দেশের জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) সব ঢাকার চকবাজারে। নিজেরা অথবা প্রতিনিধি পাঠিয়ে তারা সবাই পলিব্যাগ কিনছেন। এসব ব্যাগে ভরে ক্রেতাদের টিসিবির পণ্য দেওয়া হবে। ডাল, তেল টিসিবির ডিলার ডিসি কার্যালয়ে পৌঁছে দিলেও তারা প্যাকেট করে দেবেন না। প্যাকেট করতে হবে ডিসিদের।
এই প্যাকেট করতে গিয়ে ডিসিরা বিড়ম্বনায় পড়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্যাকেট না দিলেও কী মানের পলিব্যাগ ব্যবহার করতে হবে তা বলে দিয়েছে। এমনকি ওই মানের পলিব্যাগের দামও বেঁধে দিয়েছে। এখন ডিসিরা ওই পলিব্যাগ কিনতে গিয়ে হয় পাচ্ছেন না, নয়তো দামে মিলছে না। বেশি দাম দিয়ে কিনে সেই টাকা সমন্বয়ের ঝামেলায় যেতে চান না অনেক ডিসি। কারণ হিসেবে তারা আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদাহরণ টেনে আনছেন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পেও একই সমস্যায় পড়েছিলেন ডিসিরা। আশ্রয়ণের ঘর বানানোর জন্য তাদের যে মানের টিন ব্যবহার করতে বলা হয়েছিল সেই মানের টিন বাজার থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। আর পেলেও তা দামে মেলেনি। এই অবস্থায় কিছু ঘর বানাতে নির্দেশের বাইরে গিয়েছিলেন ডিসিরা। এ কারণে মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। শাস্তি হিসেবে কিছু কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে, লঘুদ- দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্দিষ্ট মানের পলিব্যাগ পাওয়া যাচ্ছে না বা দাম বেশিএ ধরনের কোনো অভিযোগ এখনো আমাদের কাছে আসেনি। এ ধরনের পরিস্থিতি হলে নিশ্চয়ই বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আসন্ন রমজানে এক কোটি পরিবারকে দুই দফা ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহ করবে সরকার। কভিড পরিস্থিতিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় কমে যাওয়াও টিসিবির পণ্য বিতরণের আরও একটি কারণ।
ডিসিদের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত এক কোটি পরিবারের জন্য সয়াবিন তেল, চিনি, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুর সরবরাহ করবে। প্রতিটি পরিবার রমজানের আগে একবার দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি চিনি, দুই কেজি মশুর ডাল ও এক কেজি ছোলা পাবে। আবার রমজানের মাঝামাঝি সময় থেকে ঈদের আগ পর্যন্ত আরেক দফা পণ্য দেওয়া হবে পরিবারগুলোকে। প্রতি দফায় এসব পণ্য পেতে দরিদ্র পরিবারগুলোর খরচ হবে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
মূলত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা কভিডের সময় নগদ প্রণোদনা পাওয়া ৩৫ লাখ দরিদ্র কর্মহীন পরিবারকে টিসিবির ভর্তুকি মূল্যের পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করলে তিনি সংখ্যাটিকে এক কোটিতে উন্নীত করার নির্দেশ দেন বলে জানা গেছে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ডিসিরা। তাদের মতে, কভিডে যখন দরিদ্র মানুষের আয় কমে গেছে এবং বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, তখন এক কোটি পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে খাদ্য সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত খুবই ইতিবাচক। এর মাধ্যমে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। তবে সঠিকভাবে উপকারভোগী বাছাই করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। সেই সঙ্গে টিসিবির নির্ধারিত দরে পলিব্যাগ পাওয়া ও মালামাল পরিবহন করাও চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন ডিসিরা।
