কেন ইউরোপীয়রা ভারতবর্ষে এসেছিল

উর্বরভূমি ও সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল ইউরোপের কাছে সমাদৃত। ভাগ্যপরিবর্তনের আশায় ইউরোপ বহুদিন ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে আসার পথ খুঁজছিল। ইউরোপীয় হিসেবে পর্তুগিজরা সর্বপ্রথম ভারতে আসে। তাদের পথ ধরে আসে ইউরোপের অন্যান্য জাতি। লিখেছেন বিপুল জামান

ভারতের সঙ্গে ইউরোপের যোগাযোগের ইতিহাস অতি প্রাচীন। প্রথম শতকে রোম সাম্রাজ্য ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের সম্পর্ক ছিল। গ্রিক ও রোমান ভৌগোলিকরা ভারতবর্ষের উপকূলের ঠিকুজি সম্পর্কে জানতেন। মিসরের বন্দর থেকে রোমের জাহাজগুলো নিয়মিত ভারতবর্ষের বন্দরে বাণিজ্য করত।

ইউরোপের অন্ধকার যুগে এই সম্পর্কের ব্যত্যয় ঘটে। ইসলামের আবির্ভাব ও বিস্তারের মাধ্যমে আরব বণিকরা বাণিজ্যের এই স্থান দখল করে নেয়। তারা দুঃসাহসিক অভিযান, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আরব সাগর, লোহিত সাগর, পারস্য সাগর, ভারত সাগর, প্রশান্ত সাগরের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে এবং আশপাশের স্থলভূমিতে নিজেদের বাণিজ্যের ঘাঁটি স্থাপন করে।

ইউরোপীয়দের আগ্রহের কারণ

জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ শুরু হলে সমগ্র ইউরোপে ধর্মীয় উন্মাদনা শুরু হয়। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া মুসলমানদের প্রতিহত করার জন্য ইউরোপের ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, হল্যান্ড, জার্মানি প্রভৃতি দেশ জোটবদ্ধ হয়ে এই ক্রুসেডে যোগ দেয়। অর্থক্ষয়ী ও রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ইউরোপের পুনর্বার নজর পড়ে ভারতবর্ষের ধন-সম্পদের প্রতি, আরব বণিকদের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির প্রতি। তারা ধারণা করল অর্থক্ষয়ী ক্রুসেডে তাদের যেমন অর্থনাশ হচ্ছে, তেমনি মুসলিমদের হওয়ার কথা। তারা নিশ্চয় এই অর্থের জোগান পাচ্ছে তাদের ভারতবর্ষসহ অন্যান্য অঞ্চলের বাণিজ্য আয় থেকে। তাদের কাছে অসহ্যকর ব্যাপার ছিল তাদেরই অর্থ ক্রুসেডে তাদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। শীতপ্রধান অঞ্চল হওয়ার কারণে ইউরোপের অধিবাসীরা টিনজাত মজুদ করা খাবার খেতে বাধ্য হতো। তাজা মাছ, মাংস বা অন্যান্য খাবার সারা বছর তারা খেতে পারত না। সুবিধাজনক সময়ে এসব খাবার তারা সংরক্ষণ করে রাখত। বৈরী আবহাওয়ার সময় তা গ্রহণ করত। সংরক্ষিত বিস্বাদ এসব খাবারে স্বাদ আনার জন্য ব্যবহার করত মসলা। মসলা ছাড়া তাই ইউরোপিয়ানদের চলতই না। এই মসলা আবার তারা উৎপাদন করতে পারে না। উৎপাদিত হয় সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে ভারতবর্ষে। সেটাও ইউরোপিয়ানরা জেনেছে অনেক পরে। মসলা আসার দুটো পথ ছিল। পারস্যের মধ্য দিয়ে, আর একটা মিসরের মধ্য দিয়ে। মসলার জন্য ইউরোপ মিসরের বণিকদের ওপর নির্ভর করতে হতো। মিসরও ইউরোপের সংকট বুঝতে পেরে দ্বিগুণ-তিন গুণ দাম চড়িয়ে মসলা বিক্রি করত। আবার পারস্যবাসী ইসলাম গ্রহণ করায় ইউরোপের লোকের পক্ষে সম্ভব ছিল পারস্যের মধ্য দিয়ে মসলার অনুসন্ধান করা।

