ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স দিচ্ছে প্রশিক্ষণ স্কুল

দেশে দক্ষ চালক তৈরির দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে টাকার বিনিময়ে ভুয়া লাইসেন্স তুলে দিচ্ছে প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে। প্রশিক্ষণ স্কুল অনুমোদন দেওয়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছ থেকেই এই ভুয়া লাইসেন্স পাওয়ার তথ্য পুলিশের একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণ স্কুলগুলোর বেশিরভাগেই দক্ষ প্রশিক্ষক নেই। কিন্তু লোকজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা।

সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের ওই গোপন প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র হয়ে সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে সারা দেশে বিআরটিএ অনুমোদিত প্রশিক্ষণ স্কুলগুলোর একটি তালিকাও যুক্ত করা হয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী, কেবল রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ৭৬টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় রয়েছে আরও ৬৩টি স্কুল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছেস্কুলগুলো নানা কৌশলে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে। বিআরটিএ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগ এই কারবার চালিয়ে আসছে। প্রতিবেদনের সূত্র ধরে দেশ রূপান্তর কয়েকটি স্থানে সরেজমিন ঘুরে এই অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃত কয়েক দালালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লাইসেন্স করে দেওয়ার জন্য একজন প্রশিক্ষণার্থীর কাছ থেকে অন্তত ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে সরকার নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে অনেকে রাস্তায় নামছে বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে। যেসব স্কুল চালকদের প্রশিক্ষণ দেয় তারা যদি ঠিকভাবে কাজ না করে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই জন্য প্রশাসন সক্রিয় আছে।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান হাফিজ আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ড্রাইভিং স্কুলগুলো প্রশিক্ষণের প্যাকেজ হিসেবে অনেক সময় লাইসেন্স করে দেওয়ার চুক্তি করে। এই সুযোগে বিভিন্ন অপরাধীচক্র লাইসেন্স করে নিচ্ছে। এর প্রমাণ আমরা পেয়েছি। নিয়মকে অনিয়মে পরিণত করে তারা। বিআরটিএ’র কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ ছাড়াই অদক্ষ ড্রাইভারদের লাইসেন্স তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে লাইসেন্স পাচ্ছেন অদক্ষ ড্রাইভার, আর দিন দিন বাড়ছে দুর্ঘটনা।’

বিআরটিএ’র কারা এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত জানতে চাইলে ডিবির প্রধান বলেন, ‘কয়েক কর্মকর্তার নাম আমরা পেয়েছি। তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিআরটিএ’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে।’      

ডিবির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার রাজীব আল মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স বাণিজ্যের সঙ্গে তুরাগের বিআরটির কয়েক কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বিআরটিএর কর্মকর্তারা জেনেশুনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য অবৈধ কাগজপত্র জমা নিতেন। তারা প্রত্যেকের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে যান-চালানোর পরীক্ষায় পাস করে দিতেন। তারপর এক মাসের মধ্যেই বিআরটিএর কর্মকর্তারা ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দিতেন। চক্রের সদস্যরা এ নিয়ে জালিয়াতি করা কাগজ বানিয়ে বিআরটিএ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, কিছুদিন আগে কয়েকজন দালালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, বিআরটিএ কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে সিলমোহরযুক্ত ও স্বাক্ষরিত পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট তৈরি করে সেগুলো দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করে আসছিলেন। সারা দেশে যেসব ড্রাইভিং লাইসেন্স স্কুল আছে এবং এদের অধিকাংশ এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ট্রাফিক পুলিশ ও বিআরটির গাফিলতি, উদাসীনতা ও অবহেলার কারণেই ঘটছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনা। কোনো চালকই আইন মানছেন না। বেপরোয়া গতিতে একে অপরকে টেক্কা দিতে গিয়েই প্রাণহানি ঘটাচ্ছে উদ্বেগজনক হারে। অনেক চালকের প্রশিক্ষণও নেই।

জানা গেছে, বিআরটিএকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে চালক প্রশিক্ষণ স্কুলের নিবন্ধন নেওয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৩৯টি প্রশিক্ষণ স্কুলের বেশিরভাগের ঠিকানা ভুয়া। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফুটপাতের রাস্তা দখল করে স্কুলের কার্যক্রম চালাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরও ওইসব স্কুল নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে। পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে ভুয়া লাইসেন্স তৈরি করতে বিআরটিএ কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্কুলগুলোর ওপর কোনো নজরদারি নেই। পুলিশের প্রতিবেদনে অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের নানা সীমাবদ্ধতাও অবশ্যই আছে। সড়কে এনফোর্সমেন্ট তো আমরাও করি, পুলিশও করে। আমরা তথ্য পেয়েছিপ্রশিক্ষণের নামে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে স্কুলগুলো।’

গত কয়েক দিনে ঢাকার কয়েকটি স্থানে দেখা গেছে, বিআরটিএ ও পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী বেশিরভাগ স্কুলের ঠিকানা নেই। ফুটপাতের ওপর ছোট টংঘর বসিয়ে নামকাওয়াস্তে যান চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১০ দালালকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, বিআরটিএর অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে অভিজ্ঞতা ছাড়াই মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভুয়া ঠিকানার কাগজপত্র দিয়ে ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স বানিয়ে দেওয়ার কাজ করেন তারা। প্রশিক্ষণ স্কুলগুলো এসব ব্যবস্থা করে দেয়। তাদের মধ্যে লিটন পাইক ও মিষ্টার দালাল অন্যতম। তাদের সঙ্গে স্কুল মালিকদের সুসম্পর্ক আছে।

এর আগে গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর বিআরটিএ কার্যালয় থেকে ১৩ দালালকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তারাও একই তথ্য দিয়েছেন।

উত্তরার একটি প্রশিক্ষণ স্কুলের কর্ণধার নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে জানান, বিআরটিএ ও পুলিশকে ম্যানেজ করেই চলতে হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী লাইসেন্সের ব্যবস্থা করে দেন তারা। এটি করতে অনেক জায়গায় টাকা দিতে হয়। যার কারণে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকেও বেশি টাকা নিতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, স্কুলের অনুমতি নিতে হলে একটি ঠিকানা ব্যবহার করতে হয়। পরে ওই ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেলে অনেকে। পুলিশকে ম্যানেজ করে ফুটপাতে ছোট ঘর তৈরি করে কেউ কেউ ব্যবসা চালাচ্ছে। আর এই জন্য প্রতিমাসে পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসনকে টাকা দিতে হচ্ছে।