টিসিবি পণ্যগুলোর প্যাকেট কেমন হবে তার নমুনা দিয়েছে। ছোলা, চিনি, মশুর ডাল এসব খাদ্য পণ্য সাধারণত লো ডেনসিটি পলিথিন (এলডিপিই) এবং হাই ডেনসিটি পলিথিন (এইচডিপিই) ব্যাগে প্যাকেট করা হয়। বাজারে এই দুটি ব্যাগ সাধারণত এলডিপিই এবং এইচডিপিই ব্যাগ নামে পরিচিতি। এলডিপিই ব্যাগ তুলনামূলক একটু নরম এবং এইচডিপিই একটু শক্ত ধরনের হয়। এসব ব্যাগ সাধারণত কেজি দরে বিক্রি হয়। ব্যাগের পুরুত্ব ও আকারের ওপর নির্ভর করে কেজিতে কতটি ব্যাগ হয়। তবে এইচডিপিই ব্যাগ তুলনামূলক পাতলা হওয়ায় কেজিতে এলডিপিই ব্যাগের চেয়ে বেশি হয়। তাই এইচডিপিই ব্যাগ তুলনামূলক অনেক সাশ্রয়ী। এই ধরনের ব্যাগের পুরুত্ব মাইক্রন এবং মিলিমিটারে পরিমাপ করা হয়। উৎপাদনকারী, দোকানদার এইচডিপি ব্যাগ মাইক্রোন ও মিলিমিটার উভয় পরিমাপ অনুযায়ী বিক্রি করে।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. ইসমাইল হোসেন গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাশ্রয়ী দামে টিসিবির পণ্য বিতরণের কাজ পরিকল্পনা মতোই এগিয়ে চলছে। মাঠ পর্যায়ের তালিকা প্রণয়ন শেষ হয়েছে। এসব পণ্য গুদামে রাখতে হবে। এই বিভাগের খুলনা জেলা ছাড়া আর সব জেলার গুদাম চূড়ান্ত হয়েছে। খুলনা জেলারটাও দুই এক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হয়ে যাবে। বাকি থাকে প্যাকিং। সেটাও টিসিবির নির্দেশনা মতো এগিয়ে চলছে। সব মিলে আমাদের প্রস্তুতি খুব ভালো।’
ছোলা, চিনি, মশুর ডাল এসব খাদ্য পণ্য প্যাকেট করার জন্য এইচডিপিই আদর্শ বলে মনে করে টিসিবি। এ কারণে এ ধরনের পলিথিনের ব্যাগের সংক্ষিপ্ত স্পেসিফিকেশন, বাজারমূল্য, প্রাপ্তি স্থানও টিসিবি তাদের ওয়েব সাইটে উল্লেখ করেছে। এইচডিপিই ব্যাগের আকার হতে হবে ১০ বাই ১৫ ইঞ্চি। পুরুত্ব ৭০ মাইক্রন বা ০.০০৭ এমএম। প্রতি কেজিতে সাধারণত ১৪৮ থেকে ১৫২টি ব্যাগ হয়। ব্যাগের এক পাশে টিসিবির লোগো থাকতে হবে। সেই লোগোও প্রিন্ট করাতে হবে ডিসিদের।
টিসিবি বলেছে, চাহিদা, সরবরাহ ও সরবরাহ সময়ের ওপর ভিত্তি করে ব্যাগের দাম নির্ধারিত হয়। সাধারণত এক রং প্রিন্টসহ প্রতি কেজি এইচডিপিই ব্যাগের দাম ১৯০ থেকে ২৩০ টাকা। ক্ষেত্র বিশেষে দামের কিছুটা হ্রাস-বৃদ্ধি হতে পারে। ঢাকা শহরের চকবাজার এই ব্যাগের পাইকারি বাজার। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে পাওয়া যায় বলে টিসিবির নির্দেশনায় উল্লেখ রযেছে।
পলিথিন ব্যাগ কেনার জন্য প্রায় প্রতিদিনই ঢাকার চকবাজারে যাচ্ছেন কোনো না কোনো ডিসি। তারা যেতে না পারলে পাঠাচ্ছেন এডিসি জেনারেল, আরডিসি, এনডিসিকে। গতকাল তাদের ‘মিলনমেলা’ বসেছিল রাজধানীর চকবাজারে। তাদের সঙ্গে থাকছেন ডিসি কার্যালয়ের কর্মচারীরা। তারা কাজটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ভয় থেকে।
পলিথিন ব্যাগ কিনতে ঢাকার চকবাজারে আসতে হবে কেন জানতে চাইলে একজন ডিসি দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলা পর্যায়েও পলিথিন ব্যাগ পাওয়া যায়। কিন্তু দাম ঢাকার চেয়ে অনেক বেশি। টিসিবি বলেছে প্রতি কেজি পলিথিন ব্যাগ সর্বোচ্চ ২৩০ টাকা। অথচ চকবাজারে ২৮০ টাকার নিচে পলিথিন ব্যাগ নেই। সরকার যদি হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে দুই-এক দিনের মধ্যেই বাজার থেকে পলিথিন ব্যাগ উধাও হয়ে যাবে।
একাধিক ডিসি দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তারা কাজটি করছেন, আনন্দের সঙ্গেই করছেন। রমজানে সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে পারবেনএটা তাদের জন্যও অন্যরকম একটা অনুভূতির সৃষ্টি করছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে টিসিবির দর নিয়ে। তারা বলেছে, প্রতি কেজি পলিব্যাগ ১৮০ থেকে ২৩০ টাকা। কিন্তু চকবাজার থেকে ২৮০ টাকা দরেও ব্যাগ কেনা যাচ্ছে না। প্যাকিং, গাড়িতে ওঠানো-নামানো মিলিয়ে তারা খরচ করতে পারবে ১০০ টাকা। অথচ টিসিবির ডিলাররা এটার সঙ্গে জড়িত। তারা বলছেন, মালামাল ওঠানো-নামানো করার ওয়ানওয়েতেই ৮০ টাকা পান। অর্থাৎ ওঠাতে ৮০ টাকা আর নামাতে ৮০ টাকা।
