামরিক সহযোগিতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো সদস্য দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে কেউ সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেনি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে হামলা শুরুর চার দিন পর ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসের অস্ত্র পাঠানোর খবর মিলেছে। তবে ইউক্রেনে এখন পর্যন্ত কোনো অস্ত্র পৌঁছায়নি।

‘পালাব না’

ইউক্রেনে হামলা শুরুর দিন থেকে কয়েকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তায় এসেছেন জেলেনস্কি। প্রতিবারই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুদ্ধে সহযোগিতার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। কাউকে পাশে না পাওয়ায় হতাশার কথাও বলেছেন অকপটে। এরই মধ্যে গুঞ্জন ওঠে, জেলেনস্কি ইউক্রেন ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন। রুশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ডুমার স্পিকার ভিয়াচেসলাভ ভলোদিনের দাবি, জেলেনস্কি রাজধানী কিয়েভ ছেড়েছেন এবং দেশটির লিভ শহরে অবস্থান করছেন। তবে এ খবর যে সত্য নয়, তা প্রমাণের জন্য পরপর দুবার ভিডিও বার্তা দেন জেলেনস্কি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে ভিডিওতে জেলেনস্কি বলেছেন, তিনি দেশেই আছেন। অস্ত্র ছাড়বেন না। দেশকে রক্ষা করবেন।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, রাশিয়ার হিটলিস্টের প্রথম টার্গেট জেলেনস্কি। এক ভিডিও বার্তায় তিনিও বলেছেন, শত্রুদের হিটলিস্টে রয়েছি আমি। আমার পরিবারের ওপরও হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে ওদের। রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর হামলা চালিয়ে রাজনৈতিকভাবে পুরো দেশকে ধ্বংস করে ফেলতে চাইছে রাশিয়া। মৃত্যুর ঝুঁকি থাকলেও রাজধানী কিয়েভেই অবস্থান করছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। জেলেনস্কির কথায়, ‘আমি কিয়েভেই থাকব। আমার পরিবারও এখানেই রয়েছে। আমি পালাব না। ’

তার এমন আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাব যুদ্ধ শুরুর আগেও দেখা গেছে। তখনো জেলেনস্কি বলেছিলেন, ‘আমরা রাশিয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের যুদ্ধই চাই না। কোল্ড ওয়ার, এমনকি হট ওয়ারও চাই না, কোনো হাইব্রিড যুদ্ধও না। তবে আমাদের ওপর যদি হামলা হয়, তাহলে আমাদের পিঠ নয় মুখ দেখা যাবে।’ যুদ্ধের মাঠ না ছেড়ে জেলেনস্কি কথা রেখেছেন, তিনি পিঠ দেখাননি। সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়, ইউক্রেন যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা না দিলেও যুক্তরাষ্ট্র জেলেনস্কিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তিনি ওই প্রস্তাবে রাজি না হয়ে বলেছেন, ‘এখানে লড়াই হচ্ছে, আমার গোলাবারুদ দরকার, আমাকে সরিয়ে নেওয়ার দরকার নেই।’

২০১৯ সালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট হন জেলেনস্কি। রুপালি পর্দার এই কৌতুক অভিনেতা বাস্তবজীবনে চরম বিপর্যয়ের সময়ে নিজেই যেন কৌতুকের শিকার হলেন। অসহায় জেলেনস্কি বুঝলেন, যুদ্ধের সাত দিন কেটে গেলেও কেউ কথা রাখেনি। সামনের দিনগুলোতে কেউ পাশে দাঁড়াবে এমনও কোনো লক্ষণ নেই। ধীরে ধীরে তার সামনের পথ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। তিনি পরিণত হয়েছেন বিশ্বনেতাদের যুদ্ধের টোপে।

