দুই জঙ্গির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ২১ বছরেও পৌঁছেনি থানায়

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থলে বোমা পুঁতে রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দীর্ঘ ২১ বছরেও সংশ্লিষ্ট থানায় পৌঁছেনি। এই দুই জঙ্গির একজনকে সম্প্রতি গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানতে পেরেছে, এই ব্যক্তি নির্বিঘেœ বিয়েশাদি করে জীবনযাপন করেছেন। দেশের অন্তত আট জায়গায় তিনি বসবাস করেছেন।

ওই মামলায় ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত অপর চার জঙ্গিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তাদের ব্যাপারে পুলিশের কাছে কোনো তথ্যও নেই।

পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

উল্লেখ্য, ২০০০ সালের ২২ জুলাই কোটালীপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান সরকারি আদর্শ কলেজ মাঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভার প্যান্ডেল তৈরির সময় শক্তিশালী একটি বোমা পাওয়া যায়। সেনাবাহিনীর একটি দল মাটি খুঁড়ে ৭৬ কেজি ওজনের ওই বোমা উদ্ধার করে। পরদিন ২৩ জুলাই ৪০ কেজি ওজনের আরেকটি বোমা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কোটালীপাড়া থানায় প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টা, হত্যার ষড়যন্ত্র-রাষ্ট্রদ্রোহ ও বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তিনটি মামলা করে পুলিশ।

গত বছরের ২৩ মার্চ ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর আদালত বিস্ফোরক আইনের মামলায় ১৪ জঙ্গির প্রত্যেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বলা হয় ‘ফায়ারিং স্কোয়াডে’ বা গুলি করে। আসামিরা সবাই জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) সঙ্গে সম্পৃক্ত। রায়ের সময় ৯ জঙ্গি কারাগারে ছিল।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৪ আসামি হলেন মফিজুর রহমান ওরফে মহিবুল্লাহ, আনিসুল ইসলাম ওরফে আনিস, মাহমুদ আজহার, রাশেদুজ্জামান ওরফে রাশেদ খাঁ, সরোয়ার হোসেন মিয়া, তারেক হোসেন ওরফে মারফত আলী, আবদুল ওয়াদুদ মোল্লা, আজিজুল হক, লোকমান, ইউসুফ ওরফে মোসহাব মোড়ল, শেখ মোহাম্মদ এনামুল হক, মোসাহেব হাসান ওরফে রাশু, আমিরুল ইসলাম ও রফিকুল ইসলাম। আসামিদের মধ্যে চারজন এখনো পলাতক। তারা হলো লোকমান, ইউসুফ, এনামুল ও মোসাহেব।

এর আগেই এই মামলার আসামি হুজিপ্রধান মুফতি হান্নানের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয় সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর বোমা হামলার মামলায়।

পলাতক পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। এর মধ্যে মো. আজিজুল হক ও মো. এনামুল হক নামের দুই জঙ্গির বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সংশ্লিষ্ট থানায় এখন পর্যন্ত পৌঁছেনি।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় পৌঁছানোর বিষয়ে কোর্ট পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তারের আদেশ হলে সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করে আসামির জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডাকযোগে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পুলিশের মাধ্যমে যায় সংশ্লিষ্ট থানায়।  এই প্রক্রিয়ার মাঝপথে ওয়ারেন্ট নানা কারণে হারিয়ে যেতে পারে। পোস্ট অফিস থেকে হারানোর আশঙ্কা বেশি থাকে। আবার অনেক সময় স্মারক নম্বর ভুল হওয়ার কারণে হতে পারে।

যে দুই আসামির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সংশ্লিষ্ট থানায় পৌঁছেনি তাদের মধ্যে অন্যতম আজিজুল হককে ১ মার্চ রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। তার বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায়।

তবে আজিজুল ও তার পরিবারের বিষয়ে কোনো তথ্যই নেই তার স্থায়ী ঠিকানা গাজীপুরের শ্রীপুর থানায়। ফলে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত আট জায়গায় বসবাস করেছেন তিনি। সিটিটিসি সূত্র জানায়, ঘটনার পরই আজিজুল চলে আসেন ঢাকায়। পরে নেত্রকোনা, এরপর আবার ঢাকার খিলক্ষেতে, সেখান থেকে টঙ্গী, পরে পুরান ঢাকার বাংলাবাজার, কেরানীগঞ্জ, আবার ঢাকার খিলক্ষেত ও নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন ছদ্মবেশে ছিলেন। এ সময়ে ড্রাইভিং ও ব্যবসা করেছেন। পলাতক থেকেই ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর নাম বদল করে ড্রাইভিং লাইসেন্স করেছেন। ২০০৮ সালে করেছেন জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)। পাসপোর্ট করে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর জেলার শ্রীপুর থানার টাকাভিটা পাড়া (উঁচা ভিটা) গ্রামের এস এম রিয়াজউদ্দিনের ছেলে মো. আজিজুল হক রানা ওরফে শাহনেওয়াজ ওরফে রুমান। তার বাবা সাধারণ কৃষক। দুই ভাইবোনের মধ্যে বড় আজিজুল। তার বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রীপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ ইমতিয়াজ ২ মার্চ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘থানায় এখন পর্যন্ত আজিজুল হকের বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আদালত থেকে আসেনি। ফলে আমরা তার বিষয়ে কিছুই জানতাম না।’ এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের যারা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পুলিশ স্টেশনে পাঠায় তারা বলতে পারবে। আদালত যখন পাঠাবে পুলিশ সুপারের মাধ্যমে আমরা পাব। আদালত পাঠায়নি, সেহেতু আমরা পাইনি।’

আরেক পলাতক আসামি শেখ মো. এনামুল হকের বিষয়েও কোনো তথ্য নেই তার স্থায়ী ঠিকানা কোটালীপাড়া থানায়। এখন পর্যন্ত তার নামে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ওই থানায় যায়নি। এনামুলের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া থানার দোরাব গ্রামে। তার বাবার নাম আব্দুল মজিদ শেখ।

এনামুলের বিষয়ে কোটালীপাড়া থানার ওসি মো. জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যত দিন পর্যন্ত আসামি গ্রেপ্তার না হবে বা মারা না যাবে তত দিন পর্যন্ত ওয়ারেন্ট থানাতেই থাকবে। তবে আমাদের থানায় শেখ মো. এনামুল হক নামে কারও বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আসেনি। অন্য কোনোভাবে অন্য কোথাও ওয়ারেন্ট গিয়েছে হয়তো অথবা কোর্ট থেকে অনেক আগেই জামিন নিয়ে অন্য কোথাও গেছে সে।’

পলাতক আরেক আসামি মো. মোসহাব হাসান ওরফে রাশুর বাড়ি ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার দক্ষিণ আলীপুর গ্রামে। তার বাবার নাম গোলাম কাইয়ুম। তার বিষয়ে কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আব্দুল গাফফার ২ মার্চ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার বিষয়ে আমরা অবগত আছি। থানায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও আছে।’ মোসহাবের পরিবারের কেউ বাড়িতে থাকে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের তথ্য আমার কাছে আপাতত নাই।’  

মো. লোকমান নামের আরেক আসামির বাড়ি খুলনার রূপসা থানার রহিমনগর রিফিউজি কলোনিতে। তার বাবার নাম আব্দুল কুদ্দুস শেখ। তার বিষয়ে থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তর বলেন, ‘লোকমানের বিরুদ্ধে থানায় ওয়ারেন্ট আছে। ঘটনার পর থেকেই তার পরিবার এখন আর এ এলাকায় থাকে না। আমরা তাকে ধরার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, ‘লোকমান পরিবার নিয়ে রিফিউজি কলোনিতে থাকত। তাদের ঘরটি এখন পরিত্যক্ত।’

মো. ইউসুফ ওরফে আবু মুসা হারুনের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল থানার দর্পনারায়ণপুর গ্রামে। তার বাবার নাম আব্দুল হামিদ মোড়ল। তার বিষয়ে রামপাল থানার ওসি মোহাম্মদ সামসুদ্দিন বলেন, ‘ইউসুফের নামে ওয়ারেন্ট থানায় রয়েছে। আমরা তাকে খুঁজছি। কিন্তু সে ঘটনার পর থেকে আর এলাকায় আসেনি। কিছুদিন আগেও একটি গোয়েন্দা শাখা থেকে আমাদের কাছে তার বিষয়ে জানতে চায়। আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি সে এলাকায় নাই।’

পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনাকারী সিটিটিসির অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. তৌহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত আছে।’