বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মহল থেকে রেশনিং প্রথা চালুর দাবি উঠলেও প্রধানমন্ত্রী চাচ্ছেন না। তার যুক্তি এই প্রথা চালু করতে গেলে আবার ডিলারশিপ দিতে হবে। সেখানে আবার অনিয়ম-দুর্নীতি হবে। তার থেকে ভালো ১ কোটি পরিবারকে সাশ্রয়ী দামে পণ্য কেনার কার্ড। এতে করে কম মূল্যে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা পণ্য কিনতে পারবেন বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা গতকাল মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের বৈঠকে এ ধরনের মতামত ব্যক্ত করেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
ওই সূত্র অনুযায়ী দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে সরকার আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেছেন, যেকোনো মূল্যে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কোনো অসাধু ‘সিন্ডিকেট’ বাজারে থাকবে না। জনগণকে দুর্ভোগে ফেলতে দেওয়া হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে প্রায় চার ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ১৪ দলের একাধিক নেতা রেশনিং প্রথা চালু করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী রেশনিং প্রথা ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওইসব কথা বলেন।
বৈঠকে উপস্থিত ১৪ দলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৪ দলীয় জোটের কয়েকজন নেতা সরকারের সমালোচনা করে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, সরকারি দলের জোটে থেকে সরকারের সমালোচনা করা সমীচীন নয়। আপনারা দল টেকানোর জন্য যদি এভাবে সমালোচনা করেন তাহলে বিরোধী পক্ষ তো এটাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবেই। জোটের কয়েকজন নেতাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একমত হয়ে বলেন, জোটে থাকার কারণে গত ১৩ বছরে তাদের অনেকে এমপি-মন্ত্রীসহ সরকারের নানা সুবিধা পেয়েছেন। জোটের শরিক তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান এর সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, সরকারের সঙ্গে থেকে এভাবে সমালোচনা তো দ্বিচারিতার মধ্যে পড়ে যায়। বৈঠকে উপস্থিত ১৪ দলের নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানান, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা জোটভুক্ত দলকে নিজেদেরকে আরও শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য দরকার হলে তিনি সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। সংগঠন শক্তিশালী হলে সকল ষড়যন্ত্র মোকাবিলার পাশাপাশি নির্বাচনে জয়লাভ সহজ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রুদ্ধদ্বার এই সভায় বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী গোষ্ঠী বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে মাঠে নামার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা ১৪ দলকেও মাঠের কর্মসূচি দিয়ে বিরোধী শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সভায় ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন হেফাজত প্রশ্নে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাকে তো সবাইকে নিয়ে চলতে হয়। এদেরকে অন্য কেউ যাতে ব্যবহার করতে না পারে সেই বিষয়টিও আমাদের দেখতে হবে’।
বৈঠকে বছরে অন্তত দুই দিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জোট নেতাদের মতবিনিময়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি সময় পেলে আপনাদের ডেকে নিয়ে বসব।’ এ সময় করোনাকালীন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা তার বন্দিজীবনের কথা তুলে ধরে বলেন, করোনার কারণেই মূলত দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, ‘রুমের বাইরে সিঁড়িতে আমার খাবার রেখে যেতে, সিঁড়ি থেকে খাবারটা ভেতরে এনে খেয়ে আবার ওখানেই খালি প্লেট রেখে আসতাম। পরিবারের কারও সঙ্গেও দেখা হয়নি। এই কেটেছে আমার জীবন।’
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভা-ারীসহ কয়েকজন নেতা আগামী সংসদ নির্বাচনে জোটের ভবিষ্যৎ কী হবে এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন রাখেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী ভোটও জোটগতভাবে আমরা করব।’ ১৪ দলীয় জোট ঐক্যবদ্ধ থাকবে বলেও তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ জাসদের (আম্বিয়া) কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক ওয়াজেদুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে সিট না দেওয়ায় আম্বিয়ারা আসে নাই।’ তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। দেশে সাম্প্রদায়িক হামলা নিয়ে ১৪ দলীয় নেতারা বলেন, এসব হামলা মোটেও অতর্কিত নয়। পরিকল্পিত। প্রধানমন্ত্রীও বলেন, আগামী নির্বাচনের আগেও এমন পরিকল্পিত হামলার ঘটনা ঘটবে। জোটগতভাবে এসব হামলা মোকাবিলা করতে হবে।
সভা শেষে গণভবনের সামনে ১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু সাংবাদিকদের সভার বিষয়ে জানান। আগামী নির্বাচনে আসন বণ্টনের বিষয়ে জানতে চাইলে এই প্রবীণ নেতা বলেন, এখনই আসনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে না। এ জন্য আরও আলোচনা প্রয়োজন অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। নির্বাচন জোটগতভাবে হবে। আসনের বিষয়টি নির্বাচন ঘনিয়ে এলে ঠিক হবে।
বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসে তখন কি জোটবদ্ধ নির্বাচন হবে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আমু বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে আসবে না এটা তারা বলছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কী করবে এটা দেখার পর আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
বিএনপির দেশব্যাপী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ১৪ দল মাঠে নামবে বলে জানান আমু।
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ১৪ দলীয় জোটের ঐক্য, বর্তমান পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য সবই আলোচনা হয়েছে। খুবই খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীও আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন। বহুদিন পরে একটা ভালো আলোচনা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি সরকারের সঙ্গে ১৪ দলের সম্পর্কে যে প্রশ্নটা আছে, সেটাও আপনাদের নির্মূল করতে হবে। কারণ সব ব্যাপারে আমরা একমত নই। সবকিছু আমরা মেনে নিই ব্যাপারটা তা নয়। সুতরাং যেখানে যেটা আছে, সেখানে কোনো ব্যত্যয় থাকলে বিষয়টি আলোচনায় আসে।’
বিএনপি নির্বাচনে না আসলে কি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে মেনন বলেন, ‘ওই বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। বিএনপি নির্বাচনে আসবে না, সেটা আমরা জানি।’
আপনি যে বিভিন্ন সময় জনগণের ভোটের নিশ্চয়তা দাবি করেছিলেন। সেই বিষয়ে কি আজকে আলোচনা করেছেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মেনন বলেন, ‘একেবারে স্পষ্টতভাবে বলেছি গত ইউপি নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন থেকে শুরু করে এই পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে যে প্রশ্নগুলো এসেছে, জনগণের ভোটদানের অধিকারের যে প্রশ্নটি এসেছে। এই ব্যাপারটি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।’ জোটনেত্রী ীক বলেছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নেত্রী কি সব প্রশ্নের উত্তর দিবেন?’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘সরকারি দলের কাছে চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আলোচনা হয়নি। আলোচনাটা হয়েছে ১৪ দলীয় জোট প্রসঙ্গে। আমরা মূলত কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। সেটি ফলপ্রসূ হয়েছে।’ তিনি বলেন, তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম যেন বৃদ্ধি না করা হয়, সেই বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত করা হয়েছে।
জাতীয় পার্টির (জেপি) আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।