আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলছে বিএনপি। বিশেষ করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর যে তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল সে বিষয়টি মাথায় রেখে এগোচ্ছে দলটি। সেই অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক কর্মকা-ের কারণে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখছে না বিএনপি।
বিএনপির নেতৃত্বে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে তাদের এসব কথা জানান। তারা বলছেন, বৃহত্তর ঐক্য গড়তে একাধিক সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপি আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে। তবে কামাল হোসেন ও জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ হয়নি।’
আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক বিএনপির সঙ্গে হয়েছে কি না জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন ও জাফরুল্লাহ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বিএনপির কোনো পর্যায়ের নেতা তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেননি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না যেসব রাজনৈতিক দল তা মনে করে তাদের সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য হবে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিদায় ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। আগামীর আন্দোলন হবে এক দফার ভিত্তিতে। সমমনা দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে।’
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও নাগরিক ঐক্যসহ বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। বিএনপির মিত্র হিসেবে পরিচিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে আসা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ঐক্যফ্রন্ট গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন।
বৃহত্তর ঐক্য গঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি এক নেতা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। পরে সংসদে যোগ না দেওয়ার ফ্রন্টের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেন। তার পরে শপথ নেন গণফোরামের প্রতীক নিয়ে বিজয়ী এম মোকাব্বির খান। যদিও তাকে নির্বাচনে সহযোগিতা করেছিল স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতাকর্মীরা আগে থেকে ধারণা করেছিলেন যে, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ওই নির্বাচনে সরকারের হয়ে কাজ করেছেন। মনসুর ও মোকাব্বির শপথ নেওয়ার পর তাদের কাছে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট হয়ে যায়। তাছাড়া তাদের শপথ নেওয়ার কারণে বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা চাপে পড়ে যান। যে কারণে পরে তারাও সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে বাধ্য হন। এসব কারণে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের সঙ্গে আর কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখছে না বিএনপি।
বিএনপির ওই নেতা বলেন, বিগত দিনে ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা সন্তোষজনক ছিল না। সর্বশেষ গুরুতর অসুস্থ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে সরকারবিরোধী বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল সরকারের প্রতি আহ্বান জানালেও কামাল হোসেন তা করেননি। এছাড়া ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সার্চ কমিটির ডাকে সাড়া দিয়ে নাম প্রস্তাব করেন। এমনকি নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালকে ভালো মানুষ বলে অভিহিত করে তার অধীনে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এ বিষয়টি বিএনপি ভালোভাবে নেয়নি।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদের সঙ্গে তার মহাখালী ডিওএইচএসের বাসায় বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই বৈঠকে অলি আহমদ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তার দলের মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ এবং বিএনপি নেতাদের মধ্যে ছিলেন গয়েশ^র চন্দ্র রায় ও নজরুল ইসলাম খান। বৈঠক শেষে অলি আহমদ দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছিলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
কাদের নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন গঠনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংলাপ করেছিলেন তার বাইরে থাকা সব সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করছে বিএনপি।’
সম্প্রতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের সমন্বয়ে দুটি কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। তারা সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এর একটি কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার সঙ্গে থাকবেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। এ কমিটি ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের শরিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করবে।
অন্য কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তার সঙ্গে আছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। এ কমিটি বামপন্থি ও ধর্মভিত্তিক দলসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অতীতের মতো বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন কিংবা ভবিষ্যতে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করবে এমন নেতার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বিএনপি ঐক্য গড়বে না। তাছাড়া এবার আমরা যে আন্দোলন করব সেখানে জোটবদ্ধ দলগুলোর নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি পালন করব না। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো করে যুগপৎভাবে কর্মসূচি পালন করবে।’