প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে

৪৪ বছর বয়সী জেলেনস্কি তিন বছর আগে যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন তার কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না। রুশভাষী ইহুদি পরিবারে জন্ম নেওয়া জেলেনস্কি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আইনের ছাত্র ছিলেন। স্নাতক শেষ করেন কিয়েভ ন্যাশনাল ইকোনমিক ইউনিভার্সিটি থেকে। আইন পেশায় না জড়িয়ে অভিনয় জগতে নিজেকে এক সফল কৌতুক অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তোলেন জেলেনস্কি। ১৭ বছর বয়সে, জেলেনস্কি কেভিএন নামে স্থানীয় কমেডি প্রতিযোগিতার দলে যোগ দেন। সেখান থেকে ইউক্রেনের দল জাপোরিজাহ ক্রিয়েভরিহ ট্রানজিটে অভিনয়ের সুযোগ পান। এই দলটি কেভিএনের মেজর লিগে নিয়মিত পারফর্ম করে এবং ১৯৯৭ সালে জয়লাভ করেছে। একই বছরে জেলেনস্কি কাভারটার-৯৫ নামে আলাদা একটি দল গঠন করেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত এই দলটি মেজর লিগে অংশগ্রহণ করে এবং ইউক্রেনের কেভিএন লিগের সর্বোচ্চ উপার্জনকারী দলের তকমা পায়। শুধু কৌতুক অভিনেতা হিসেবেই থেমে থাকেনি জেলেনস্কির জীবন। বেশ কিছু সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন। ২০১৫ সালে জেলেনস্কি সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল (জনতার সেবক) নামে একটি শোতে কাজ করেন। এই টেলিভিশন শোয়ের মাধ্যমে সারা দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। মজার বিষয় হলো, ‘সার্ভেন্ট অব দ্য পিপল’ টেলিভিশন শোতে তিনি ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। তারপর সেখান থেকে হঠাৎ করেই তিনি হয়ে ওঠেন দেশের রাষ্ট্রপতি।

 ২০১৪ সালে ইউক্রেনের রুশপন্থি প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপরই ক্রমেই প্রেসিডেন্ট পদের দিকে আস্তে আস্তে অগ্রসর হতে শুরু করেন জেলেনস্কি। রাজনৈতিক কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়িয়ে পেট্রো পোরোশেঙ্কোকে পরাজিত করেন জেলেনস্কি। বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ২০১৯ সালে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতির পদে বসেন। নির্বাচনে পোরোশেঙ্কো পান ২৪.৪ শতাংশ ভোট, অন্যদিকে জেলেনস্কি ৭৩.২ শতাংশ ভোট পান। প্রাপ্ত ভোটের পরিসংখ্যানে এটা স্পষ্ট যে, ইউক্রেনের সাধারণ নাগরিকরা অত্যন্ত খুশি মনে তাকে প্রেসিডেন্ট পদে বসিয়েছেন।

জেলেনস্কি পূর্ব ইউক্রেনের রাশিয়াপন্থি অঞ্চলে বড় হয়েছেন। তবে তিনি মনেপ্রাণে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। যেহেতু জেলেনস্কি ইয়ানুকোভিচের মতো রুশপন্থি নন, তাই প্রতিবেশী শক্তিধর রাশিয়ার সঙ্গে তার বিরোধ চরমে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্র স্বাধীন দেশ হওয়ার পর ইউক্রেন চেয়েছে ইউরোপসহ পশ্চিমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকতে। পশ্চিমারাও চান ইউক্রেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত (ইউ) হোক, একই সঙ্গে তারা ন্যাটোভুক্তও হোক। এই ন্যাটোর সঙ্গে ইউক্রেনের যুক্ত হতে চাওয়াই রাশিয়ার আপত্তি, এখান থেকেই বিড়ম্বনা ও বিতন্ডার শুরু, যা যুদ্ধ পর্যন্ত গড়িয়েছে।

জেলেনস্কির দাদা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেড আর্মিতে কাজ করেছেন। সোভিয়েত সেনাবাহিনীর পদাতিক বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং স্বাধীন ইউক্রেনে কর্নেল হিসেবে মারা যান। জেলেনস্কি তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কেন যুদ্ধে জড়িয়ে গেলেন, সেটা বিস্ময়ের বিষয়। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা নেতাদের লাগাতার রুশবিরোধী মনোভাব তাকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হয়। আবেগপ্রবণ মনোভাব ও অনভিজ্ঞতার দরুন অনেকেই তাকে ইউক্রেনীয় ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে ডাকেন। কারণ দুজনেরই বিনোদন জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত এবং প্যান্ডোরা পেপারসেও নাম রয়েছে এই রাষ্ট্রপতির। ২০০৩ সালে তিনি ওলেনা জেলেনস্কাকে বিয়ে করেন। জেলেনস্কির একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে রয়েছে।

