পায়রায় সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ২১ মার্চ

দেশের প্রথম আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল ও সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা আগামী ২১ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। পটুয়াখালীর পায়রাতে ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এই কেন্দ্রটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিত থেকে উদ্বোধন করার কথা রয়েছে বলে তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। করোনাকালে উন্নয়ন প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয় থেকে ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করতেন। পায়রা সরেজমিন উদ্বোধন করলে কার্যালয়ের বাইরে গত দুই বছরের মধ্যে এটাই হবে তার প্রথম কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ ও চীন সরকারের সমান মালিকানা রয়েছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে।

পায়রা কেন্দ্রটি চালু হওয়ার আগে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে। মেঘনা পাওয়ার লিমিটেড (এমপিএল) নামের এই কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৪৫০ মেগাওয়াট। দেশে সামগ্রিকভাবে গত ১৩ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, বেড়েছে নতুন নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল ২৭টি, আর গত ১৩ বছরে ১৪৮টি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। এতে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা ৪৯৪২ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২২০০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে।

পায়রা কেন্দ্র উদ্বোধনের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের কারণেই বিদ্যুৎ ঘাটতির বাংলাদেশ থেকে আমরা এখন বিদ্যুৎ স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশের দিকে যাচ্ছি। এক সময় ঢাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হতো, সেসব এখন ইতিহাস। বিদ্যুৎ বাংলাদেশের উন্নয়নকে ভিন্নমাত্রায় নিয়ে গেছে। পায়রার মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের উন্নয়নের এই অগ্রযাত্রাকে আরও বহুদূরে নিয়ে যাবে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার যে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি করেছে, তার মধ্যে সবার আগে উৎপাদনে এসেছে পায়রা। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগের রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট। এই কেন্দ্রটি গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে উৎপাদনে আসার কথা থাকলেও এখনো তা হয়নি। এছাড়া কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে জাপানের অর্থায়নে সরকারি সংস্থা কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের জুনে চীন সফর করেন। ওই সফরে সরকারের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল) ও চীনা সরকারি প্রতিষ্ঠান সিএমসির যৌথ মালিকানায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎখাতে বিনিয়োগ চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের উপস্থিতে এ চুক্তি সই হয়। ২০১৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল) নামে একটি কোম্পানির নিবন্ধন হয়। বিসিপিসিএলে বাংলাদেশ ও চীনের সমান মালিকানা রয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পায়রাতে প্রতিটি ১৩২০ মেগাওয়াটের করে মোট ২৬৪০ মেগাওয়াটের দুটি কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি করে ইউনিট থাকবে। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। নির্মাণ ব্যয়ের এই অর্থ দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে বিসিপিসিএলের সঙ্গে ২০১৬ সালের মার্চে ইপিসি (প্রকৌশল, আহরণ ও নির্মাণ) চুক্তি হয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠান সিইসিসি ও এনইপিসির। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম দুটি ইউনিট নির্মাণে খরচ পড়েছে প্রায় ১২ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম দুটি ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে। বাকি ১৩২০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০২৪ সালে শুরু হওয়ার কথা। এ কেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লা আসছে ইন্দোনেশিয়া থেকে। ৬৬০ মেগাওয়াটের প্রতিটি ইউনিটের জন্য দৈনিক ৬ হাজার টন কয়লার প্রয়োজন হয়।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা কয়লা দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম গড়ে ইউনিটপ্রতি সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় টাকা পড়ছে। সঞ্চালন লাইন নির্মাণ না হওয়ায় কেন্দ্রটি পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রথম দুটি ইউনিটের মোট ১৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার মধ্যে উৎপাদন করা হচ্ছে গড়ে ৬০০ মেগাওয়াট। এই বিদ্যুৎ পায়রা থেকে গোপালগঞ্জে যাচ্ছে। সেখান থেকে তা আবার আশপাশের জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।  গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার আমিনবাজার পর্যন্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একটি লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। যার কাজ শেষ হলে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হবে।

৯৯.৮৫ শতাংশ ঘরে বিদ্যুৎ!

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, ১৩ বছর আগে ২০০৯ সালে দেশে ২৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছিল। আর এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৪৯৪২ মেগাওয়াট। গত ১৩ বছরের মধ্যে দেশে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে ১৪৮টি। এতে বেড়েছে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতাও, বর্তমানে সেটি ২২০০০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে পায়রা সব থেকে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র। এক যুগ আগে যেখানে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো গড়ে ৩০০০ থেকে ৩৫০০, এখন তা বেড়ে ১২০০০ থেকে ১২৫০০ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের ২৭ এপ্রিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৩৭৯২ মেগাওয়াট।

 গত ১৩ বছরে ৩ কোটি ১১ লাখ নতুন গ্রাহক বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছেন। এর ফলে দেশের ৯৯.৮৫ শতাংশ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। ২০০৯ সালে দেশের ৪৭ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল। এই সময়ে বেড়েছে বিদ্যুতের মাথাপিছু ব্যবহারও, যা প্রায় ৩৪০ শতাংশ। যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এই হার ছিল মাত্র ৪৭ শতাংশ। এই ১৩ বছরে বিদ্যুতের সিস্টেম লসও কমেছে। ২০০৯ সালে সিস্টেম লস ছিল ১৪.৩৩ শতাংশ, বর্তমানে যা ৮.৪৮ শতাংশ।

আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যালের ক্লাবে বাংলাদেশ : পায়রায় কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল ক্লাবে প্রবেশ করে ২০২০ সালেই। এশিয়াতে বাংলাদেশ আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল ক্লাবের সপ্তম সদস্য। দক্ষিণ এশিয়াতে বাংলাদেশ ছাড়া শুধু ভারতে এ ধরনের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে।

এশিয়ার চীন, তাইওয়ান, জাপান ও মালয়েশিয়াতে আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির কেন্দ্রগুলোতে চীন ও বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশগুলো ঢাকনাযুক্ত কোল ইয়ার্ড ব্যবহার করে না। ঢাকনাযুক্ত কোল ইয়ার্ড ব্যবহারের ফলে বাতাসের মাধ্যমে খোলা কয়লা থেকে কয়লার গুঁড়ো ছড়ানোর সুযোগ কমে যায়।

এনডব্লিউপিজিসিএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিসিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ এম খোরশেদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পায়রার মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন, সেটি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপের কারণেই সম্ভব হয়েছে। দুনিয়াতে আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি যে আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তিতে ভালো প্রকল্প করার সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে। পায়রা এখন আমাদের গর্ব।’