এক কোটি পরিবারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ছাপাতে হবে ডিসিদেরই। গুদাম ভাড়া করার বিষয়ও রয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের গুদাম অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। না থাকলে ভাড়া করতে হবে।
একজন ডিসি বলেছেন, এই কাজকে তারা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। সিনিয়ররা তাদের এ দায়িত্ব দিয়েছেন। তা ছাড়া টিসিবির পক্ষে এত কিছু করা সম্ভব নয়।
অপর একজন ডিসি বলেছেন, এক কোটি পরিবারকে এ সুবিধা দেওয়া হলে প্রতি জেলায় গড়ে সাড়ে সাত লাখ ব্যাগ দিতে হবে। কাজটা চ্যালেঞ্জিং। আর টিসিবি যদি পণ্য সরবরাহ করতে পারে, পলিব্যাগ সরবরাহ করতে পারবে না কেন? এত অল্প সময়ে লাখ লাখ প্যাকেটের ভেতর যদি কোনোটিতে পরিমাণে কম থাকে তাহলে কী হবে? ডিসিদের ‘মিডিয়া ট্রায়ালে’ ঠেলে দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কভিডের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ঈদ উপহার দেওয়ার জন্য ৫০ লাখ পরিবারের তালিকা করা হয়েছিল। তালিকায় পেনশনার, সরকারি চাকরিজীবী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নাম থাকায় তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে যাচাই-বাছাই শেষে ৩৫ লাখ পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। পরে সড়ক পরিবহন, নৌপরিবহন শ্রমিক, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আরও সাড়ে তিন লাখ মানুষকে নগদ সহায়তা দেয় সরকার। ওই তালিকা সরকারের কাছে রয়েছে। রমজানে যে এক কোটি পরিবার খাদ্য সহায়তা পাবে, তার মধ্যে এই সাড়ে ৩৮ লাখ পরিবার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ঢাকা ও বরিশাল সিটি করপোরেশনভুক্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই তালিকার বাইরে রয়েছে। তাদের অন্তর্ভুক্ত করলে এই সংখ্যা আরও ১২ লাখ বাড়বে। এ ছাড়া জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে দরিদ্রদের তালিকা তৈরি করা হবে। মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস) পাওয়ার পর নির্ধারিত দিনে, নির্ধারিত স্থানে গিয়ে খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করবে তারা।
বর্তমানে সারা দেশে ১২টি গুদাম রয়েছে টিসিবির। এসব গুদাম থেকে সারা দেশে ডিলারদের মাঝে পণ্য সরবরাহ করে খোলাবাজারে বিক্রি করে সংস্থাটি। যে ১২টি জেলায় গুদাম রয়েছে, সেখান থেকে শুধু ওইসব জেলাতেই পণ্য সরবরাহ করা হবে। বাকি ৫২ জেলায় পণ্য সরবরাহ করা হবে ডিসিদের পরিচালনায়। উপকারভোগীদের মধ্যে টিসিবির পণ্য বিতরণের জন্য ডিসিরা ক্রেতার সংখ্যা, বিক্রয়ের সময় ও স্থান নির্ধারণ করে কোন তারিখে, কোথায়, কতজন উপকারভোগীর মধ্যে পণ্য বিতরণ করা হবে, তার তালিকা করবেন। এই তালিকার কপি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, টিসিবি, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পৌরসভার মেয়র, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও ওয়ার্ড কমিশনারদের দেবেন।
তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের অনুপস্থিতির কারণে কোনো পণ্য অবিক্রীত থাকলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) উপস্থিতিতে নিম্ন আয়ের অন্য মানুষদের মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যু করে তাদের কাছে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করবেন। পণ্য বিক্রির জন্য ধাপে ধাপে কমিটি থাকবে, যেখানে দুজন করে পুলিশ সদস্যও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বরাবরের মতো এবারও রমজানে সারা দেশে ৭০০ ট্রাকে পণ্য বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে তেল, চিনি, খেজুর, ছোলা সংগ্রহ করছিল টিসিবি। এক কোটি পরিবারকে দুই দফায় পণ্য সরবরাহ করার সিদ্ধান্তের পর সংস্থাটি অনেক বেশি পণ্য সংগ্রহ করছে।