জনপ্রিয় পদক্ষেপ

জেলেনস্কি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তাদের অফিসে প্রেসিডেন্টের ছবি টানানোর বদলে বাবা-মায়ের ছবি টানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সততা রক্ষার কথা বলেছিলেন, বাবা-মায়ের যত্ন নিতে অনুরোধ করেছিলেন। তার এ পদক্ষেপ দারুণ প্রশংসা পায়।  চার কোটি জনসংখ্যার দেশ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার আগ্রাসনের শুরু থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ সক্রিয়। কেউ কেউ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে তার ভর্ৎসনা করলেও দেশ রক্ষায় পালিয়ে যাননি জেলেনস্কি। তাই অনেকের চোখে তিনি একজন বীর। এ কারণে তার জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। টুইটার, ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রামের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় নেটিজেনদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটাই নাম ভলোদিমির জেলেনস্কি।

নতুন এক জনমত জরিপে উঠে এসেছে, গত বছরের ডিসেম্বরের চেয়ে ইউক্রেনের মানুষের কাছে জেলেনস্কির জনপ্রিয়তা তিন গুণ বেড়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে এ জরিপ করা হয়।

সমালোচনা

রুশ সেনাদের চালানো আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে ইউক্রেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট জেলনস্কি এমতাবস্থায় দেশ ও সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে বারবার বিদেশি মিত্রদের কাছে আকুতি জানিয়েছেন। রাশিয়ার ‘আগ্রাসী আচরণে’ নিজেদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় টুইটারে ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন তিনি। অথচ তিনিই ২০২১ সালে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি দখলদারদের চালানো বর্বরোচিত হামলাকে এড়িয়ে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পাল্টা জবাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ওই যুদ্ধে ইসরায়েলই ভিকটিম (ভুক্তভোগী)।’ ওই সময়ে করা জেলেনস্কির এই টুইট নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

বর্তমানে ইউক্রেনের অবস্থা অনেকটা ফিলিস্তিনের মতো। দখলদারদের আক্রমণে রক্তবন্যায় ভাসছে তাদের রাজপথ। এ অবস্থায় ফের আলোচনায় উঠে এসেছে জেলেনস্কির সেই টুইট। দখলদার ইসরায়েলকে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে অনেকেই টুইট-রিটুইট করছেন। জেলেনস্কির সেই পোস্টের নিচে এক ফিলিস্তিনি লিখেছেন, ‘আমরা সবার নিরাপত্তা কামনা করি। আপনি ইসরায়েলি দখলদারিকে সমর্থন করেছেন, যারা ফিলিস্তিনের জমি চুরি করেছে। আর এখন ইউক্রেন রাশিয়ার বোমার মুখে পড়েছে। তবুও আমরা আপনার জন্য প্রার্থনা করি... আমরা আপনার মতো এলাকা দখলকে সমর্থন করি না।’

অনিশ্চয়তা

পূর্ব ইউরোপে ও রাশিয়ার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত প্রায় ছয় লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ইউক্রেন রাশিয়ার পর ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। ‘শস্যক্ষেত্র’ হিসেবে পরিচিত ইউক্রেনে প্রচুর পরিমাণে কৃষিজমি, শিল্পে সমৃদ্ধি ও খনিজসম্পদ থাকলেও দেশটি বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম দরিদ্র দেশ। আগে অল্প কয়েক বছরের জন্য ইউক্রেন স্বাধীন ছিল। তবে ১৯৯১ সালেই প্রথমবারে মতো বর্তমান এলাকা নিয়ে স্বাধীন হয় ইউক্রেন। ইউক্রেন ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন করলেও ভূরাজনৈতিক নানা হিসাব-নিকাশের কবলে পড়ে। দেশটি পরিণত হয় শক্তিধরদের পরীক্ষাগারে। একদিকে ইউক্রেনীয়দের জাতীয়তাবাদী আশা-আকাক্সক্ষা উসকে দিতে থাকে পশ্চিমা শক্তি। অন্যদিকে রাশিয়াও তার আধিপত্যের রশি সেভাবে আলগা হতে দেয়নি। ফলে, সেভাবে স্বাধীন হয়েও স্বাধীনতার পুরোপুরি স্বাদ নিতে পারেনি তারা। এরই মধ্যে অসম যুদ্ধে জড়িয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন।