আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে দেশে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আওয়ামী সরকারের আগের চালু করা কয়েকটি কর্মসূচির উদাহরণ টেনে সরকারের প্রধান বিরোধী পক্ষ বিএনপি বলেছে, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি শুভঙ্করের ফাঁকি, এতে জনগণ উপকৃত হবে না। বরং জনগণের টাকা লুটপাটের একটি আয়োজন।
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ও অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ভার্চুয়ালি সাংবাদিকদের জানান, ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য আগামী ৬ মাস থেকে ১ বছরের মধ্যে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের বাইরে থাকা প্রবাসীদের জন্যও একই সুযোগ রাখা হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের অনেক অর্জন, সেই অর্জনের সঙ্গে আজকে যুক্ত হলো আরও একটি অর্জন। সেটা হলো সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা। এই পেনশন ব্যবস্থা সবার জন্য।
এই ঘোষণার পর বিএনপি মহাসচিব এক অনুষ্ঠানে এই ব্যবস্থা চালুর পেছনে সরকার ও সরকারি দলের দুরভিসন্ধি আছে বলে মন্তব্য করেন।
দলটির নেতারা বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ আবার নতুন করে ‘প্রতারণা’র জাল বিস্তার করছে। সব খাতে লুটপাট চালিয়ে দেশকে ফোকলা করে দিয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকার এখন জনগণের পকেট কেটে টাকা নিতে সর্বজনীন পেনশনের মুলা দেখাচ্ছেন। আসলে এটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের সর্বশেষ ‘প্রতারণার একটা ফাঁদ’। কোনো ট্রাম্পকার্ড নয়।
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বরাবরই জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে জনগণকে তারা নানা প্রলোভন দেখায়। নির্বাচনের পর তারা সেগুলো ভুলে যায়। দেশের ভুক্তভোগী জনগণ তাদের কোনো কথা এখন বিশ^াস করে না। ভরসা রাখে না। তেমনি সর্বজনীন পেনশন প্রতারণার নতুন ফাঁদ।’ তিনি আরও বলেন, ‘১০ টাকা কেজি দরে চাল খাওয়ানোর কথা বলেছিল আওয়ামী লীগ। এখন ৭০ টাকা দরে চাল কিনতে হচ্ছে। সয়াবিন তেলের দাম প্রতিলিটার ২০০ টাকা। বিনামূল্যে কৃষক সার না পেয়ে আত্মহত্যা করছে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আওয়ামী লীগের এই প্রতারণার ইতিহাস নতুন নয়। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে তারা সবসময় নানা প্রতিশ্রুতির প্রলোভন দেখিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে লুটপাট করেছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে আওয়ামী লীগ মানুষকে গণতন্ত্র, মানবাধিকারসহ নানা স্বপ্ন দেখিয়েছে। এসব স্বপ্ন নিয়ে দেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন না করে গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছে। কয়েক লাখ মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেছে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এখন ২০০৮ সালে অবৈধ ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দিন সরকারের সহযোগিতায় ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় গিয়ে যখন দেখল জনগণ আর তাদের ভোট দেবে না, তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিধান করে সম্পূর্ণ নিজেদের প্রয়োজনে। এরপর থেকে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ একতরফা নির্বাচন করে, যে নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসেন। এরপর ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে দিনের ভোট আগের রাতে করে ক্ষমতা দখল করে।’
সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপির ইতিহাস জনগণকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ইতিহাস। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাকশাল থেকে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার সুযোগ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যান। ক্ষমতায় গিয়ে জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজেদের রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে দেশকে ফেরান।’
বিএনপি নেতারা বলছেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়ার কথা বলেছে। এখন এসে তরুণদের বলছে উদ্যোক্তা হতে। এই প্রসঙ্গে তারা গত ৫ ডিসেম্বর নবম জাতীয় এসএমই পণ্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তরুণদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্য তুলে ধরেন।
সর্বজনীন পেনশনের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসার পেছনে রহস্য আছে বলে দাবি করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘একটি বাহিনী এবং তার সাবেক ও বর্তমান প্রধানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে সরকার লবিস্ট নিয়োগ করেছে। সেখানে অনেক টাকা দিতে হবে। সে জন্য সরকারের এখন টাকা দরকার। তেল, গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও টাকার সংস্থান হচ্ছে না। তাই এখন জনগণের পকেট কেটে নেওয়ার জন্য সর্বজনীন পেনশনের কথা বলছে। এগুলো আসলে কিছু না। জনগণের সামনে মুলা ঝুলাচ্ছে।’