আমিরাতের বড় মাপের বিনিয়োগ চান প্রধানমন্ত্রী

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কগুলোতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, খাদ্যপণ্য এবং  তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক বাজার এখন উন্নত বেসরকারি ইকুইটি ও ফিন-টেক সমাধান দিতে প্রস্তুত রয়েছে। প্রায় ১২ বছর আগে আমরা যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, এখন তা বাস্তবে পরিণত হয়েছে। আমি এজন্য আপনাদের আমাদের অংশীদার হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’ স্থানীয় সময় বুধবার বাংলাদেশ ও আমিরাতের ব্যবসায়ীদের আয়োজিত এক যৌথ ব্যবসা পরিষদে (জেবিসি) ভার্চুয়ালি দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। খবর বাসস।

এদিকে ঢাকায় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিনটি সুপারিশ করেছেন শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩৬তম আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে এই সুপারিশগুলো পেশ করেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বিনিয়োগের ভালো গন্তব্য উল্লেখ করে বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে তার সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আপনাদের সবাইকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় সুযোগ লাভের দেশ।’

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ একটি চমৎকার ভূ-কৌশলগত অবস্থান এবং সকল প্রধান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ রুটের সাথে সরাসরি যুক্ত।’

তিনি বলেন, ‘আমরা জনবহুল ও ক্রমবর্ধমান দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মিলনস্থলে রয়েছি। আমাদের একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার তো রয়েছেই। পাশাপাশি আমাদের নিকটবর্তী অনেক দৃশ্যত সম্ভাবনাময় বাজার রয়েছে।’   

তিনি বলেন, এই সব সুবিধা বাংলাদেশকে বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে এবং আমাদের দেশ এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ পণ্য উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

আমাদের নীতি হচ্ছে ‘সকলের সাথে মিত্রতা, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এই নীতিই আমাদেরকে মুক্তবাজার বাণিজ্য ও একটি স্বাধীন অর্থনীতির সব প্রতিবন্ধকতা থেকে আমাদের পৃথক করে রেখেছে। আজকের বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। আমরা চামড়া, পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটজাত দ্রব্য, খাদ্য ও সবার ওপর আইসিটি ও আইটিইএসে (আইটি এনাবলড সার্ভিসেস) ভালো ও দক্ষ।’

বাংলাদেশের ৬৫০ হাজারের বেশি ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপার রয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, এছাড়া বাংলাদেশ উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেটের জন্য পূর্ণ স্পেকট্রাম পাচ্ছে।

তিনি বলেন, এখানে একটি বিষয় না বললেই নয়, বাংলাদেশের জনশক্তি আমাদের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এরা কঠোর পরিশ্রমী, সাশ্রয়ী শ্রমিক এবং এরা দ্রুত কাজ শিখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও আমাদের হাই-টেক পার্কগুলো এখন প্রস্তুত রয়েছে। আমরা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশকে তাদের নিজ দেশ হিসেবে বেছে নিতে, বিশ্বের সবচেয়ে ভালো দেশ হিসেবে তুলে ধরতে নীতিগত ও অবকাঠামো উভয় ক্ষেত্রেই তাদের সহায়তা দিতে প্রস্তুত আছি।’

শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতু, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দর, ঢাকা মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প এবং এ ধরনের মেগা প্রকল্পগুলো বাংলাদেশে অবকাঠামোগত বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।

শেখ হাসিনা বলেন, কৃষিতে তার সরকারের ব্যাপক ও নানা ধরনের উদ্ভাবন, কৃষি সম্প্রসারণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্সের কারণে বাংলাদেশের শ্রমাশ্রয়ী আয় অনেক দেশের তুলনায় দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।

এ সময় দু’দেশের মধ্যে জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার জন্য এফবিসিসিআই এবং ইউএই চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট জসিম উদ্দিন এবং আবুধাবি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ মোহামেদ আল মাজরাউই নিজ নিজ পক্ষে স্মারকে স্বাক্ষর করেন।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, ইউএইর বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী ড. থানি বিন আহমেদ আল জিওদি, এফবিসিসিআই প্রেসিডেন্ট জসিম উদ্দিন, আবুধাবি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ মোহামেদ আল মাজরাউই বক্তব্য রাখেন।

এদিকে খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩৬তম আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সুপারিশের প্রথম পয়েন্টে শেখ হাসিনা বলেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে কৃষি গবেষণা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো উচিত।’

দ্বিতীয় পয়েন্টে বলেছেন, জৈবপ্রযুক্তি, ন্যানোপ্রযুক্তি এবং রোবটিক্সের মতো প্রযুক্তি কৃষি খাতে উচ্চ প্রযুক্তির হস্তান্তর ও বিনিময়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের ফাও’র সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জোরদার করতে হবে।

চূড়ান্ত পয়েন্টে তিনি বলেন, ‘যেহেতু আধুনিক কৃষির জন্য প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন সেজন্য কৃষি খাতে অর্থায়ন ও সহায়তার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে।’

বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো আঞ্চলিক ভার্চুয়াল হাই-ব্রিড ইভেন্ট আয়োজন করছে। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের সভাপতিত্বে সম্মেলনে ফাও মহাপরিচালক কিউ দংইউ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম  রেজাউল করিম বক্তৃতা করেন।