ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের আশপাশের এলাকাগুলোতে গত কয়েক দিন ধরেই রুশ সেনাদের সঙ্গে ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের লড়াই হলেও কিয়েভের ভেতরে কোনো হামলা হয়নি। গতকাল সোমবার কিয়েভের একটি আবাসিক ভবনে রুশ গোলার আঘাতে দুজন নিহত হয়। দেশটির জরুরি সেবা কর্র্তৃপক্ষের উদ্ধৃতি দিয়ে খবরটি বিবিসি প্রকাশ করে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবা বিভাগ বলেছে, স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে ভবনটিতে হামলা হয়। এ ঘটনার পর দুজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। আহত তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জরুরি সেবা বিভাগ প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ৯ তলাবিশিষ্ট ওই আবাসিক ভবন থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। ভবনের বাসিন্দাদের উদ্ধারে মই ব্যবহার করছে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
কিয়েভের আন্তোনভ শহরের স্থানীয় প্রশাসন বলেছে, শহরটির একটি বিমান তৈরির কারখানায় গোলা হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। কিয়েভ শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্বে সিভিয়াতোশিন বিমানঘাঁটিতে আন্তোনভ বিমান কারখানাটি অবস্থিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, কারখানাটির ওপরে ধোঁয়া উড়ছে। তবে এ ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা যায়নি বলে উল্লেখ করেছে বিবিসি। আন্তোনভ প্রশাসন বলেছে, জরুরি সেবা বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে কাজ করছে।
কিয়েভে একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে। সে সময় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছে এবং আরও ছয়জন আহত হয়েছে। স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে একটি বাসও ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আবাসিক ভবনে আগুন ধরে গেছে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবা জানিয়েছে, রাজধানী কিয়েভের কুরেনিভকা জেলায় দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি ভূপাতিত করেছে। তবে দুর্ঘটনার সময় বাসটিতে কোনো যাত্রী ছিল না বলে নিশ্চিত করা হয়। ইউক্রেনে টানা ১৯ দিন ধরে সংঘাত চলছে।
দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মারিওপোলে প্রায় ২ হাজার ২০০ বাসিন্দা নিহত হয়েছে। নিহতদের সবাই রুশ আক্রমণেই প্রাণ হারিয়েছে বলে দাবি করেছে শহর কর্র্তৃপক্ষ। গত রবিবার টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় মারিওপোল শহর কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর চালানো হামলায় রবিবার পর্যন্ত মারিওপোলের ২ হাজার ১৮৭ জন বাসিন্দা নিহত হয়েছে।’ কর্র্তৃপক্ষ বলছে, শহরটিতে কমপক্ষে ১০০ বোমা ফেলা হয়েছে। এছাড়া গত বুধবার শহরের শিশু ও প্রসূতি হাসপাতালে রুশ সেনাদের চালানো বোমা হামলায় ১৭ জন আহত হয়। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছে মস্কো। প্রায় ৫ লাখ বাসিন্দার মারিওপোল শহরটি দখল করা রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর অভিযানের শুরুর দিকের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটি আজভ সাগরে ইউক্রেনের কৌশলগত বন্দর এবং ডনবাস অঞ্চলে রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোর কাছে অবস্থিত। এএফপি বলছে, চলতি মাসের শুরু থেকেই কৌশলগত এই বন্দরনগরী রুশ সেনাদের অবরোধের মধ্যে রয়েছে এবং সেখানকার বাসিন্দারা খাবার ও পানির সংকটের মধ্যে রয়েছে। ইউক্রেনের সরকার ও অন্যান্য সাহায্য সংস্থা শহরের এই পরিস্থিতিকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করছে।
রাশিয়া ইউক্রেনের প্রধান প্রধান সব শহর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। একই সঙ্গে চীনের সহায়তা ছাড়াই ইউক্রেনে রাশিয়ার সব লক্ষ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট সামরিক শক্তি মস্কোর আছে বলে পশ্চিমাদের সতর্ক করে দিয়েছে দেশটি। সোমবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বেসামরিক জনগণের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রুশ ফেডারেশনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইউক্রেনের প্রধান প্রধান জনবহুল শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিচ্ছে না। ইউক্রেনের প্রধান কিছু শহর ইতোমধ্যে রুশ বাহিনী ঘিরে ফেলেছে। চীনের কাছে রাশিয়া সামরিক সরঞ্জামের সহায়তা চেয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দাবির ব্যাপারে জানতে চাইলে ক্রেমলিনের এই মুখপাত্র বলেন, রাশিয়া কারও কাছে সামরিক সহায়তা চায়নি।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, পরবর্তী আলোচনার সময় ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিদের অবশ্যই দুই দেশের প্রেসিডেন্টের মধ্যে বৈঠকের ব্যাপারে একমত হতে হবে। সোমবার তিনি এ কথা বলেন। জেলেনস্কি বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিধিদলকে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে তারা যেন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে বৈঠক আয়োজনের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করে। আমি নিশ্চিত, সবার প্রত্যাশা এটি। তাদের বুঝতে হবে, এটি জটিল বিষয় হলেও তা খুব জরুরি একটি উপায়।’ ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলের সদস্য ডেভিড আরাখামিয়া সংবাদ ওয়েবসাইট স্ট্রানাকে বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদলের মধ্যে অনলাইনে আরেক দফা আলোচনা শুরু হবে। স্থানীয় সময় গত রবিবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রেস সেক্রেটারি দিমিত্রি পেসকভও রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পেসকভ বলেন, দুই দেশের আলোচনা ভিডিও কনফারেন্সে হবে। ক্রেমলিনের বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনেস্কির উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক।
এদিকে ক্রেমলিনের প্রেস সার্ভিস শনিবার জানায়, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন সামনের দিনগুলোতে ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনলাইনে সিরিজ আলোচনায় বসতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
সাহায্য নিয়ে মুখোমুখি চীন-যুক্তরাষ্ট্র : ইউক্রেনে রাশিয়া তার বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে। তিন দিক দিয়ে স্থল, জল ও আকাশপথে শুরু হওয়া ওই হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও সরকারি দপ্তর কব্জায় নেয় রুশ বাহিনী। কিয়েভের আশপাশে একাধিক স্থানে হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনা ঘটলেও রাজধানী মূলত এখনো ইউক্রেনীয়রাই নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে একাধিকবার কিয়েভ ও মস্কোর মধ্যে বেলারুশ সীমান্তে বৈঠকও হয়েছে। বৈঠকগুলোর ফলাফল হলো যুদ্ধে মানবিক করিডর চালু করা। এর বাইরে যুদ্ধ বন্ধ সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। যুদ্ধের এমন অবস্থায় মস্কো পেইচিংয়ের কাছে অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা চেয়েছে বলে দাবি করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমস ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক টাইমস এই খবরটি প্রথম প্রকাশ করে।
ফিনান্সিয়াল টাইমস উল্লেখ করেছে, রাশিয়া ইউক্রেনে ব্যবহারের জন্য সামরিক সরঞ্জাম চাইছে চীনের কাছে। এমন সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যকে ব্যবহার করেছে। মস্কোর অনুরোধের পর চীন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে এমন ইঙ্গিতও দেখা হয় সংবাদমাধ্যমটিতে। এর বাইরে নিউ ইয়র্ক টাইমসের অন্য এক প্রতিবেদনেও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রভাব প্রশমিত করার জন্য পেইচিংয়ের কাছে অর্থনৈতিক সহায়তা চাইছে মস্কো। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান রোমে চীনের পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়াং জিচির সঙ্গে আলোচনা করেন। তবে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আলোচনার ফলাফল জানা যায়নি। সিএনএনকে জ্যাক সুলিভান বলেন, ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরুর আগে থেকে মস্কোর পরিকল্পনার বিষয়ে চীন সচেতন ছিল বলে বিশ্বাস করে ওয়াশিংটন। যদিও পেইচিং হয়তো রাশিয়ার পুরো পরিকল্পনাটি বুঝতে পারেনি। সুলিভান আরও বলেন, পেইচিং রাশিয়াকে ঠিক কতটা অর্থনৈতিক বা অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে কিনা সেটি ওয়াশিংটন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং তেমন কিছু ঘটলে (চীনের বিরুদ্ধে) পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
এসব প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেনগুই বলেন, ‘আমি কখনই এ রকম কিছু শুনিনি।’ তিনি জানান, ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অরাজক’ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে সব ধরনের গঠনমূলক উদ্যোগকে আমরা উৎসাহিত এবং সমর্থন করছি।’ চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এমন প্রতিবেদনকে যুক্তরাষ্ট্রের ছড়ানো ভুল তথ্য হিসেবে বলা হয়েছে। এমনকি রাশিয়াও জানিয়েছে, তারা যুদ্ধের জন্য কোনো সামরিক সহায়তা চায়নি পেইচিংয়ের কাছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই অভিযান পরিচালনার জন্য যে প্রয়োজন তা রাশিয়ার নিজেরই আছে। পরিকল্পনামাফিকই আমাদের সবকিছু এগুচ্ছে। পরিকল্পনামাফিকই নির্দিষ্ট সময়ে লক্ষ্য অর্জিত হবে।’
ইউক্রেনে অভিযান পরিচালনা শুরুর পর থেকে বিশেষ করে কিয়েভমুখী সেনাবহরে একাধিকবার ফুয়েল সংকটের খবর এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। এসব দাবি প্রসঙ্গে মস্কো থেকে বিশেষ কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করেন, রপ্তানিমুখী অর্থনীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়া অর্থনৈতিক ধাক্কায় পড়তে পারে। রাশিয়া থেকে অনেক বিদেশি কোম্পানি ইতিমধ্যেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।