 অবশ্য এ পথেই ইউরোপিয়ানরা জানতে পারে মসলা কোথায় উৎপাদিত হয়। তাতাররা যখন পারস্যের ক্ষমতা দখল করে তখনো তারা ইসলাম গ্রহণ করেনি। সে সময় তাতাররা ইউরোপিয়ানদের জন্য পারস্যের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। ফলে ইউরোপের বণিকরা জানতে পারেন মসলা কোথায় উৎপাদিত হয় আর কীভাবেই তা ইউরোপে পৌঁছে। কিন্তু পারস্যের মধ্য দিয়ে চলাচলের সুযোগ বেশিদিন ভোগ করতে পারলেন না ইউরোপের বণিকরা। পুনরায় মুসলমানরা পারস্যে আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হলে ইউরোপকে আবারও মসলার জন্য মিসরের বণিকদের ওপরই নির্ভর হতে হয়। মিসরীয় বণিকরা ইউরোপীয় বিভিন্ন রাজ্যের বণিকদের কাছে পণ্য বিক্রয় করলেও ইতালির ভেনিস নগরীর ব্যবসায়ীরা ছিল তাদের বাঁধা খরিদ্দার। ভেনিসের বণিকরা মিসরীয়দের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে পূর্বাঞ্চলীয় পণ্য কিনে ইউরোপের অন্যান্য দেশের বণিকদের কাছে বিক্রি করতেন। মিসরীয়রা যেহেতু অন্য কারও কাছে বেশি পরিমাণে পণ্য বিক্রি করতেন না, ফলে ইউরোপের অন্য দেশের বণিকদের ভেনিসের বণিকদের ওপর নির্ভর করতে হতো বাধ্য হয়ে। আর সুযোগ বুঝে ভেনিসের বণিকরাও চড়া দাম হাঁকাতেন। বিভিন্ন রাজ্যের বণিকদের ভেনিসের ওপর নির্ভরতার কারণে ভেনিস অত্যন্ত সমৃদ্ধিশালী নগরে পরিণত হলো। ইউরোপ দেখল তাদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ মুসলমানরা তাদের বিরুদ্ধেই ব্যয় করতে পারছে ক্রুসেডে। অর্থের জোগান এবং ভেনিস-মিসর বণিক মৈত্রীর ফাঁদ এড়াতে ইউরোপ মসলা আহরণের বিকল্প পথের জন্য উঠেপড়ে নামে। এই বিকল্প পথে নাম জলপথ। তারা জলপথে ভারতবর্ষে পৌঁছানোর পথ আবিষ্কারে তাদের সর্বোচ্চ নিয়োগ করে। এই অভিযানে তাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হয় পর্তুগাল।

পর্তুগিজদের আবির্ভাব

পনেরো শতকে পর্তুগালরাজা ডোম হেনরি মুসলমানদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের নেতার স্থান লাভ করেছিলেন। স্পেন ও পর্তুগালের নিকটবর্তী রাজ্যগুলো মুসলমানদের অধিকারে চলে যাওয়ায় সব সময় তাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো। সমর কৌশলের পাশাপাশি তাদের অর্থনীতিতে আঘাত হানাও তাই পর্তুগালের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল। রাজা ডোম হেনরি জানতেন মুসলমানদের সম্পদ ও শক্তির প্রধান উৎস ভারতবর্ষ ও ইন্দোনেশিয়ার মসলার বাজার। মুসলমানদের পতন ঘটাতে হলে সেখানে আঘাত হানতে হবে। আর আঘাতটা যদি তার নেতৃত্ব পর্তুগাল করতে পারে তাহলে মসলার বদৌলতে পর্তুগাল হয়ে উঠবে সম্পদশালী আর তিনি হয়ে উঠবেন খ্রিস্টান সাম্রাজ্যের নেতা। এই স্বপ্ন তাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে ভারতবর্ষে আগমনের পথ আবিষ্কারের আয়োজন করতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি দক্ষ গাণিতিক, মানচিত্রক, জ্যোতির্বেত্তা ও সুদক্ষ নাবিকদের নিয়োগ করলেন এ কাজে।

