একাত্তরের যোদ্ধারা

৬৫ সালের অস্ত্র প্রশিক্ষণ কাজে লেগেছিল মুক্তিযুদ্ধে

১৯৭০ সালে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় পেলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ইয়াহিয়া খান নানা টালবাহানা শুরু করেন। তখন থেকেই পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হতে থাকে। আমি তখন শ্রীপুর কলেজের ছাত্র। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মাগুরার শ্রীপুর, সাচিলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতে শুরু করি। দেশ যে চরম সংঘাতের দিকে যাচ্ছে সেটা ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণেই বুঝতে পেরেছিলাম।

‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে’ এ ভাষণের পরই মাগুরা জেলার আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নিয়মিত মিছিল-মিটিংয়ের মধ্য দিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষও সেসব মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিত। জনপ্রতিনিধি সোহরাব হোসেন, আসাদুজ্জামান সাহেবসহ শ্রীপুরের আকবর হোসেন চেয়ারম্যান, হাট দ্বারিয়াপুর সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কাজী ফয়জুর রহমান প্রতিদিন মাগুরার নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এরই মধ্যে ৭১-এর ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকায় শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব। হাজার হাজার বাঙালির ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ঢাকা তখন লাশের শহরে পরিণত হয়। আমরা যারা গ্রামে ছিলাম তারা কী করব বুঝতে পারছিলাম না। বেতারে শুধু পাকিস্তানি বাহিনীর হিংস্রতার খবর পেতে থাকি।

২৫ মার্চের পর জেলা শহর মাগুরা থেকে ফিরে এসে হঠাৎ কাজী ফয়জুর রহমান আমাকে বললেন, স্কুল মাঠে যুবকদের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করো। কথামতো শ্রীপুর থানার দ্বারিয়াপুর, সাচিলাপুর, তারাউজিয়াল, সোনাতুন্দি চৌগাছি, দুর্গাপুর, তখলপুর, রাজাপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৫০ জন যুবক নিয়ে সম্মিলনী স্কুল মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সেখানে প্রশিক্ষক ছিলেন তৎকালীন আনসার কমান্ডার আবদুর সালাম ও আবু হোসেন চয়ন এবং আমি নিজে। মাত্র একটি রাইফেল দিয়ে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছিলাম। এক মাস ধরে চলে প্রশিক্ষণ।

এর আগে ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম আমি। তখন কুষ্টিয়া মুসলিম হাই স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের স্কুল থেকে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ নিতে ইচ্ছুক এমন ১০০ ছাত্রকে প্রতিদিন দুপুরে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনসে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তিন মাস ধরে চলে সেই প্রশিক্ষণ। সেখান থেকেই মূলত অস্ত্র চালানো শেখা। ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার কাছে একটি এসএমজি এবং একটি থ্রি-নট থ্রি ছিল।

যুদ্ধ শুরুর পর আওয়ামী লীগ নেতা কমান্ডার আকবর চেয়ারম্যান মাগুরা ও এর আশপাশ এলাকায় মুক্তিবাহিনী গঠন করেন। আমরা তার বাহিনীতে যোগ দিয়ে সংগঠিত হতে থাকি। এরই মধ্যে আর্মি এসে ক্যাম্প করে শ্রীপুর থানা শহরে। এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমিসহ ১৬ জনকে নিয়ে একটি দল গঠন করি। আমাদের সাচিলাপুর এলাকা পাহারার দায়িত্ব ছিল। মাগুরা থেকে নাকোল হয়ে পাকিস্তানি আর্মিরা প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিক কমান্ডারকে খবর দেওয়া ছিল আমাদের দায়িত্ব। আর মাগুরার মুক্তিযোদ্ধাদের মূল ঘাঁটি ছিল খামারপাড়া বাজারে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পথে পথে ও ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছিলাম আমরা। কোথাও যুদ্ধের আগে আমাদের সংবাদ দিত, আমরা গিয়ে হাজির হতাম।

