সখীপুরে এক বছরে বিয়ে ৮৩৩, বিচ্ছেদ ৫৭৮

বিয়ের মাত্র ১৫ দিন হয়েছে। এর মধ্যেই স্বামীর ফিরে যেতে হলো প্রবাসে জীবনে। বিয়ের সময় শর্ত ছিল স্ত্রীকে পড়াশোনা করতে দিতে হবে। স্বামী বিদেশে থাকলেও নিয়মিত কথা হতো। হঠাৎ এক দিন স্বামী কোনো কারণ ছাড়াই স্ত্রীকে জানিয়ে দিলেন আর পড়াশোনা হবে না। মেয়েটির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল, মুহূর্তে তার স্বপ্ন মলিন হয়ে গেল। শারমিলি (ছদ্মনাম) পণ করলেন কোনো অবস্থাতেই পড়াশোনা বন্ধ করবেন না। স্বপ্নপূরণে এগিয়ে গেলেও সংসার আর টেকেনি। এভাবে তুচ্ছ কারণে অনেক সংসার ভাঙছে, বাড়ছে বিবাহবিচ্ছেদ। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার একটি গ্রামের বছরখানেক আগের ঘটনা এটি।

উপজেলায় গত এক বছরে ৫৭৮টি বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিবাহ বিচ্ছেদের পেছনে বাল্যবিবাহ, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর উদাসীনতা, পরকীয়া, নারীর প্রতিবাদী রূপ, নারীর শিক্ষা, স্বামীর মাদকাসক্তি, দীর্ঘদিন স্বামী প্রবাসে থাকা, শ^শুর-শাশুড়ির নির্যাতন, যৌতুকের জন্য ক্রমাগত চাপ, স্বামীর নির্যাতন এসব কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।

সখীপুরের আটটি ইউনিয়ন ও একমাত্র পৌরসভাসহ মোট ১২টি কাজী অফিস রয়েছে। কাজী অফিসের নথি থেকে জানা যায়, ২০২১ সালে উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নে ৬৩টি, বহেড়াতৈল ইউনিয়নে ৬৯টি, গজারিয়া ইউনিয়নে ২৮টি, যাদবপুর ইউনিয়নে ৪৪টি, হাতীবান্ধা ইউনিয়নে ৪৪টি, কালিয়া ইউনিয়নে ১২০টি, দাড়িয়াপুর ইউনিয়নে ৩৫টি, বহুরিয়া ইউনিয়নে ২১টি ও পৌরসভার চারটি কার্যালয়ে ১৫৪টি বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক) নিবন্ধন করা হয়েছে।

সখীপুর উপজেলা নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী) সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সখীপুর পৌরসভার এলাকার অন্যতম কাজী শফিউল ইসলাম জানান, উপজেলায় ২০২১ সালে বিয়ে হয়েছে ৮৩৩টি এবং বিচ্ছেদ ৫৭৮টি। এর মধ্যে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে ১৭টি, স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে ২৯৭টি ও ছেলে-মেয়েপক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে ২৬৪টি বিয়ের তালাক নিবন্ধন করা হয়েছে। উপজেলার ১২টি কাজীর কার্যালয় ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া যায়। সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে উপজেলায় বিয়ে হযেছে ৭৫৭টি। আর বিচ্ছেদ ৪৭৬টি। শফিউল ইসলাম আরও বলেন, বাল্যবিবাহ, স্বামী বিদেশে থাকা ও পরকীয়া নিয়ে বিভিন্ন জটিলতায় প্রথমে দুই পরিবারের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। পরে তা বিচ্ছেদে রূপ নিচ্ছে। গত বছর উপজেলার ৯০ শতাংশ তালাক স্ত্রীরা দিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নারী বলেন, সামান্য কারণে একজন নারী কখনো বিবাহবিচ্ছেদ চান না। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন যখন সীমা অতিক্রম করে, ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় কেবল তখনই বাধ্য হয়ে এ কাজ করতে হয়।

উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ফিরোজা আক্তার বলেন, আগে নারীর ক্ষমতায়ন এখনকার মতো ছিল না। পুরুষদের নির্যাতন-অত্যাচার সহ্য করে নারীরা সংসার করেছে। এখন মেয়েরা সচেতন, শিক্ষিত ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় মর্যাদা বেড়েছে। এ কারণে মেয়েরা আর নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে চায় না। তারা আর মুখ বুজে থাকে না। তাই হয়তো বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চিত্রা শিকারী বলেন, তালাক কমাতে হলে আগে বাল্যবিয়ে ঠেকাতে হবে। এছাড়া অসময়ে বিয়ে, যৌতুক, দীর্ঘদিন স্বামী প্রবাসে থাকা, স্বামীর নির্যাতন তালাকের অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন।