সম্পূর্ণ টিকা পেল দেশের অর্ধেক মানুষ

দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষকে করোনার দুই ডোজ বা সম্পূর্ণ টিকা দিয়েছে সরকার। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ মানুষ। আর লক্ষ্যমাত্রার জনসংখ্যার মধ্যে সম্পূর্ণ টিকার আওতায় এসেছে ৭৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেয়েছে খুলনা বিভাগের এবং মেহেরপুর জেলার মানুষ। সবচেয়ে কম পেয়েছে সিলেট বিভাগের এবং সুনামগঞ্জ ও গাইবান্ধা জেলার মানুষ। দ্বিতীয় ডোজ বেশি দেওয়া হয়েছে সিনোফার্ম টিকা ও কম দেওয়া হয়েছে জনসন অ্যান্ড জনসন টিকা। গত বছর ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে করোনা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এর আগে সে বছরের ২৬ জানুয়ারি পরীক্ষামূলক টিকাদানের মধ্য দিয়ে দেশে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন হয়। পরে ৮ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সে হিসেবে দ্বিতীয় ডোজ শুরুর এক বছরের মধ্যে অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ টিকার আওতায় আনতে পারল সরকার।

এর মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ টিকার (জন হিসাবে) বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশ আট নম্বরে উঠে এসেছে। এ তালিকায় বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে পাকিস্তান ও তার ওপরে ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও ওপরে, তিন নম্বরে। এখানেও বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। তবে মোট জনসংখ্যা অনুপাতে বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১১৮ নম্বরে।

এমন অবস্থায় সরকার গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এক দিনে এক কোটি টিকার দেওয়ার লক্ষ্যে গণটিকা কর্মসূচি নেয়। পরে কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক ভিড় হলে আরও দুদিন সময় বাড়ানো হয়। সেই প্রথম ডোজের গণটিকা কর্মসূচির দ্বিতীয় ডোজ ২৮ মার্চ থেকে শুরু করতে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও তিন দিন সারা দেশে দ্বিতীয় ডোজ পাবে মানুষ।

সম্পূর্ণ টিকাদানে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর এবং কভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ডা. শামসুল হক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বিতীয় ডোজ টিকায় বাংলাদেশ অবশ্যই ভালো করেছে। সামনে দ্বিতীয় ডোজের আরেকটি ক্যাম্পেইন রয়েছে। সেটা হলো সম্পূর্ণ টিকায় আরও এগিয়ে যাবে দেশ।’ তিনি বলেন, ‘আগামী ২৮, ২৯ ও ৩০ মার্চ দ্বিতীয় ডোজের গণটিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচিতে গত মাসে যেটা প্রথম ডোজ হয়েছে, তারা দ্বিতীয় ডোজ পাবে। মোটামুটি আমাদের অবস্থা বেশ ভালো। আজ (গতকাল) পর্যন্ত যে পরিমাণ মানুষ প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছে, তাদের ৮০ শতাংশই দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে।’

২৮ মার্চ থেকে সর্বশেষ প্রথম ডোজের তিন দিনের গণটিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া শুরু হবে জানিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘তিন দিন চলবে। প্রথম ডোজের মতো একইভাবে সারা দেশে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে। তিন দিনের মধ্যে গণটিকার প্রথম ডোজের সবাইকে দ্বিতীয় ডোজের আওতায় আনতে কেন্দ্র বিন্যাস্ত করা হবে। যেমন সাভারে এক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কেন্দ্র রাখলে ভিড় বেড়ে যায়। এজন্য পাশের একটি স্কুলকেও কেন্দ্র করা হবে। এভাবে সারা দেশে যেসব কেন্দ্রে ভিড় বেশি, সেখানে কেন্দ্র ও বুথ বাড়ানো হচ্ছে। প্রত্যেক কেন্দ্রে পাঁচ হাজারজনকে টিকা দেওয়া হবে।’

সম্পূর্ণ টিকা পেল অর্ধেকের বেশি মানুষ : সরকারি হিসাবে দেশে মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৭ জন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ বা ১১ কোটি ৯২ লাখ ২১ হাজার ৯৫৪ জনকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৩ জনকে দ্বিতীয় ডোজ বা সম্পূর্ণ টিকা দেওয়া হয়েছে। সে হিসাবে মোট জনসংখ্যার ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ ও লক্ষ্যমাত্রার জনসংখ্যার ৭৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ মানুষকে সম্পূর্ণ টিকা দেওয়া শেষ হয়েছে।

বেশি টিকা খুলনা বিভাগে ও মেহেরপুর জেলায় : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সম্পূর্ণ টিকা সবচেয়ে বেশি পেয়েছে খুলনা বিভাগের মানুষ, ৫৬ দশমিক ৮ শতাংশ ও সবচেয়ে কম পেয়েছে সিলেট বিভাগের মানুষ, ৪৬ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে রাজশাহীর ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ, ঢাকার ৫২ দশমিক ১ শতাংশ, চট্টগ্রামের ৫১ দশমিক ২ শতাংশ, বরিশালের ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ, ময়মনসিংহের ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ ও রংপুরের ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে।

জেলার মধ্যে সম্পূর্ণ টিকা সবচেয়ে বেশি পেয়েছে মেহেরপুরের মানুষ, ৬৪ শতাংশ ও সবচেয়ে কম পেয়েছে সুনামগঞ্জ ও গাইবান্ধার মানুষ ৪১ শতাংশ করে। অন্যান্য জেলার মধ্যে কক্সবাজারের ৬৩ শতাংশ, জয়পুরহাটের ৬২ শতাংশ, চুয়াডাঙ্গার ৬১ শতাংশ, গাজীপুর ও রাজশাহীর ৬০ শতাংশ করে, ঢাকার ৫৯ শতাংশ, গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও খুলনার ৫৮ শতাংশ করে, নাটোরের ৫৬ শতাংশ, বাগেরহাট, মানিকগঞ্জ ও পঞ্চগড়ের ৫৩ শতাংশ করে, চট্টগ্রামের ৫১ শতাংশ ও মৌলভীবাজারের ৫০ শতাংশ মানুষ সম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে।

বেশি দেওয়া হয়েছে সিনোফার্ম টিকা : দেশে ছয় ধরনের টিকার মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ সবচেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছে সিনোফার্ম টিকা, ৫৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। এরপর ফাইজার ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ, অ্যাস্ট্রাজেনেকা ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, সিনোভ্যাক ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ, মডার্না ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ ও জনসন অ্যান্ড জনসন শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ।

বৈশ্বিক তালিকায় ৮ ও দক্ষিণ এশিয়ায় ৩ : বিশ্বের কোন দেশ কত মানুষকে দ্বিতীয় ডোজ বা সম্পূর্ণ টিকা দিয়েছে সে তালিকায় বাংলাদেশ আট নম্বরে রয়েছে। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপরে শীর্ষ সাতটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দিয়েছে চীন ১২৩ কোটি মানুষকে। এরপর ভারত ৮০ কোটি ৪ লাখ, যুক্তরাষ্ট্র ২১ কোটি ৫ লাখ, ব্রাজিল ১৫ কোটি ৬ লাখ, ইন্দোনেশিয়া ১৪ কোটি ৯ লাখ, পাকিস্তান ১০ কোটি ১ লাখ ও জাপান ১০ কোটি মানুষকে দুই ডোজ বা সম্পূর্ণ টিকা দিয়েছে।

অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তিন নম্বরে। বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। বাংলাদেশের নিচের দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান ৪ কোটি ২৮ লাখ, নেপাল ১ কোটি ৮২ লাখ, শ্রীলঙ্কা ১ কোটি ৪২ লাখ, ভুটান ৫ লাখ ৭৫ হাজার ও মালদ্বীপ ৩ লাখ ৭১ হাজার মানুষকে সম্পূর্ণ টিকা দিয়েছে।

গণটিকার দ্বিতীয় ডোজ ২৮ মার্চ : গত ২৬-২৮ ফেব্রুয়ারি তিন দিনের গণটিকা কার্যক্রমে প্রথম ডোজ নেওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে ২৮ মার্চ। এ ব্যাপারে বিভিন্ন হাসপাতাল ও কেন্দ্রগুলোকে এক চিঠিতে জানানো হয়, ২৬ ফেব্রুয়ারি যারা টিকা নিয়েছে তাদের এক মাস পূরণ সাপেক্ষে দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়া হবে। স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় যেভাবে প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া হয়েছিল, একইভাবে দেওয়া হবে দ্বিতীয় ডোজের টিকা। ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম ডোজের টিকাগ্রহণকারীদের টিকা কার্ডে সম্পূর্ণ তথ্য সংযুক্ত করতে হবে।

এর আগে প্রথম দফায় এক কোটি কার্যক্রমের সময় বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রচুর লোক সমাগম হয়। ফলে যেসব স্থানে জনসমাগম বেশি হয় সেখানে কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয় চিঠিতে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশে এক দিনে ১ কোটি ২০ লাখ ৬৩ হাজার ৬৫৩ ডোজ টিকা দেওয়া হয়। এ সময় টিকা নিতে মানুষের ব্যাপক সাড়া পড়ে।