তখন পর্তুগিজদের দু-ধরনের জাহাজ ছিল। ক্যারাভেল ও গ্যালিওন। ক্যারাভেল হলো হালকা ও দ্রুতগতির জাহাজ। গ্যালিওন অধিক ভার বহনে সক্ষম ভারী জাহাজ। ভারী ভারী কামান বহন করতে এ জাহাজ ব্যবহৃত হতো বলে এর গতি ছিল ধীর। ডোম হেনরি বুঝতে পেরেছিলেন পথ আবিষ্কারের মতো দীর্ঘযাত্রায় গ্যালিওন উপযুক্ত নয়। তাই তিনি জাহাজের উন্নতিতে প্রকৌশলীদের নির্দেশ দেন। জাহাজের উন্নতি করলেই যে সাফল্য আসবে না তা রাজা বুঝেছিলেন। তিনি দক্ষ ও অকুতোভয় নাবিক গড়ে তোলার জন্য নৌবিদ্যালয় স্থাপন করেন। এসব নৌবিদ্যালয় থেকে প্রশিক্ষিত নাবিকরা পথের সন্ধানে ছড়িয়ে পড়ত সমুদ্র আঁকড়ে। পর্তুগিজদের এই দুঃসাহসিক অভিযানের কথা ইউরোপের অন্যান্য রাজ্য ও খ্রিস্টীয় ধর্মনেতা রোমের পোপ পঞ্চম নিকোলাসের কাছেও পৌঁছে। তিনি ঘোষণা করেন, পর্তুগালের রাজা হেনরির এই অভিযাত্রা তিনি সমর্থন করেন কারণ এর ফলে খ্রিস্টধর্ম ব্যাপকভাবে প্রসারিত হবে। খ্রিস্টধর্মের কল্যাণে এই অবদান রাখার জন্য রাজা হেনরি ও তার উত্তরাধিকাররা পূর্বাঞ্চলীয় সেসব দ্বীপ, বন্দর ও সমুদ্রের অধিকার প্রদান করেন। এসব অঞ্চলে রাজা হেনরি ও তার উত্তরাধিকারদের প্রভুত্বের ওপর কোনো রকম হস্তক্ষেপ যেকোনো বিশ্বাসী খ্রিস্টানের জন্য নিষিদ্ধ করে রাজা হেনরি তথা পর্তুগালের উপনিবেশ স্থাপনের পথ নিষ্কণ্টক করে দেন। রাজা হেনরি ভারত অভিযানের শুরুটা করলেও সফলতা ভোগ করতে পারেননি। ১৪৬০ সালে তার মৃত্যু হয়। ১৪৮৭ সালে বার্থেলেমি কেপ অব গুড হোপ আবিষ্কার করেন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম সফল হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে। কিন্তু নব উদ্যমে আবারও অভিযানের জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থের। দীর্ঘদিন ধরে অভিযানের ব্যয় বহন করে পর্তুগাল অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা নাজুক অবস্থায় ছিল তখন। সে কারণে কিছু অভিজাত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এ অভিযানের বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু পর্তুগালের তখনকার রাজা ডোম ম্যানুয়েল অভিযানের পক্ষে ছিলেন। তিনি অভিযানের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন।

