আজ দেশে ফেরা হচ্ছে না ২৮ নাবিকের

রোমানিয়া থেকে ফ্লাইটের টিকিট না পাওয়ায় দেশে ফিরতে বিলম্ব হচ্ছে অলভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় বিধ্বস্ত বাংলার সমৃদ্ধির নাবিকদের। আজ মঙ্গলবার তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার কথা থাকলেও গতকাল সোমবার পর্যন্ত ফ্লাইটের কোনো টিকিট না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে রোমানিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র। রোমানিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তাদের জন্য টিকিটের চেষ্টা করছি। কিন্তু আজও কোনো টিকিট পাওয়া যায়নি। তবে টিকিট পেলে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাদের রওনা দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। এরপর তুরস্ক হয়ে বুধবার ঢাকা পৌঁছাতে পারেন।’

রাষ্ট্রদূত জানান, রকেট হামলায় নিহত নাবিক হাদিসুর রহমানের মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়টি পোল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস দেখছে।

ইউক্রেন থেকে মলদোভা হয়ে বাসযোগে গত রবিবার বিকেলে রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে পৌঁছান বাংলার সমৃদ্ধির ২৮ নাবিক। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের ব্যবস্থাপনায় একটি হোটেলে তাদের রাখা হয়েছে।

বুখারেস্টে অবস্থানরত নাবিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে জানিয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স  অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেখানে সবাই সুস্থ আছেন। আমরা তাদের দেশে ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছি।

এদিকে, ২৮ নাবিকের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন তাদের স্বজনরাও। রোমানিয়ায় থাকা নাবিকদের সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগ করেও কখন তারা ফিরবেন তা নিশ্চিত হতে না পেরে দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছেন স্বজনরা।

২৮ নাবিকের একজন বাংলার সমৃদ্ধির চিফ ইঞ্জিনিয়ার ওমর ফারুক তুহিনের ভাই ওমর শরীফ এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা পরিবারের সবাই অপেক্ষায় আছি কখন তাকে কাছে পাব। তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা এখনো হোটেলে আছে। কিন্তু কখন ফিরবে তা জানাতে পারেননি।’

এদিকে যুদ্ধকবলিত ইউক্রেনের বন্দরে বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজ পাঠানোকে বিএসসির গাফিলতি বলে আখ্যায়িত করেছে মার্চেন্ট মেরিনারদের সংগঠন বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ) এর কর্মকর্তারা। মূলত গাফিলতির কারণেই একজন নাবিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি তাদের।

বিএমএমওএ’র পক্ষ থেকে সোমবার নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী বরাবরে পাঠানো এক চিঠিতে এ ঘটনায় বিএসসির অব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখতে এবং ভবিষ্যতে যাতে আর এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে ব্যাপারে কার্যকর উপায় বের করার লক্ষ্যে ৫ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন মো. এনাম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. শাখাওয়াত হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়- ‘ঘটনার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমাদের কাছে পরিলক্ষিত হয়েছে যে, বিএসসি জাহাজটিকে চার্টারার পার্টির ওয়ার জোন নীতিমালা অনুসরণ না করে যুদ্ধকবলিত স্থানে পাঠিয়েছিল। চিঠিতে বলা হয়, যে কোনো বীমা শুধু দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ দিতে পারে কিন্তু কোনো সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে না। জাহাজে কর্মরত নাবিক ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি এমভি বাংলার সমৃদ্ধি’র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু বিএসসি তখনকার ও পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনা না করে সেখানে জাহাজটি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যা একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল বলে আমরা মনে করি। বিএসসির এমন সিদ্ধান্তে একজন তরুণ নাবিকের মৃত্যু এবং রাষ্ট্র ও সরকারের সুনাম ক্ষুণœ হয়েছে, যা অনাকাক্সিক্ষত ও অপ্রত্যাশিত।

বিএসসির বক্তব্য : এদিকে ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে মিসাইল হামলা পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিএসসির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠানো হয়েছে। সংস্থার উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তারেক উল ইসলাম স্বাক্ষরিত বক্তব্যে বলা হয়, আন্তর্জাতিক শিপিং আইন ও বিধিবিধান পরিপালনপূর্বক সম্পাদিত চুক্তিপত্র (চার্টার পার্টি) অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) জাহাজ চার্টারিং কাজ অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ডেনমার্ক ভিত্তিক চার্টারার ডেলটা করপোরেশনের সঙ্গে বিএসসি’র সম্পাদিত চার্টার পার্টি এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী টাইম চার্টার ভিত্তিতে জাহাজটি ভাড়ায় চলছিল। গত ২৬ জানুয়ারি মুম্বাই বন্দর থেকে পণ্য বোঝাই নিয়ে তুরস্কের ইরেগলিতে পণ্য খালাস সম্পন্ন করে। সেখান থেকে পূর্বনির্ধারিত ভয়েজ অর্ডার অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরের উদ্দেশে জাহাজটি রওনা হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি জাহাজটি ইউক্রেনের ওলভিয়া বন্দরের আউটার অ্যাংকরেজে পৌঁছায়। পরদিন বন্দর পাইলটের মাধ্যমে একত্রে ২১টি জাহাজ কনভয় আকারে ইনার অ্যাংকরেজে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বন্দর থেকে সিরামিক ক্লে নিয়ে ইতালির রেভেনা বন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল বাংলার সমৃদ্ধির। কিন্তু ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হলে অনতিবিলম্বে লোডিং বাতিলকরত জাহাজটিকে উক্ত বন্দর ছেড়ে আসার জন্য মাস্টারকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। কিন্তু বন্দর কর্র্তৃক পাইলট সরবরাহ না করা, পোর্ট অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ হওয়া এবং বন্দর চ্যানেলে মাইন পোঁতার ফলে অলভিয়া বন্দরে আটকে পড়ে জাহাজটি। এরপর যুদ্ধ চলার মধ্যে ২ মার্চ একটি মিসাইল আঘাত হানে বাংলার সমৃদ্ধির ওপর, তাতে আমাদের একজন প্রিয় সহকর্মী থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান মারা যান।

বিএসসির ভাষ্য, ইউক্রেনে এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজে মিসাইল হামলার শিকার হওয়া সংক্রান্ত ঘটনাকে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল ভিন্নভাবে প্রবাহিত করার অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং বিএসসি’র উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। বিএসসি’র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন বিরূপ মন্তব্য/সংবাদ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অগ্রহণযোগ্য।