প্রযুক্তির অপব্যবহার নারীর অগ্রযাত্রায় বাধা

দেশে তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগুলো সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় আসার সঙ্গে সঙ্গে এর অপব্যবহার সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীদের অগ্রযাত্রায় বাধাও সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন নারীরা পুরুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই সাইবার সন্ত্রাসের শিকার হয়ে অনেকের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী থেকে কর্মজীবী এমনকি গৃহিণীরাও রেহাই পাচ্ছেন না সাইবার সন্ত্রাসের হাত থেকে; বিশেষ করে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়েছে পুলিশের সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করা ইউনিটগুলো।

গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বাড্ডা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক ছাত্রী। জিডিতে তিনি জানান, তার ছবি ব্যবহার করে খোলা হয়েছে ভুয়া ফেইসবুক আইডি। ওই আইডি থেকে বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রীর পরিচিতজনদের ফেইসবুক মেসেঞ্জারে বিভিন্ন অশ্লীল ছবি পাঠানো হচ্ছে। এমনকি ওই ছাত্রীর ছবি এডিট (সম্পাদনা) করে বাজেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করছে।

আরেক ভুক্তভোগী নারী গত ৫ জানুয়ারি ডিএমপির মুগদা থানায় জিডি করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, সুমি ইসলাম নাইমা নামে একটি ফেইসবুক আইডিতে তার সম্পাদনা করা আপত্তিকর ছবি ও ফোন নম্বর দিয়ে অনৈতিক কাজের জন্য গ্রাহক খোঁজা হচ্ছে। এতে তিনি সামাজিকভাবে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। কে বা কারা এমন করেছে, তাও জানা নেই তার।

ভুক্তভোগী ওই নারী গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ছবি ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে ওই ফেইসবুক আইডিতে বাজে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। প্রতিদিন অসংখ্য লোক আমাকে ফোন করে বাজে কথা বলছে। এ নিয়ে আমার পরিবারেও অশান্তি দেখা দিয়েছে। ওই ফোন নম্বরটি আপাতত বন্ধ রাখলেও ফেইসবুকে আমার ছবি রয়েই গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার এ ছবি দেখে অনেকেই খোঁজখবর না নিয়ে বাজে ধারণা পোষণ করছেন। এ বিষয়টি নিয়ে আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত রয়েছি।’

সুমি ইসলাম নাইমা নামে ফেইসবুক আইডিতে আরও অনেক নারীর ছবি ও ফোন নম্বর ব্যবহার করে একই ধরনের কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান ওই ভুক্তভোগী নারী।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যমতে, সাইবার জগতে নারীদের হয়রানি রোধে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামে একটি সেবা চালু হয়েছে। ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর এর যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১২ হাজার ৬৪১ জন ভুক্তভোগী নারী সাইবার জগতে হয়রানির শিকার হয়ে ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ পেজে যোগযোগ করেন। তাদের মধ্যে সেবা পেয়েছেন ৮ হাজার ২২১ জন। এসব ভুক্তভোগী হয়রানির শিকার হওয়া ফেইক ফেইসবুক আইডি কিংবা কনটেন্ট ডিলিটের (মুছে ফেলা) অনুরোধ জানান।

একাধিক ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুক ও ইমোতে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। কখনো কোনো নারীর ছবি এডিট করেবিকৃত ও আপত্তিকররূপে পোস্ট করা হচ্ছে ভুয়া ফেইসবুক আইডিতে। ফেইসবুক ও ইমোতে অনেক নারীকে ভিডিও কল করে বিকৃত আচরণ করে। অনেকের মেসেঞ্জারে নিয়মিত পাঠানো হয় পর্নো ছবি ও ভিডিও। আবার অনেক নারী প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে করছেন খোলামেলা ভিডিও চ্যাট। সেই ভিডিও গোপনে ধারণ করছে কথিত প্রেমিক। সম্পর্কের অবনতি হলে বা সম্পর্ক ছিন্ন হলে ওই ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফেইসবুক হ্যাক করেও অনেক নারীর গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে।

এমন অজস্র অভিযোগ প্রতিনিয়ত জমা পড়ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ, র‌্যাব ও ডিবির কাছে। কিছু ক্ষেত্রে সমাধান পেলেও অনেক নারী বছরের পর বছর অপেক্ষা করছেন প্রতিকারের আশায়।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধীদের গ্রেপ্তারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে রাজনীতিবিদদের ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে সাইবার জগতে কটূক্তিকারীদের বিষয়। যারা অপরাধ করছে তারা পার পেয়ে যাওয়ায় সাইবার জগতে নারীরা দিন দিন আরও বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

নারীদের হয়রানির বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী খুশি কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক সময় নারীদের ছবি কাট-পেস্ট করে ফেইসবুকে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে তাকে হুমকি দিচ্ছে। কখনো টাকা চায় অথবা কখনো চায় তার সঙ্গে একটা সম্পর্ক করতে। ব্যবহার করতে অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের দিকেও যায়। এ ধরনের ইস্যু নিয়ে অপরাধীকে ধরা হচ্ছে এমন আমরা কমই দেখছি। আমাদের যথেষ্ট দক্ষ লোকবল আছে। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারিবারিক বা সামাজিক কারণে ভুক্তভোগী নারীদের অনেকে ফেইক আইডি বা কনটেন্ট মুছে ফেলার মাধ্যমে সমাধান চান। তারা মামলার ঝামেলায় যেতে চান না। তবে আপসে সমাধান না খুঁজে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তাহলে আর সাইবার অপরাধীরা বেপরোয়া হতে পারবে না। এতে নারীদের সাইবার হয়রানির হারও অনেক কমে আসবে।

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) আশরাফউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাইবার জগতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীরা প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এসব ভুক্তভোগী নারীর বেশিরভাগের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছর। অনেক ক্ষেত্রে তাদের একসময়ের কাছের মানুষই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিচ্ছে আপত্তিকর ছবি। আমরা অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চেষ্টা করি ভুক্তভোগীকে সহায়তা করার।’