কভিড-১৯-এর মধ্যে ই-কমার্স খাতের জালিয়াতির কারণে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আগের থেকে ৭৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যবিনিময় করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
২০২০-২১ অর্থবছরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিএফআইইউর কাছে ১ হাজার ৪১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চেয়েছে; যা এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ৭৮৭টি।
গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স রুমে একটি মতবিনিময় সভাও আয়োজন করা হয়। বিএফআইইউ বলছে, করোনা মহামারীর মধ্যে ই-কমার্স খাতে জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের কারণে গোয়েন্দাদের সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সরবরাহ করা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, আলোচিত অর্থবছরে গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংস্থা থেকে বিএফআইইউর কাছে ৯২২টি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়।
এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ১১৪টি, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ৩৩৪টি, পুলিশের অন্যান্য শাখা ৪৪টি জালিয়াতির তথ্য চায় বিএফআইইউর কাছে।
এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১৭৫টি ঘটনায় ব্যাংকে কোনো ধরনের সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিএফআইইউকে চিঠি দেয়। আগের অর্থবছরে এ ধরনের তথ্য চাওয়া হয় ১৭টি ঘটনায়।
প্রসঙ্গত, দেশ থেকে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কাজ করা বিএফআইইউ একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হলেও এর জনবল সরবরাহ ও ওয়ার্ক স্টেশনের সহযোগিতা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন পরিলক্ষিত হলেই বিএফআইইউকে তথ্য দিয়ে থাকে।
২০২০-২১ অর্থবছরে এ ধরনের সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্টিং (এসটিআর) বা সন্দেহজনক কার্যক্রম রিপোর্টিং (এসএআর) বেড়েছে ৪৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। নগদ লেনদেন রিপোর্টিংও বেড়েছে।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত অর্থবছরে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, পুঁজিবাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও বৈদেশিক অর্থ আদান-প্রদানকারী মানি রেমিট প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ হাজার ২৮০টি সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য প্রতিবেদন (এসটিআর বা এসএআর) আকারে বিএফআইইউকে পাঠায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসটিআর ও এসএআর ছিল ৩ হাজার ৬৭৫টি। আলোচিত সময়ে যেসব এসটিআর বা এসএআর দাখিল করা হয়েছে তাতে ৭ হাজার সন্দেহজনক লেনদেনের ইঙ্গিত দেয় রিপোর্টিং এজেন্সিগুলো। এসব লেনদেনে আর্থিক পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেনের আর্থিক পরিমাণ ছিল ৯৫৫ কোটি টাকা।
তবে এর জন্য কেবল দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়াকে দোষ না দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও ব্যাংক কর্মীদের সচেতনতা বাড়ার বিষয়টি সামনে আনতে চান বিএফআইইউর প্রধান মাসুদ বিশ^াস। তিনি বলেন, আলোচিত অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন বাড়ার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তা কেবল দুর্নীতি বাড়ার কারণে হয়েছে এমন নয়। ব্যাংক কর্মীদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণেই মূলত সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে।
বিএফআইইউর তথ্যে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের আগস্ট মাসে এসটিআর ও এসএআর ছিল সবচেয়ে কম। ডিসেম্বরে এ ধরনের রিপোর্টিং সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসে। জানুয়ারিতে এসটিআর ও এসএআর কিছুটা কমলেও ২০২১ সালের জুনে তা আবার বেড়ে যায়।
এর থেকে বোঝা যায়, পঞ্জিকা বছর ও অর্থবছরের শেষ মাসগুলোতে সন্দেহজনক লেনদেন বেশি ঘটছে।
বিএফআইইউর প্রধান জানান, তারা যেসব সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করেন তার ২৬ শতাংশ আসে গণমাধ্যমের তথ্য থেকে।
বিএফআইইউর কার্যক্রমে রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগসহ সাধারণ জনগণের এবং দেশের বাইরের বিভিন্ন অংশীজনকে সম্পৃক্তকরণ ও অবহিতের জন্য একটি নিজস্ব ওয়েবসাইট করেছে। ৭ মার্চ ওয়েবসাইট উদ্বোধন করা হয়েছে, যেখানে পরিচয় গোপন করে যে কেউ অভিযোগ করতে পারবেন। সেটাকে গুরুত্বসহকারে দেখবে বিএফআইইউ।
মাসুদ বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা কানাডার বেগমপল্লী, মালয়েশিয়া এবং পিকে হালদার নিয়ে কাজ করেছি এবং এ বিষয়ে যথাযথ সংস্থাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম, বিএফআইইউর প্রোগ্রামার ইফতেখার মাহমুদ, যুগ্ম পরিচালক ইকরামুল হাসান প্রমুখ।
বিএফআইইউর প্রধান মাসুদ বিশ্বাস বলেন, ‘এ বছর আমরা বিএফআইইউর ২০ বছর পূর্তি উদযাপন করতে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে আমাদের মানি লন্ডারিং ব্যবস্থা বিশ^ব্যাপী সমাদৃত। তথ্যপ্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা এবং ঝুঁকির ধরন পাল্টেছে। আমরাও বিভিন্নভাবে সক্ষমতা বাড়িয়েছি।’
গত ৫ বছরের সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট করা হয় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে, সেবার লেনদেন ছিল ৩ হাজার ৮৭৮টি।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে বাংলাদেশে ২০০২ সালে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন জারি করা হয়। একই সঙ্গে ওই কার্যক্রম ফলপ্রসূ করতে ওই বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে। ২০১২ সালে বিভাগটিকে বিএফআইইউ নামে একটি স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে চালু করা হয়।
ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থ সম্পত্তির গোপন উৎস, তার অবৈধ ব্যবহার, মাদক চোরাচালান, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসসহ নানামাত্রিক অপরাধবিষয়ক অভিযোগ করতে পারেন যে কেউ। সেখানে পরিচয় গোপন রেখেই সব তথ্য জানানো যায়।