১৪৯৭ সালের ৮ জুলাই পর্তুগালের বেলেম পোতাশ্রয় থেকে চারটি জাহাজ ভারতবর্ষের দিকে যাত্রা শুরু করে। প্রথম দুটি জাহাজের নাম স্যান গাব্রিয়েল ও স্যান র‌্যাফেল। স্যান গাব্রিয়েলে ২০টি কামান সাজানো ছিল। এই অভিযানের নেতৃত্ব দেন ভাস্কো দা গামা। তিনি নৌপথে ইউরোপ থেকে ভারতবর্ষে আসার পথ আবিষ্কারের কৃতিত্ব পেয়ে থাকেন। পর্তুগালের নৌবিদ্যালয়ের প্রশিক্ষিত নাবিকরা আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে চলাচলের মাধ্যমেই ভারতে আসার নৌপথ আবিষ্কার করেন। ভাস্কো দা গামা ইউরোপের কোনো দেশের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম ভারতবর্ষের মাটিতে পা রাখেন। ইউরোপের কোনো ব্যক্তি এর আগে ভারতের মাটিতে পা রাখেননি তা নয়। ১৪৮৮ সালে পেরো দা কোভিলহাম নামের একজন পর্তুগিজ নাগরিক প্রথম ভারতে আসেন। তিনি নিজের পরিচয় লুকিয়ে আরবি জাহাজে করে আরবদের পোশাক পরে কালিকট বন্দরে এসেছিলেন। তার গায়ের রং দেখে আরবদের থেকে বেশি সাদা হওয়ায় স্থানীয়রা তার সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠে। কিন্তু পেরোর মুখের বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শুনে তারা তাকে আরব হিসেবেই মেনে নেয়। পেরো দা কোভিলহাম মূলত কালিকট বন্দর ও কালিকট রাজ্যের ভেতরকার তথ্য সংগ্রহের জন্য পর্তুগালের রাজা দ্বিতীয় ডোম জোয়াও এর নির্দেশে গুপ্তচর হিসেবে কালিকটে এসেছিলেন। কিন্তু তার এ ছদ্মবেশী অভিযান সংগত কারণেই ভারতবর্ষে ইউরোপীয়দের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত হয় না।

ভাস্কো দা গামা কেপ অব গুড হোপ ছাড়িয়ে ভারত মহাসাগরে আসেন। সেখান থেকে মোজাম্বিক। এরপরের পথটা কিছুটা বিপৎসংকুল। ভারত মহাসাগরকে সোজাসুজি পাড়ি দিয়ে ভারতের উপকূলে পৌঁছাতে হবে। এ পথটা তখনো ইউরোপীয়দের কাছে ছিল অজানা। ভাস্কো দা গামাকে এ অভিযানে সহযোগিতার জন্য মোজাম্বিকের উত্তরে আফ্রিকার আগে উপকূলবর্তী রাজ্য মিলিন্দির রাজা একজন ভারতীয় নাবিক দিয়ে সাহায্য করেন।

দশ মাস বারো দিনের সমুদ্র ভ্রমণের পর ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ সালের ২০ মে কালিকট বন্দরে পৌঁছান। কালিকট বন্দর সে সময়ের ব্যস্ততম বন্দরগুলোর একটি ছিল। নানা দেশের নানা রকমের জাহাজ এসে ভিড়ত এ বন্দরে। সেদিন বন্দরের উপস্থিত খালাসি ও বণিকরা দেখল এক ভিন্নধর্মী জাহাজ এসে ভিড়েছে। এই জাহাজ অন্য জাহাজের তুলনায় অনেক শক্তপোক্ত। দেখেই বোঝা যায় অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। জাহাজের পাটাতন থেকে বেরিয়ে এসেছে ২০টি কামানের মুখ। তখনো এটির বিধ্বংসী ক্ষমতা সম্পর্কে জানে না কালিকটের অধিবাসীরা। কিন্তু এ বন্দরে বাণিজ্য করতে আসা আরব বণিকরা কামানের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা সম্পর্কে জানতেন। দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে রাজদরবারে ছিল তাদের সহজ প্রবেশাধিকার। তারা রাজাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানালেন। কামান সজ্জিত জাহাজ দেখে রাজা উদ্বিগ্ন হলেও বন্দরে জাহাজ ভেড়ার ও বাণিজ্য করা অনুমতি দেন। ভাস্কো দা গামা কালিকট বন্দরে এসেই দেখেন ইউরোপে যে কথা প্রচলিত ছিল তা অনেকাংশেই ভুল। তারা মনে করেছিলেন ভারতের অধিবাসীরা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইউরোপের ক্রিস্টানদের উপযুক্ত যোদ্ধা হয়ে উঠবে তারা। কিন্তু ভারতে পা দিয়ে তিনি দেখলেন যে আরব বণিকরা কালিকটের স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করেছে, এমনকি রাজদরবারেও তাদের প্রভাব রয়েছে। ভাস্কো দা গামা কামান সাজিয়ে এলেও এ অভিযানে তা ব্যবহার করলেন না। তিনি ভারত সম্পর্কে যথাসম্ভব তথ্য সংগ্রহ করে দেশে ফিরেন এবং রাজা ডোম ম্যানুয়েলের কাছে তার অভিযানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।

