জ্যোতিষী তত্ত্বে সংখ্যার একটি বিশেষ মূল্য ও তাৎপর্য রয়েছে। সারা বিশ্বে কমবেশি মানুষের মধ্যে সংখ্যাতত্ত্বের ওপর বিশ্বাস আছে। এ বিশ্বাসীরা ‘লাকি সেভেন’ ‘আনলাকি থার্টিন’সহ বিভিন্ন সংখ্যা বিশ্বাস করে এবং মেনেও চলে। সেভেন আর থার্টিন ছাড়া আরও একটি সংখ্যা মানবজীবনে জড়িয়ে আছে। সেই সংখ্যা হলো আলোচ্য ‘তিন’ অর্থাৎ থ্রি। মানবজীবনে ৩-এর আধিপত্য বিরাজমান। এ বিশ্বে যত দ্বন্দ্ব-সংঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘটনা ঘটছে, তার পেছনে রয়েছে তিনটি কারণ এক. ক্ষমতার লিপ্সা, দুই. সম্পদ, তিন. নারী। বলা হয়ে থাকে নারীর মন, লন্ডনের আকাশ আর ক্রিকেটের ভাগ্য এই তিনকে নাকি বুঝে ওঠা ভার। পার্থিব জীবনে মানুষ কোনোভাবেই তিনকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে পারে না। উন্নতি প্রগতি বিচ্ছেদ ক্ষমতা কুসংস্কার জীবন ও মরণে প্রতিটি বাঁকে বাঁকে যেন ৩-এর ছোঁয়া। জোকস, নীতিকথামূলক গল্প বা ঘটনাগুলো কখনো কখনো এভাবেই শুরু হয়। তিন বন্ধু, তিন ব্যবসায়ী, তিন সামরিক অফিসার, তিন ডাক্তার বা তিন রাজনীতিবিদের জীবনের কোনো ঘটনা দিয়ে। এমন অসংখ্য জোকস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। সেখান থেকে কয়েকটি জোকস তুলে ধরা হলো
এক. বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও আমেরিকান রিজার্ভ ব্যাংকের তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অর্থনৈতিক মন্দার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার বিষয়ে এক গোপন বৈঠক করার জন্য বিমানে উঠলেন। মিটিংয়ের ফাঁকে আমেরিকান রিজার্ভ ব্যাংকের কর্মকর্তা একটি ৫০ ডলারের নোট জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে বললেন, আমি অন্তত এক ব্যক্তিকে সুখী করতে পারলাম।
এরপর বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা ১০টি পাঁচ ডলারের নোট জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে বললেন, ‘আমি অন্তত ১০ ব্যক্তিকে সুখী করতে পারলাম।’ ওই বিমানের চালক তাদের কথাবার্তা শুনছিলেন। তিনি হঠাৎ তিনজনকেই বিমান থেকে নিচে ফেলে দিলেন আর চিৎকার করে বললেন, ‘আমি পুরো পৃথিবীকে সুখী করতে পারলাম।’
দুই. জার্মান, ব্রিটিশ ও আমেরিকান তিন সার্জন গল্প করছেন কে কত বড় দক্ষ সার্জন তা নিয়ে। প্রথমজন : এক লোকের হাতে তিনটা আঙুল কাটা পড়েছিল। আমি এমনভাবে জুড়ে দিলাম যে সে এখন দেশের সেরা স্প্যানিশ গিটার বাদক।
এবার দ্বিতীয় সার্জন বললেন : এ আর এমন কী! ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে এক লোকের দুটো পা কাটা পড়ে। আমি এমনভাবে তার পা ঠিক করে দিয়েছি যে, সে এখন দেশের সেরা দৌড়বিদ।
তৃতীয়জন বললেন : গাধায় চড়ে যাচ্ছিলেন এক লোক। ট্রাকের সঙ্গে অ্যাকসিডেন্টে লোকটার মাথা থেঁতলে গেল আর গাধার মাথা ছাড়া পুরো শরীরই থেঁতলে গেল। দুজনেই স্পট ডেড।
তারপর?
তারপর আমি ওই গাধার ব্রেনটা লোকটার মাথায় ঢুকিয়ে এমনভাবে সেট করে দিই যে লোকটা ফের বেঁচে ওঠে।
বলেন কী? সেই লোকটা এখন কোথায়? কী করছে?
সে-ই তো এখন আমাদের দেশের প্রেসিডেন্ট!
তিন. পশু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং একজন রাজনীতিবিদ এই তিন বন্ধু গ্রামে বেড়াতে গেছেন। পথে যেতে যেতে তাদের সন্ধ্যা হয়ে গেল। এ সময় এক চাষির বাড়িতে উঠলেন তারা। চাষি তাদের জানাল, তার ঘর খুব ছোট। সেখানে দুজন থাকতে পারবেন, একজনকে পাঁঠার ঘরে থাকতে হবে।
এ কথা শুনে পশু ডাক্তার বললেন, কোনো অসুবিধা নেই, আমি তো পশুরই ডাক্তার। কত গরু-ছাগলের চিকিৎসা করলাম। পাঁঠার ঘরে আমিই থাকব। কিন্তু রাতে দেখা গেল পাঁঠার গায়ের গন্ধ সহ্য করতে না পেরে দশ মিনিটের মধ্যেই ডাক্তার সাহেব বেরিয়ে এলেন।
এবার ইঞ্জিনিয়ার বললেন, আমার কোনো অসুবিধা নেই, আমি থাকতে পারব। কিন্তু দেখা গেল ইঞ্জিনিয়ার বিশ মিনিটের মাথায় পাঁঠার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
সবশেষে রাজনীতিবিদ গর্ব করে বলে উঠলেন, ধ্যাত ছাই! আপনাদের মতো লোকদের দিয়ে কোনো কাজই হবে না। আপনারা কোনো দিন দেশের মানুষের সেবা তো দূরে থাক, কোনো পশু-পাখিরও উপকার করতে পারবেন না। আমিই যাব। তিনি আর দেরি না করে পাঁঠার ঘরে ঢুকে গেলেন। রাজনীতিবিদ ওই ঘর থেকে আর বের হচ্ছেন না। সবাই তো অবাক! আধা ঘণ্টা পর পাঁঠাটাই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।
উন্নতবিশ্বে সবাইকে নিয়ে জোকস করা বা ব্যঙ্গচিত্র আঁকা যায়। সেখানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কেউ-ই বাদ যান না। ডোলাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকার সময়ই তাকে নিয়ে অসংখ্য জোকস করা বা ব্যঙ্গচিত্র আঁকা হয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশের ক্ষেত্রেই এমন উদাহরণ দেওয়া যাবে। এ ধরনের উদার গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা কমে গেলেও এখনো আছে। উন্নত বিশ্বের মতো এমন সংস্কৃতি আমাদের এখানেও ছিল। এক যুগ আগেও পাঠকের অন্যতম খোরাক ছিল রাজনৈতিক কার্টুন ব্যঙ্গচিত্র ক্যারিকেচার। এডিটোরিয়াল কার্টুনও খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
বাংলাদেশের দুই নারী নেত্রীর অসংখ্য কার্টুন ছাপা হয়েছে। শিশির ও হুদার কার্টুনের আলোচনা থাকত সবার মুখে মুখে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আর ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের কারণে পত্রিকার পাতা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে এডিটোরিয়াল কার্টুনসহ সব ধরনের কার্টুন ও ব্যঙ্গবিদ্রুপ রচনা। কার্টুন ব্যঙ্গ রচনার অনুপস্থিতিতে অনেকেরই আক্ষেপ আছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এডিটোরিয়াল কার্টুন ক্যারিকেচার স্যাটায়ারের প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি। সাংবাদিক কামাল আহমেদ তার কলামে লিখেছেন, ‘এখন অপেক্ষায় আছি দেশে এক দিন রাজনৈতিক ব্যঙ্গবিদ্রুপের উৎসব দেখব বলে। অন্যায়-অবিচার-প্রতিবাদের এ রকম উৎসব খুবই জরুরি। এটা সহিংসতার ঝুঁকিও দূর করে (প্রথম আলো ১৫-৬-২০২১)’। চলচ্চিত্র নির্মাতা ও রম্য লেখক জাঁনেসার ওসমান আক্ষেপ করে একটি সহযোগী পত্রিকায় লিখেছেন ‘উচ্চাঙ্গসংগীতের মতো কি এক দিন ব্যঙ্গচিত্রও দুর্লভ হয়ে যাবে।’
‘কার্টুন হলো এক ধরনের আঁকিবুঁকি। কার্টুনের ছবিগুলোর হাত-পা আছে, কিন্তু সে হাত-পা নাড়াচাড়া করতে পারে না। কাউকে আঘাত করার জোর কার্টুনের হাতে নেই। সেই হাত ঘুষি দিতে পারে না। লাঠি ধরতে পারে না যে কারও মাথায় বাড়ি দেবে। ছুড়ি চালাতে পারে না যে কারও বুকে বসাবে। সেই প্রাণহীন কার্টুনকে যখন কেউ ভয় করে, তখন বোঝা যায় তারা কতটা দুর্বল (কার্টুনের কথা, সৈয়দ আবুল মকসুদ, প্রথম আলো ২২-২-২০১১)।’
লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট
hindol_khan@yahoo.com