ফেব্রুয়ারিতে পণ্য রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪১ শতাংশ

ফেব্রুয়ারির শেষ সময় থেকে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার কারণে বিশ্বএক ধরনের বৈরী সময় পার করছে। এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রায় সব দেশের অর্থনীতি বিশেষ করে ইউরোপের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

সদ্য শেয় হওয়া ফেব্রুয়ারিতে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের আয় হয়েছে ৪২৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যা আগের বছরের ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৩৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ বেশি। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩১৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। গতকাল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।   

টানা তিন মাস ধরে রপ্তানি আয়ে বড় প্রবৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশ। একক মাস হিসাবে গত ফেব্রুয়ারিতে আসা রপ্তানি আয় বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। একক মাস হিসাবে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় এসেছিল গত বছরের ডিসেম্বরে, ৪৯০ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এসেছিল আগের মাস জানুয়ারিতে, ৪৮৫ কোটি ৩ লাখ ডলার। তবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আগামীর রপ্তানি নিয়ে অনিশ্চয়তাও দেখা দিয়েছে। ইউক্রেনে হামলার দায়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ, জ্বালানি তেলের উল্লম্ফনে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও অস্বাভাবিক হারে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি রপ্তানি আয়ের চলমান প্রবৃদ্ধি থামিয়ে দিতে পারে।

ইপিবির প্রকাশিত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পাট ছাড়া অন্য প্রায় সব খাতের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সব মিলিয়ে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম আট মাসের ৩ হাজার ৩৮৪ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি। এ সময়ে রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তার চেয়ে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ আয় এসেছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, করোনার মধ্যে রপ্তানি আয় বাড়াতে বরাবরের মতো প্রধান ভূমিকা রেখেছে তৈরি পোশাক পণ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান পণ্য শুধু তৈরি পোশাকেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। ইপিবির তথ্যানুযায়ী, তৈরি পোশাকের পাশাপাশি হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্য ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। যদিও গত কয়েক মাসের মতো ফেব্রুয়ারিতেও পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২ হাজার ৭৪৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এ সময় মোট রপ্তানি আয়ের ৮১ দশমিক ২৫ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক থেকে।

তৈরি পোশাক পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় ও প্রবৃদ্ধি হয়েছে নিট পোশাক খাতে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আট মাসে নিটওয়্যার পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫০৬ কোটি ৯৭ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের শুরুতে নিটের বিপরীতে ওভেন পোশাকের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কিছুটা শ্লথ হলেও গত কয়েক মাস ধরে তাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ওভেন পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১ হাজার ২৪২ কোটি ৭২ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৮ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি।

তৈরি পোশাকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় এসেছে হোম টেক্সটাইল পণ্য থেকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে ৯৯ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল রপ্তানি হয়েছে। এ আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি। এ সময়ে বিশেষায়িত টেক্সটাইল পণ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আলোচিত সময়ে এ খাতের পণ্য রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ডলারের। রপ্তানি হয়েছে ২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৬৭ শতাংশ বেশি।  

চলতি অর্থবছরে তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় এসেছে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য থেকে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে এ খাতের পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৮৫ কোটি ৩২ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে গত কয়েক বছর ধরেই পিছিয়ে পড়ছিল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আলোচ্য সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৭৮ কোটি ৪৯ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ২৯ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের আট মাসে মাছ রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৪০ কোটি ৭১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। এ সময় কেমিক্যাল পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় ২৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৯ শতাংশ বেশি। এ সময়ে ওষুধ রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৩ কোটি ডলার। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ২১ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে সব খাতের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমেছে।