১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বাঙালির যুদ্ধবিজয় স্বাধীনতা। আজাদি। অত্যাচারিত এবং গণহত্যা, নারী ধর্ষণের শিকার বাঙালির পলাতক জীবন পর্ব শেষে বাস্তুভিটায় ফিরে আসার দিন শুরু। ইতিহাসের পাতায় পাতায় এমন প্রত্যাগমনের অসংখ্য সাক্ষ্য রয়েছে। ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে ইহুদিদের প্রত্যাগমনের আখ্যান আছে। ইসলামে মহানবীর মাতৃভূমি ত্যাগ ও প্রত্যাগমন ধর্মপ্রাণ মানুষের মন বিচলিত করে। প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারত আর রামায়ণে পান্ডবদের কিংবা রামের বনবাস গমন এবং আপন রাজ্যে ফিরে আসার বিশাল আখ্যান ছড়িয়ে আছে। আসলে মানবজাতির স্বদেশ ত্যাগ এবং ফিরে আসা বা না আসা একটি প্রবণতা। প্রাচীন জনবিকাশ ধারা। আধুনিক ইতিহাস বড় নির্মম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে হিটলারের জার্মান নাৎসি বাহিনীর হাতে সারা ইউরোপের লাখ লাখ ইহুদিকে প্রাণ দিতে হয়। আত্মরক্ষার্থে ইহুদিদের জাহাজ বোঝাই করে আমেরিকায় পলায়ন মানবসভ্যতার নির্মম, নিষ্ঠুর কলঙ্ক। এটাও সত্য যে, আজকের আমেরিকার মহা-উত্থানের প্রাণশক্তিই যুদ্ধপলাতক ইহুদিরা। আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতার জন্ম-ইন্ধনও অনেক বিষয়ের মধ্যে সেই পুরাতন স্মৃতি।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিন ভূমিতে ইসরায়েল নামের ইহুদি রাষ্ট্রের সৃষ্টি পৃথিবীতে নতুন সংকটের উদ্ভব ঘটায়। ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটির ভূমি বিস্তার মোহ বিশ্বকে মহাসংকটে ফেলে দেয়। তারা জোর করে ফিলিস্তিন ভূমি দখল অব্যাহত রাখে। মিসর, জর্ডানের ভূমি দখল করে। বিশাল গোলান উপত্যকা বা গাজা অঞ্চলও দখলে নেয়। পরিণাম ভয়াবহ। লাখ লাখ ফিলিস্তিনির অনন্ত সময়ের উদ্বাস্তু জীবন শুরু। বিতাড়িত কেবল মুসলিম ফিলিস্তিনিরাই নয়, আদি খ্রিস্টানরাও। বিশ্বখ্যাত পান্ডিত্যের অধিকারী এডোয়ার্ড সাঈদের পরিবার এই পথেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হতে বাধ্য হয়। ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান মুক্তিযোদ্ধা জর্জ হাবাস কি সামান্য মানুষ? ফিলিস্তিনিরা যেন এক অভিশপ্ত জনগোষ্ঠী। বংশ পরম্পরায় উদ্বাস্তু শিবিরে তাদের জীবন কাটাতে হচ্ছে। জন্ম-জীবন-মৃত্যু। সবই ঘূর্ণাবর্ত হচ্ছে শিবিরে। দেশহারা এই জাতিকে নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিটা চলে ভালোভাবেই। তৈরি হয় অসংখ্য ভয়ংকর জঙ্গিগোষ্ঠী। বিশ্ব ত্রাস বর্তমানের আইএসও বা ইসলামিক স্টেটস তো ফিলিস্তিনি স্মৃতিবাহী। আফগানিস্তানের যুদ্ধটা কি করল? লাখ লাখ দরিদ্র আফগান পালিয়ে গেল মাতৃভূমি ছেড়ে। সেই দুই যুগ আগে। সীমান্তে পাকিস্তান ভূখন্ডে তৈরি হওয়া উদ্বাস্তু শিবিরে লাখ লাখ আফগান বাস করছে। শিক্ষা নয়, অস্ত্রশিক্ষা নিচ্ছে শিশুরা। কে জানে কবে এই দেশহারা হতভাগ্যরা মাতৃভূমিতে ফিরে আসবে! লজ্জা আর আক্ষেপ করলেও পূর্ববঙ্গে উদ্বাস্তুদের কথা কি গোপন করা যায়? ১৯৪৭-এ বাংলা ভেঙে যায়। আজ দুই হাজার বাইশ সাল। দীর্ঘ ৭৫ বছর। সাতচল্লিশের সেই উদ্বাস্তুরা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ওই যে পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের আজও জীবিত অংশ এবং বংশধররা পশ্চিমবঙ্গ এবং সুদূর দিল্লির কিংবা ওড়িশার শিবিরে বসবাস করছে। একাত্তরের যুদ্ধপলাতকদের সবাই কি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরল? কেন ফিরল না? উত্তর অজানা। কবি রাম প্রসাদ সেন রচিত এবং পান্নালাল ভট্টাচার্যের গাওয়া শ্যামা সংগীতের কথা মনে পড়ে, ‘দোষ কারো নয় গো মা... আমি পড়েছি অগাধ সলিলে।’
ঘর ছাড়া মানুষ, গ্রাম ছাড়া মানুষ মাস কিংবা বছরের পর বছর পালিয়ে আর আত্মগোপন করে এক দিন না এক দিন ঘরে ফিরছে। আগে পশ্চিমবঙ্গে যা করত সিপিএম, এখন ঠিক তাই করছে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস। রাজনীতির নামে, নির্বাচনের নামে অসংখ্য মানুষ বা পরিবারকে গ্রাম বা শহর ছাড়া করছে। আট-দশ বছর কেটে গেলেও তারা বাড়িঘরে ফেরেনি। কেউ কেউ বাধ্য হয়েছে শাসক দলের কাছে আত্মসমর্পণ করে অর্থদ- কাফফারা দিয়ে নতমুখে করজোড়ে ঘরে ফিরতে। এরই নাম রাজনীতি। শাসকরা কোনো দিন বিরোধী কণ্ঠ শুনতে চায় না। তারা চায় নতজানু নাগরিক। হাজার অত্যাচার, নির্যাতন আর শোষণ-শাসন সহ্য করার ক্ষমতা যাদের আছে তাদেরই চায় শাসকরা। প্রতিবাদহীন নির্বাক শত অত্যাচার সহ্যকারী নাগরিকরাই তো শাসকদের কাম্য জনতা। গ্রামে থাকো কিংবা শহরে থাকো শাসকদের আনুগত্যে একশতে একশ নম্বর পেতেই হবে। নয় তো গ্রাম ছাড়ো, শহর ছাড়ো, ফেরার নাম করবে না। কিন্তু আমরা যদি ভুলে যাই, স্মরণাতীত করে দিই হানাদার আক্রান্ত আমাদের মাতৃভূমির পলাতক মানুষের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দৃশ্যাবলি, তবে তো জাতীয় ইতিহাসের প্রতি তঞ্চকতা করা হয়। কি দেখল মৃত্যু আর অগ্নিগ্রাস থেকে বেঁচে যাওয়া অবরুদ্ধ দেশের সদ্যোমুক্ত স্বাধীন দেশের মানুষ? ঘর ছেড়ে এদিক-ওদিক ছুটে পালাল এবং দীর্ঘ ৯টি মাস জঙ্গলে-পাগাড়ে নিশিযাপনকারী ঘরে ফেরা মানুষ অকল্পনীয় দৃশ্যের সম্মুখীন হয়। তারা দেখে মুক্ত-স্বাধীন দেশের চারপাশের সীমান্তরেখা পেরিয়ে দলে দলে হাজারে-বিজারে জীবন্ত নরকঙ্কালেরা হেঁটে আসছে। কারা এরা? হ্যাঁ। ওরাই দেশ পলাতক আতঙ্কিত মানুষ। ভস্মীভূত জন্মভিটায় ফিরছে কোটি জনতা। ডিসেম্বরের শীত-ঠান্ডার কাল। উষ্কখুষ্ক চুল, মুখ-ভর্তি দাড়ি-গোঁফ, ময়লা দাঁত, গর্তে ডোবা চোখের মণি, হাত-পায়ের নখ লম্বা আদি মানব বা অর্ধমানব। মাথায় উকুন, শরীরে চাম উকুন, ছারপোকার কামড়ে চামড়া ক্ষতবিক্ষত। ওদের গায়ে জীর্ণছিন্ন রিলিফের কম্বল। নগ্নপদ তো বটেই বরং অর্ধ উলঙ্গ। কারও গায়ে লম্বা বেঢপ কোট, জামা। বোঝা যায় শ্বেতাঙ্গদের দেশের বাতিল পোশাক। মৃত শ্বেতাঙ্গের বর্জ্যবসন রিলিফের সাল। ওরা যখন সীমান্তের ওপারের শরণার্থীশিবির পরিত্যাগ করে জন্মভিটের উদ্দেশ্যে পা ফেলে, তখন দেশটা যুদ্ধবিধ্বস্ত কিন্তু স্বাধীন। কিন্তু জন্মমাটির উদ্দেশ্যে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য মানুষগুলো যখন সীমান্ত পেরিয়ে ছুটতে থাকে, তখন ক্ষুধার আগুন দাউ দাউ জ্বলতে থাকে। কোথায় খাদ্য? কোথায় পানীয়? রাস্তাঘাট মানুষের পদচিহ্নহীন। বিগত ৯ মাসে ঘাস আর জংলিগুল্মে পথঘাট প্রায় চিহ্নহীন। এদিক-ওদিক আগুনে পোড়া ভিটার পাশে উবু হয়ে কেউ বসে আছে। বোঝা যায় ওরা ঘরফেরা মানুষ। গণহত্যায় প্রিয়জনহারা হতভাগ্য।
ঘরফেরাদের এই পদযাত্রা দীর্ঘ। প্রত্যেকের বুকের ভেতর অন্তহীন আশা থই থই করে। ৯ মাস আগে যে ঘর পরিত্যাগ করেছিল, তারা নিশ্চয়ই সেখানে দুনিয়ার সব সুখ, সব আনন্দ, সব নিরাপত্তা এবং অপার সুখনিদ্রা স্তূপাকারে জমে আছে। তাই ফেরার এই উন্মাদনা। কিন্তু কঙ্কাল কাফেলার ফেরার পথ তো গোলাপ আর রজনীগন্ধার বিছানা নয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন চারপাশে। পাকা সড়ক বিস্ফোরণে লন্ডভন্ড। কালভার্টগুলো ডিনামাইটে উড়ে গেছে। কোথাও যানবাহন নেই। সড়ক, মহাসড়ক, রেললাইন, রেলসেতু বিধ্বস্ত। তাতে কি! মানুষ তো ঘরে ফিরবেই। অথচ তারা ভুলে যায় গণহত্যা আর আগুনে পোড়া ভিটে ছেড়েই যে দেশত্যাগ করেছিল। দীর্ঘ দেশ বিচ্ছিন্নতা, জন্মভিটার বিচ্ছেদ যন্ত্রণা, শরণার্থীশিবিরের নরকবাস ক্ষণমুহূর্তের জন্য ভুলে যায়। জন্মদেশ আর মাটির অপার শান্তি স্মৃতি হয়ে তাদের চোখের ওপর বৃষ্টি ঝরায়। ঘরে ফেরাদের কারও পথ দুদিনের, কারও এক দিনের। ক্ষুধা এবং ক্লান্তি ভূতের ছায়ার মতো শরীরের ছায়া হয়ে সঙ্গে হাঁটে। কঙ্কাল যাত্রীদের কেউ নারী, কেউ পুরুষ এবং শিশু। কখনো ওরা নিশ্চুপ হাঁটে, কখনো নানা কথা বলাবলি করে। আচমকা কান্নার রোল ওঠে। কে কাঁদে? কেন কাঁদে? কেননা শরণার্থীশিবিরে কেউ হারিয়েছে স্বামী বা স্ত্রীকে, কেউবা দুগ্ধপোষ্য শিশু। হয়তো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা প্রিয়জন। কলেরা আর ম্যালেরিয়া কেড়ে নিয়েছে তাদের প্রাণ। তাই ফেয়ার পথে পরিবারের জনসংখ্যার হিসাব মেলে না। কারও পরিবারের সংখ্যাবৃদ্ধিও ঘটেছে। আবার দেখা যায় ঘরে ফেরা কোনো কোনো নারী গর্ভবতী। বিস্ময় এখানেই। শরণার্থীশিবিরের নরকবাস, কলেরা, মহামারী, ক্ষুধা কিংবা আধপেটা এবং পশুর মতো গাদাগাদি করে রাত্রিযাপনের ভেতর কি করে নারীরা গর্ভবতী হয়? নারী-পুরুষের শরীরী আমোদের সময় বা সুযোগ কোথায় ছিল? কীসের এত কামকাতরতা? একাত্তরের যুদ্ধকালে প্রায় এক কোটি বাঙালি দেশ ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে তাদের ঘরে ফেরার ঘটনাই জাতির ইতিহাসে একসঙ্গে এত মানুষের প্রথম স্বদেশ প্রত্যাগমনের অক্ষয় ঘটনা। আত্মরক্ষার্থে দেশ পলাতকদের সবাই স্বদেশে ফিরতে পারেনি। হানাদারদের হাত থেকে রক্ষা পেলেও শরণার্থীশিবিরের মহামারীর হাত থেকে ওরা রক্ষা পায়নি। দলে ফেরা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সংখ্যাহ্রাস প্রমাণ করে শরণার্থীশিবিরে কী ঘটেছিল। হানাদারকবলিত আতঙ্কিত মানুষের পলায়ন এবং প্রত্যাবর্তন ঘটনাটির স্থায়িত্বকাল মাত্র ৯ মাস হলেও এর অভিঘাত হাজার বছর। ওরা শরীরে বহন করে আনে অত্যাশ্চর্য এক গন্ধ। শরীরে একই সঙ্গে জন্ম এবং মৃত্যুর গন্ধে পথ হেঁটেছিল ওরা।
আমার জন্ম-গাঁয়ের প্রবীণ আনন্দ বাউল দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন একাই, ফিরেছেনও একা। কী হারিয়েছিলেন? চিরসঙ্গী একটি বেহালা। একতারা নয়, তিনি বেহালাবাদক বাউল। সবার শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার পাত্র ছিলেন তিনি। অন্যসব বাউলের মতো মতাদর্শী ছিলেন না তিনি। সাধন সঙ্গিনী ছিল। মৃত্যুর পর দ্বিতীয় কাউকে গ্রহণ করেননি। একাকী জীবন কাটিয়ে গেছেন। তিনি ছিলেন তান্ত্রিক বাউল। লালন কিংবা অন্য কারও গান গাইতেন না। তিনি গাইতেন দ্বিজদাস বাউল অর্থাৎ বৈকুণ্ঠ চক্রবর্তীর গান। ইংরেজি ভাষায় শিক্ষিত দ্বিজদাস ছিলেন জমিদারের নায়েব। বাংলা একাডেমি মুদ্রিত তার একটি ক্ষুদ্র জীবনীগ্রন্থ রয়েছে। দেশে ফেরা আনন্দ বাউলের একটাই দাবি ছিল জাতির পিতা যেন তাকে একটি বেহালা দান করেন। সেই বেহালাপ্রাপ্তি তার ঘটেনি। স্বাধীনতার দুই বছরের ভেতরই তার মৃত্যু ঘটে। আনন্দ বাউল একাত্তরের স্বাধীনতার কাছে রাজদন্ড চাননি, চাননি রাজপ্রাসাদ। তার প্রত্যাশা ছিল তুচ্ছ একটি বেহালা। সেই বেহালার আশাতেই স্বাধীন দেশে ফিরেছিলেন আনন্দ বাউল। দেশ তাকে ফিরিয়ে দিতে পারেনি জীবনের চিরসঙ্গী যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বেহালাটি। তুচ্ছ অখ্যাত একজন আনন্দ বাউলের কথা কারও স্মরণে থাকার কথা নয়। স্মরণ থাকার কথা ছিল যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে প্রত্যাগত হাজার-লাখো কঙ্কালের দীর্ঘ কাফেলার কথা। কিন্তু বাঙালি তা ভুলে গেছে। যুদ্ধটাকেই তো ভুলে গেছে! পঞ্চাশটি বছর কেটে গেছে। প্রত্যাগত একাত্তরের শরণার্থীদের সিংহ ভাগ মানুষই আজ বেঁচে নেই। মাতৃভূমির কাছে কী চেয়েছিল তারা? শত শত মাইল হেঁটে কঙ্কাল মানবরা ফিরে ছিল স্বাধীনতার কাছে। বেশি কিছু তো তারা চায়নি জননী জন্মভূমির কাছে? চেয়েছিল জীবনের নিরাপত্তা, চেয়েছিল গণতন্ত্র, চেয়েছিল মানুষ হিসেবে সম্মান, চেয়েছিল ক্ষুধামুক্তি। পেয়েছিল কি? আমাদের জানা হলো না। উত্তর অজানাই রয়ে গেল।
লেখক কথাসাহিত্যিক