উপনিবেশ স্থাপনের প্রথম ধাপ

পর্তুগালরাজ ভাস্কো দা গামার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পেয়ে বুঝলেন ভারতের মহার্ঘ্য মসলার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ পেতে তাকে আরব বণিকদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী লড়াই করতে হবে। সে উদ্দেশ্যেই তিনি দ্বিতীয় জাহাজ বহর পাঠান। এ জাহাজ বহরে ৩৩টি জাহাজ ছিল। এটি মোটেও বাণিজ্যিক জাহাজ বহর ছিল না। পণ্যের পরিবর্তে জাহাজগুলো বহন করছিল ১৫০০ সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র। তাদের ওপর নির্দেশ ছিল তারা ছয়টি জাহাজ নিয়ে বন্দরে উপস্থিত হবে এবং ঘাঁটি স্থাপন ও খ্রিস্টধর্ম প্রচারের অনুমতি প্রার্থনা করবে। যদি রাজা অনুমতি না দেন তাহলে প্রথমে কামানের ভয় দেখিয়ে বলপূর্বক ঘাঁটি স্থাপন করবে। এই বহরের দায়িত্বে ছিলেন পেড্রো আলভারেজ ক্যাব্রাল। এই যুদ্ধযাত্রাই মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপিয়ান উপনিবেশ স্থাপনের প্রথম পদক্ষেপ।

রাজা ক্যাব্রালকে স্বাগত জানান এবং ঘাঁটি স্থাপন করতে অনুমতি দেন। কিন্তু পর্তুগিজদের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। এ উদ্দেশ্যে তারা স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে কলহে লিপ্ত হতো। এমনই এক কলহে স্থানীয় অধিবাসীরা ক্যাব্রালের ঘনিষ্ঠ সহচর কোরিয়া ও তার পঞ্চাশজন সঙ্গীকে হত্যা করে। ঘটনা জেনে ক্যাব্রাল তার ছয়টি জাহাজ সরিয়ে নিয়ে বন্দরে গোলা নিক্ষেপ করতে শুরু করে।

আশ্রিত বণিকদের এমন বর্বর আক্রমণের জবাবে রাজা ১৫০০ যোদ্ধাসহ ৮০টি জাহাজ পাঠান। কালিকটের জাহাজের প্রতিরোধের মুখে ক্যাব্রাল পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। দীর্ঘ সাধনার পর ভারতের মাটিতে পা রাখার পর তাকে নিজেদের কবজায় না এনে ছেড়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছাই ছিল না পর্তুগিজ তথা ইউরোপিয়ানদের। ভারত ও আশপাশের ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ নিজেদের অধিকারে নেওয়ার জন্য তারা পরিচালনা করে একের পর এক সশস্ত্র অভিযানে। মসলার বাণিজ্যকে করায়ত্ত করার এ ধারাবাহিক যুদ্ধযাত্রা মসলার যুদ্ধ নামে পরিচিত। ভারতবর্ষের ইউরোপিয়ানদের আগমনে প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক। উপনিবেশায়ন হলো এর চূড়ান্ত প্রকাশ।

তথ্যসূত্র : মসলার যুদ্ধ, সত্যেন সেন