সম্মুখযুদ্ধের স্মৃতি : বেশ কয়েকটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা জুন মাসের। ওই মাসের এক দিন দুপুরে শ্রীপুরের কাজলি বাজারে হাটের দিনে ওই এলাকায় প্রথমে রাজাকাররা ঢোকে। তাদের পেছনে ছিল পাকিস্তানি বাহিনী। তবে আমাদের কাছে খবর ছিল শুধু ১৪ থেকে ১৫ জন রাজাকার বাজারে প্রবেশ করেছে। তাৎক্ষণিক আমতল এলাকায় অবস্থানরত ডেপুটি কমান্ডার নবুয়াত মোল্লার নির্দেশে আমরা ৭০ মুক্তিযোদ্ধা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রতিহতের প্রস্তুতি নিই। আমাদের একটি দল অবস্থান নেয় বাজারের পূর্ব পাশে মুচিপাড়ায় এবং আরেক দল উত্তর পাশে ক্যানেলের ওপর। আমরা ছিলাম বাজারের দক্ষিণ পাশে। আমাদের দলে ছিলাম পাঁচজন। কাছে ছিল থ্রি-নট থ্রি রাইফেল। বাজারের কাছাকাছি থাকায় প্রথম আক্রমণের নির্দেশ ছিল আমাদের। বেলা ৩টার পর বাজারের দক্ষিণ পাশের কুমার নদীর পাশে দেবদারু বাগান থেকে আমরা গুলি ছোড়া শুরু করলেই রাজাকাররা পেছন হটতে শুরু করে। তারা পশ্চিমে শ্রীপুরের দিকে দৌড়াতে থাকে। আমরা জানতাম না যে তাদের আধা কিলোমিটারের মধ্যেই সারঙ্গদিয়ায় এলাকায় বাগানে পাকিস্তানি আর্মি অবস্থান নিয়ে আছে। আমরা গুলি ছুড়ে অগ্রসর হলেই পাকিস্তানি আর্মিরা গুলি ছুড়তে থাকে আমাদের দিকে। আমাদের দুটি দল তখন পিছু হটতে থাকে। কিন্তু আমরা পাঁচজন পাকিস্তানি আর্মির বেষ্টনীর ভেতরে আটকা পড়ি। পরে কৌশলে পূর্ব দিক দিয়ে আমরা পিছু হটতে থাকি কিন্তু পাকিস্তানি আর্মিরা দক্ষিণ দিক দিয়ে আমাদের ঘেরাওয়ের চেষ্টা করে। এরই মধ্যে আমতল থেকে মুজিব বাহিনীর কিছু সদস্য বাবলাগাছের সঙ্গে করগেট টিন ঠেকিয়ে, টিন ফুটো করে এসএলআরের নল ঢুকিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের দিকে গুলি ছুড়তে থাকে। টিনের মধ্য দিয়ে গুলি করায় বিকট শব্দ হতে থাকে। এ শব্দ শুনে পাকিস্তানি বাহিনী ভাবে ভারী অস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়ছে। ফলে তারা পিছু হটতে থাকে। আমরা তখন তিন দিক থেকে ফের প্রতিরোধ গড়ে তুলি। ফলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পিছু হটে শ্রীপুরের ক্যাম্প গুটিয়ে তড়িঘড়ি করে কুষ্টিয়ার দিকে চলে যায়।

এরপর আরও একবার খামারপাড়া বাজারে অতর্কিত এসে আক্রমণ করে পাকিস্তানি আর্মি। মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত নদী পার হয়ে শ্রীপুর চলে আসে। আমরা তখন শ্রীপুর কুমার নদীর পাড় দিয়ে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। এ সময় উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল গুলি বিনিময় হয়। পাকিস্তানি আর্মি আমাদের প্রতিরোধে নদী পার হতে না পেরে মাগুরা শহরে ফিরে যায়। এছাড়া মাগুরার বিনোদপুরের ভয়াবহ যুদ্ধে কনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা স্কুলছাত্র মুকুল (১৬) মারা যায়।

নভেম্বরের দিকে শ্রীপুরের দ্বারিয়াপুর হাসপাতালে ১০০ থেকে ১৫০ পাকিস্তানি বাহিনী এসে ক্যাম্প স্থাপন করে। তখন আমাদের প্রতিরোধের মুখে একরাত থাকার পর সকালে এলাকা ছেড়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় সাচিলাপুর বাজারে ১০-১৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘাসিয়ারা এলাকায় গেলে ফের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে তারা। সেখানে পাকিস্তানি আর্মির একজন নিহত হয় এবং একটি গাড়ি অকেজো হয়। লাশ নিয়ে গেলেও ফেলে যায় গাড়িটি। সেই গাড়ি নিয়ে উল্লাস করে এলাকার মানুষ। পরদিন ঘাসিরা এলাকায় গিয়ে নির্বিচারে বাড়িঘর আগুনে জ¦ালিয়ে দেয় পাকিস্তানি আর্মিরা।

৬ ডিসেম্বর মাগুরার বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা আকবর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে মাগুরা শহরের পাকিস্তানি আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ করি। একই সময় ভারতীয় যুদ্ধবিমানও আকাশপথ থেকে গুলিবর্ষণ করতে থাকে ক্যাম্পে। আমাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পরদিন পাকিস্তানি আর্মিরা পালিয়ে মাগুরা থেকে কামারখালী গড়াই নদীর ঘাটে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেদিনই শত্রুমুক্ত হয় মাগুরা।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান টুকু